kalerkantho

শনিবার । ১০ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৯ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।

হাটের সেরা

জম্পেশ পশুর হাট

দেশি পশুতেই মিটবে চাহিদা

প্রিয় দেশ ডেস্ক   

১০ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



জম্পেশ পশুর হাট

বগুড়া: বগুড়া শহরতলির সুলতানগঞ্জ হাটে উঠেছে প্রচুর কোরবানির পশু। ওই হাটে দামি গরুটি নিয়ে এসেছিলেন বিক্রেতা রাজু। এই গরুর দাম তিনি চেয়েছেন সাড়ে তিন লাখ টাকা। ছবি : ঠাণ্ডা আজাদ

ঈদুল আজহা তথা কোরবানির ঈদের আর মাত্র দুই দিন বাকি। আগে কোরবানির গরুর একটি বড় অংশ আসত প্রতিবেশী দেশ ভারত থেকে।

কিন্তু গত কয়েক বছরের মতো এবারও ওই দেশ থেকে গরু আমদানি বন্ধ রয়েছে। তবে ইতিমধ্যে অবৈধ পথে কিছু গরু এসেছে। এ ক্ষেত্রে আশার কথা, এবার দেশীয় গরু দিয়েই দেশের কোরবানির চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হবে। পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকায় এবার দাম নিয়েও ক্রেতা-বিক্রেতা দুই পক্ষই খুশি। তবে স্থানভেদে ক্রেতা-বিক্রেতারা মিশ্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। এদিকে ক্ষতিকর গবাদি পশু ও জাল নোট শনাক্তকরণে স্থানীয় প্রশাসন বেশ তৎপর রয়েছে। আমাদের প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর :

রাজবাড়ী : রাজবাড়ীতে এবার ৫০৫টি খামারে ১০ হাজার ৩১০টি গরু এবং ৩২০টি খামারে ১০ হাজার ১৭০টি ছাগল লালনপালন করা হয়েছে। এ ছাড়া কৃষকের নিজেদের পশু তো রয়েছেই। সব মিলিয়ে এসব পশু জেলার চাহিদা মিটিয়ে বাইরেও সরবরাহ করা হচ্ছে। রাজবাড়ী সদরের বানিবহ ইউনিয়নের খামারি সালাউদ্দিন মিয়া বলেন, এবার গোখাদ্যের দাম ছিল আকাশছোঁয়া। যে কারণে গরু লালনপালনে বেশ খরচ পড়েছে। এর পরও শেষ মুহূর্তে যদি ভারতীয় গরু না ঢোকে, তবে তাঁরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন না। বানিবহ ইউপি চেয়ারম্যান শেখ গোলাম মোস্তফা বাচ্চু বলেন, তাঁর ইউনিয়নে বেশ কিছু গরুর খামার গড়ে উঠেছে। বেকার যুবকরা এ ব্যাপারে উদ্যোগী হচ্ছে। এবার খামারিরা লাভবান হলে আরো খামার গড়ে উঠবে। এ ক্ষেত্রে খামারিদের সহজ শর্তে ঋণ দেওয়া উচিত। আর এর মধ্য দিয়ে দেশীয় পশু দিয়ে স্থায়ীভাবে দেশের চাহিদা মেটানো সম্ভব হবে।

মাগুরা : মাগুরার বিভিন্ন হাট ঘুরে দেখা গেছে, ক্রেতারা এবার গরুকে দুই ভাগে ভাগ করে বিশেষ নাম দিয়েছে। বাণিজ্যিকভাবে বিশেষ খাবার খাইয়ে ইনজেকশন দিয়ে মোটাতাজা করা গরুর নাম দেওয়া হয়েছে ‘ঢিলেঢালা’। আর কৃষকের গোয়ালে বড় হওয়া গরুর নাম দেওয়া হয়েছে ‘টাইট’। তবে সর্বত্রই ‘টাইট’ গরুর চাহিদা বেশি। বেশ কয়েকটি হাট ঘুরে দেখা গেছে, এবার দেশি গরুর চাহিদা যেমন বেশি, তেমনি দাম নিয়েও ক্রেতা-বিক্রেতা দুই পক্ষ সন্তুষ্ট। দেশি জাতের একেকটি গরু ৪০ থেকে ৮০ হাজার টাকায় পাওয়া যাচ্ছে। অন্যদিকে বিশেষ প্রক্রিয়ায় মোটাতাজা করা প্রায় দ্বিগুণ আকারের গরু বিক্রি হচ্ছে ৬০ হাজার থেকে এক লাখ ২০ হাজার টাকায়।

এদিকে জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা কানাই লাল স্বর্ণকার জানান, জেলায় ছোট-বড় মিলিয়ে ১১ হাজার ২০০ গরুর খামার রয়েছে।

