kalerkantho

শনিবার । ৩ ডিসেম্বর ২০১৬। ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ২ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।

চাঁদার হাট!

► বগুড়ার ১৫ স্থানে গরুর ট্রাকে চাঁদাবাজি
► চাঁদাবাজ নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ পুলিশ

লিমন বাসার, বগুড়া   

৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



চাঁদার হাট!

ঘড়ির কাঁটার দিকে—বগুড়ার প্রথম বাইপাস সড়কে ভবেরবাজার ট্রাক মালিক সমিতির নামে তোলা হচ্ছে চাঁদা। এক হাতে চাঁদার রসিদ বই, আছে লাঠিও। বগুড়া শহরের গোহাইল রোডের খান্দারে মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের নামে চাঁদাবাজি। ছবি : ঠাণ্ডা আজাদ

আধাকিলোমিটার পরপর ইশারায় থেমে যাচ্ছে ট্রাক। লাঠি হাতে দৌড়ে আসছে চাঁদাবাজ।

কেউ বলছে, শ্রমিক ইউনিয়ন; কেউ বলছে, মালিক সমিতি; আবার কেউ বলছে, নেওয়া হয়েছে সড়কের লিজ। প্রতি ট্রাক থেকে জবরদস্তি আদায় করা হচ্ছে ২০০-৫০০ টাকা। বছরজুড়ে সড়কে চাঁদাবাজি চললেও ঈদ ঘিরে এখন তা পেয়েছে নতুন মাত্রা। ১৫ স্থানে প্রকাশ্যে চাঁদা তুললেও বগুড়া পুলিশ তা নিয়ন্ত্রণে সম্পূর্ণ ব্যর্থ।

ভুক্তভোগী ট্রাকচালকদের তথ্য মতে, চাঁদা উঠছে মোকামতলা, মহাস্থানগড়, মাটিডালি, চারমাথা বাসস্ট্যান্ড, ভবেরবাজার, তিনমাথা রেলগেট, শাকপালা, বনানী, শাহজাহানপুর, শেরপুর, মানিকচক, সাবগ্রাম, লিচুতলা, চান্দাইকোনা ও গোদারপাড়ায়। স্থানীয় ট্রাক থেকে আদায় করা হচ্ছে ৭০ থেকে ১০০ টাকা। আর বাইরের জেলার গাড়ি থেকে নেওয়া হচ্ছে ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত।

কালের কণ্ঠ’র অনুসন্ধানে জানা গেছে, কোরবানি ঈদের আগে সীমাহীন চাঁদাবাজি শুরু হয়েছে উত্তরাঞ্চলের মহাসড়কে। বাস, ট্রাক, অটোরিকশা, ভটভটিসহ সব ধরনের যানবাহন থেকে উঠছে টাকা। তবে ট্রাক শ্রমিক ইউনিয়নের নামে চাঁদা উঠছে বেপরোয়াভাবে। চাঁদাবাজরা মহাসড়কে বেরিকেড দিয়ে পণ্য ও গরুবাহী ট্রাক থামিয়ে আদায় করছে টাকা। সর্বনিম্ন ৭০ থেকে সর্বোচ্চ পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত তুলছে। ট্রাক শ্রমিক ইউনিয়ন লোক নিয়োগ করে এই চাঁদা আদায় করছে। শুধু বগুড়া জেলার ১৫টি পয়েন্টে ১ শর বেশি কলার বয় (চাঁদার টাকা উত্তোলনকারী) নিয়োগ করা হয়েছে। এরা দিন ১০০ থেকে ৩০০ টাকার চুক্তিতে কাজ করছে।

বগুড়া হাইওয়ে পুলিশের তথ্য মতে, দুই বাইপাস সড়ক ও মূল শহরের ভেতর দিয়ে প্রতিদিন প্রায় এক হাজার ১০০ ট্রাক যাতায়াত করে। এগুলোর বেশির ভাগ বাইরের জেলার। মূলত চাঁদাবাজদের লক্ষ্য বাইরের ট্রাকগুলো। কারণ এসব ট্রাকের চালকদের ভয়ভীতি দেখিয়ে ইচ্ছামতো চাঁদা আদায় করা যায়।

গত রবিবার রাত দেড়টায় শহরের বাইপাস সড়কের তিনমাথা রেলগেট পয়েন্টে দাঁড়িয়ে থাকা ট্রাকচালক কাফি ভয়ার্ত কণ্ঠে বলেন, ‘লাটি লিয়া এসে প্রতি গরু ১০০ ট্যাকা করে চানদা চ্যালো তারা। কোলো হামরা টেরাক শ্রমিক। ট্যাকা না দিলে গাড়ি যাবি না। শেষ্যা হামি ৫০০ ট্যাকা চানদা দিনু। না হলে হামার গাড়ি আটক্যা থুলনি (রাখত)। ’