শাহজাদপুর (সিরাজগঞ্জ) : সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরের পশুর হাটগুলো সিন্ধি, ক্রস, শাহিয়াল, দেশিসহ বিভিন্ন জাতের গরু-ছাগলে ভরপুর। ২০ হাজার থেকে ৪৫ হাজার টাকা মূল্যের গরুর চাহিদা বেশি। ৫০ হাজার টাকার বেশি দামের গরুর বেচা-বিক্রি কম। গরু বিক্রেতা আনোয়ার হোসেন জানান, গত কয়েক হাটে কম দামের জন্য গরু বিক্রি করেননি। কিন্তু এখন গরু বিক্রি করে আসল টাকা ঘরে তোলাই অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। গরু বিক্রেতা বড়জংলা গ্রামের সেলিম মিয়া জানান, গত রবিবার তালগাছি গরুর হাটে একটি ষাঁড় তিন লাখ টাকা দাম চাইলে এক ক্রেতা দুই লাখ টাকা বলে চলে গেছেন। পরে আর কোনো গ্রাহকই আসেননি। উল্লাপাড়ার বোয়ালিয়া গরুর হাটের পশু বিক্রেতা শাহ আলম জানান, শেষের হাটে গরুর দাম বেশ কম ছিল। বড় ষাঁড়ের গ্রাহকই পাওয়া যাচ্ছে না। বেড়া হাটে শাহজাদপুর থেকে আসা ক্রেতা সাব্বির আহমেদ খান ও এনামুল খোকন বলেন, ‘গরুর দাম কম হওয়ায় আমরা খুশি। ভারত থেকে এবার গরু না এলেও বাজারে এর প্রভাব পড়েনি। ’

নাটোর : দেশীয় খামারিদের গরু-ছাগলে ভরে গেছে জেলার ২০টি কোরবানি পশুর হাট। তবে ভারতীয় গরুর আমদানি না থাকায় দাম বেশ চড়া। আর ক্রেতা সংকটে ভুগছে খাসি বিক্রেতারা। এদিকে ভারতীয় গরু যাতে হাটগুলোতে ঢুকতে না পারে সেজন্য নজরদারি রেখেছে হাট কমিটি ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। জেলা প্রশাসকের কার্যালয় সূত্র জানায়, এ বছর নাটোরের সাতটি উপজেলায় ২০টি কোরবানি পশুর হাট বসানো হয়েছে। আর জেলার চাহিদার তুলনায় অতিরিক্ত ৩৬ হাজার গরু মোটাতাজা করা হয়েছে। তেবাড়িয়া হাটের ইজারাদার দিলীপ কুমার দাস বলেন, ঈদে ভারত থেকে গরু না এলেও তেমন সমস্যা হবে না। কারণ হাটে ব্যাপক দেশি জাতের গরু রয়েছে। আবার এ অঞ্চলের খামারিদের কাছে যে পরিমাণ গরু আছে, তাতেই চাহিদা মিটে যাবে। তা ছাড়া দেশি খামারিদের কথা চিন্তা করে তারা যাতে গরুর দাম পায়, সে জন্য ভারতীয় গরু প্রবেশে নজরদারি রাখা হয়েছে।

নীলফামারী : নীলফামারী শহরের মশিউর রহমান ডিগ্রি কলেজ ও বাসটার্মিনাল মাঠে গরুর হাটে গিয়ে দেখা গেছে, পর্যাপ্ত গরু-ছাগলের আমদানি রয়েছে। ক্রেতা সমাগমও প্রচুর। জেলা শহরের রবিউল মিয়া বলেন, ‘আমার বাড়িতে পালিত একটি আড়িয়া (ষাঁড়) গরু হাটে বিক্রি করেছি ৪০ হাজার টাকায়। অন্যান্যবারের তুলনায় লাভ কম হয়েছে। ’ অন্য গরু বিক্রেতা জেলার সৈয়দপুর উপজেলার চওড়া বাজার এলাকার ভুট্টু মিয়া বলেন, ‘বাড়ির পালিত চারটি গরু হাটে এনে বিক্রি করেছি। তাতে তেমন লাভ হয়নি। এ কারণে অনেকে ভবিষ্যতে গরু পালনে আগ্রহ হারাবে। ’ বাজারে ষাঁড়ের দাম অনেকটাই কম। এর কারণ হিসেবে ক্রেতারা জানায়, অসাধু অনেক ব্যবসায়ী কৃত্রিমভাবে গরু মোটাতাজা করে বাজারে এনে বিক্রি করছে। এ ক্ষেত্রে ষাঁড়ের সংখ্যাই বেশি। তাই ষাঁড়ের প্রতি অনেকেরই আগ্রহ কম। গরু ক্রেতা ওমর ফারুক বলেন, ‘হাটে আড়িয়া গরুর আমদানি বেড়েছে, কিন্তু কিনতে সাহস পাচ্ছি না। যে হারে গরুতে ইনজেকশন দেওয়া হচ্ছে তাতে অপরিচিত বিক্রেতাকে বিশ্বাস করতে পারছি না। পরিচিত বিক্রেতা পেলে গরু কিনব। ’

আবার উল্টো চিত্রও আছে। গরু কিনে খুশি জেলা সদরের কিত্তিনিয়া পাড়ার সফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘৪০ হাজার ৫০০ টাকা দিয়ে গরু কিনে আমার কাছে অনেকটা সস্তা মনে হয়েছে। ওই গরুর জন্য আমার বাজেট আরো বেশি ছিল। ’ দিনাজপুরের বীরগঞ্জ উপজেলার গরু ব্যবসায়ী রাজা মিয়া বলেন, ‘হাটে পাঁচটি গরু এনেছি। এখন পর্যন্ত একটিও বিক্রি করতে পারিনি। সৈয়দপুর উপজেলার ঢেলাপীর হাটে যে গরু ৫০ হাজার টাকায় বিক্রি করেছি ওই গরুর দাম আজকে ৪৫ হাজার। ’

পিরোজপুর (আঞ্চলিক) : পিরোজপুরের ভাণ্ডারিয়ায় শত বছরের পুরনো কোরবানির গরুর হাট জমে উঠেছে। উপজেলার দক্ষিণ শিয়ালকাঠি গ্রামে প্রায় এক কিলোমিটার এলাকাজুড়ে বসছে এ গরুর হাট। প্রতি শনি ও মঙ্গলবার গরুর হাট বসলেও প্রতি ঈদুল আজহা উপলক্ষে সপ্তাহজুড়ে এখানে গরুর জমজমাট হাট বসে। এলাকাবাসী সূত্রে জানা গেছে, প্রতি বছর ভারতীয় গরুর দখলে থাকে এ গরুর হাট। তবে এবারের চিত্র ভিন্ন ধরনের। এ বছর দেশি খামারিদের গরুর সংখ্যাই বেশি। এ হাটে স্থানীয় খামারির পাশাপাশি যশোরের কেশবপুর, ঝিনাইদহ, সাতক্ষীরাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে ব্যবসায়ীরা গরু নিয়ে এসেছেন। হাটে এ উপজেলা ছাড়াও পাশের উপজেলা কাঁঠালিয়া, রাজাপুর, কাউখালী, মঠবাড়িয়া, জিয়ানগরসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা ক্রেতা ও বিক্রেতাদের সমাগমে হাট এখন মুখরিত।

পঞ্চগড় : পঞ্চগড়ের পশুর হাটগুলোতে এবার সীমান্তপথে বিপুলসংখ্যক ভারতীয় গরু আসায় দেশি গরুর দাম কমে গেছে। এ অবস্থায় দেশি গরুর খামারি ও স্থানীয় গৃহস্থরা লোকসানের মুখে পড়েছে। স্থানীয় গরু ব্যবসায়ীরা জানান, কোরবানি উপলক্ষে দেশি গরুর দাম ছিল বেশ চড়া। কিন্তু গত কয়েক দিনে হাটগুলোতে ভারতীয় গরুর আধিক্য বেশি থাকায় দেশি গরুর দাম কমে যায়। এতে আর্থিক মুনাফার আশায় থাকা গৃহস্থ ও খামারিদের লোকসান গুনতে হচ্ছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ভারতীয় গরু আমদানি বন্ধ থাকলেও কোরবানির ঈদ উপলক্ষে জেলার বিভিন্ন সীমান্ত পথ দিয়ে নানা কৌশলে ভারতীয় গরু আনা হচ্ছে। তবে প্রায় সব গরুই আসছে অবৈধভাবে। এতে কপাল পুড়েছে দেশি গরুর খামারি ও স্থানীয় গৃহস্থের।

রাউজান (চট্টগ্রাম) : চট্টগ্রামের রাউজানে পশুর দাম একটু বেশি বলে মনে করছে স্থানীয় ক্রেতারা। এ কারণে হাটগুলোতে প্রচুর ক্রেতা-বিক্রেতা থাকলেও উল্লেখযোগ্য হারে কেনাবেচা হচ্ছে না। দেশি গরুর চাহিদা বেশি, তবে জোগান কম থাকায় দামও অনেক। তা ছাড়া বিশেষ কায়দায় মোটাতাজা করা গরু কেনার প্রতি রয়েছে ক্রেতাদের অনীহা। উপজেলার মুছা ফকির হাটে গরু কিনতে আসা আবুল কাশেম বলেন, ‘ইনজেকশন দিয়ে মোটাতাজা করা গরু দেখতে সুন্দর দেখা গেলেও এসব গরুর কলিজা পচে যায়। এসব গরুর মাংস শরীরের জন্যও ক্ষতিকর। তাই তিনি দেখেশুনে একটি গৃহস্থের গরু কিনবেন। ’


মন্তব্য