 আরেক চালক রফিকুল বলেন, ‘মহাস্থান থেকে ১০ কিলোমিটার রাস্তায় ১০ বার চাঁদা দিয়েছি। এভাবে চলতে থাকলে ঢাকা পর্যন্ত পৌঁছানো দায় হয়ে যাবে। ’ গত শনিবার সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত সরেজমিনে বগুড়ার মহাস্থানবাজার থেকে বনানী পর্যন্ত স্থানে স্থানে পশুবাহী ট্রাক, পিকআপসহ অন্যান্য যানবাহন থেকে বিভিন্ন সংগঠনের নামে রসিদ দিয়ে চাঁদা আদায় করার দৃশ্য দেখা যায়। লাঠি হাতে কিছু উশৃঙ্খল যুবককে চাঁদা আদায়ের জন্য মহাসড়কে নামানো হয়েছে। চাঁদার টাকার পরিমাণ নিয়ে তারা বাগিবতণ্ডায় জড়িয়ে পড়েছে।

বগুড়ার লিচুতলায় করতোয়া কুরিয়ার সার্ভিসের গ্যারেজের সামনে ট্রাক থেকে চাঁদা আদায়কারী আমিনুল জানান, শহরে চলাচলকারী পণ্যবাহী যানবাহন থেকে টোল আদায়ে পৌরসভার কাছ থেকে এক বছরের জন্য ৩৫ হাজার টাকায় স্থানটি ইজারা নেওয়া হয়েছে। তবে এই টোল গরুবাহী যানবাহন থেকে আদায় করা হচ্ছে না।

তবে বগুড়া পৌরসভার মেয়র এ কে এম মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘টোল আদায়ের জন্য পৌরসভা কাউকে ইজারা দেওয়া হয়নি। এটি চাঁদাবাজদের অপকর্ম। ’

ঢাকার সাভারের বাসিন্দা ট্রাকচালক সুরুত আলী বলেন, ‘মাটিডালি দ্বিতীয় বাইপাস সড়কের মানিকচক ও বনানী লিচুতলায় আমাকে দুই দফায় ২০০ ও ৩০০ টাকা দিতে হয়েছে। ’ সিরাজগঞ্জের ট্রাকচালক আব্দুল্লাহিল কাফি বলেন, ‘দাবি করা ৩০০ টাকা না দেওয়ায় গাড়ি এক ঘণ্টা ভবেরবাজার সড়কের পাশে আটকে রেখেছিল। এরপর আড়াই শ টাকা দিয়ে ছাড়া পাই। ’

ভবেরবাজারে ট্রাকচালক আবুল প্রামাণিক বলেন, ‘যশোর থেকে বগুড়ায় ভাড়ায় মাল এনেছি। আমার কাছ থেকে শ্রমিক নামধারী কিছু সন্ত্রাসী জোরপূর্বক ৫০০ টাকা চাঁদা নিয়েছে। তারা জানিয়েছে, এটা শ্রমিক ইউনিয়নের চাঁদা। না দিলে ট্রাক যাবে না। বাধ্য হয়ে টাকা দিয়েছি। ’

জানতে চাইলে আন্তজেলা ট্রাক শ্রমিক ইউনিয়ন বগুড়া জেলা সভাপতি আব্দুল মান্নান বলেন, ‘সংগঠনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রতি ট্রাক থেকে ৭০ টাকা করে চাঁদা আদায় করা হয়। এর মধ্যে ফেডারেশন ২০ টাকা, মালিক সমিতি ২০ টাকা, শ্রমিক নেতারা ২০ টাকা ও টার্মিনাল পায় ১০ টাকা। এটা ইউনিয়নের নিয়োগপ্রাপ্ত লোকরা করে থাকে। এই বাইরে যেসব পয়েন্টে চাঁদা ওঠে সেটা করে মোটর শ্রমিক ইউনিয়ন। তাদের চাঁদা আদায়ের পরিমাণ ও স্থানের সংখ্যা বেশি। ’ গরুর ট্রাক থেকে অতিরিক্ত চাঁদা আদায়ের কথা অস্বীকার করে মান্নান বলেন, ‘এ ধরনের কাজ কেউ করে থাকলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ’

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন (রাজশাহী) এবং বগুড়া শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি আব্দুল লতিফ মণ্ডল বলেন, ‘মোটর শ্রমিক কল্যাণ ফান্ডের জন্য প্রতিটি জেলায় ৩০-৫০ টাকা আদায় করা হয়। এটা বৈধ চাঁদা। কিন্তু ট্রাক শ্রমিকরা পুলিশকে ম্যানেজ করে যে চাঁদা তুলছে, সেটা পুরোপুরি অবৈধ। ’

বগুড়ার পুলিশ সুপার (এসপি) আসাদুজ্জামান বলেন, ‘গরুর ট্রাক থেকে চাঁদা আদায় করার কোনো তথ্য আমার জানা নেই। ’

 


মন্তব্য