kalerkantho

মঙ্গলবার । ৬ ডিসেম্বর ২০১৬। ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৫ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


কাজ না করেই তুলে নেওয়া হয়েছে দুই কোটি টাকা

প্রকল্প নিয়ে অনিশ্চয়তা

রৌমারী ও রাজীবপুর

কুদ্দুস বিশ্বাস, রৌমারী (কুড়িগ্রাম)   

৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



প্রকল্প নিয়ে অনিশ্চয়তা

কুড়িগ্রামের রৌমারী ও রাজীবপুর উপজেলায় গত অর্থবছরের ৫৮৭টি টিআর, কাবিখা ও কাবিটা প্রকল্পের কাজ বাস্তবায়ন দেখিয়ে প্রায় দুই কোটি টাকা তুলে নেওয়া হয়েছে। মেয়াদ শেষ হয়ে যায়—এমন পরিস্থিতিতে গত ৩০ জুনের মধ্যে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন প্রকল্পের নামে বরাদ্দ অর্থ উত্তোলন করে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তাঁর ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা রাখেন।

পরে ওই টাকায় সোলার প্যানেল কিনে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিন্তু কম দামের সোলার প্যানেল সরবরাহের অভিযোগ এনে প্রকল্প সভাপতিরা তা নিতে অস্বীকার করেন। এ অবস্থায় প্রকল্পগুলোর ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সরকার প্রত্যন্ত ও দুর্গম এলাকার ঘরে ঘরে সৌরবিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে টিআর ও কাবিটা প্রকল্পের টাকায় সোলার প্যানেল স্থাপনের নির্দেশ দেয়। নিয়ম অনুসারে প্রকল্পের সভাপতি বরাদ্দকৃত টাকায় সোলার প্যানেল স্থাপন করবেন। সেটা যথানিয়মে বাস্তবায়িত হয়েছে কি না, তা তদারক করবে উপজেলা প্রশাসন। কিন্তু ঘটেছে তার উল্টোটা। অভিযোগ পাওয়া গেছে, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মিলে সোলার কম্পানির সঙ্গে আঁতাত করে নিজেদের পকেট ভারী করার ফন্দি আঁটেন। এতে প্রকল্পের অধীনে ১৮ হাজার ৪০০ টাকা বরাদ্দের স্থানে দেওয়া হচ্ছে ছয় হাজার টাকা দামের সোলার। একইভাবে ৫০ হাজার টাকার স্থলে দেওয়া হচ্ছে ১৫ হাজার টাকার সোলার।

সূত্র মতে, ৩৯১ প্রকল্পের অধীনে এক কোটি ২৯ লাখ এবং রাজীবপুরে ২৩৭টি প্রকল্পে ৬৪ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। এতে সর্বনিম্ন ১৮ হাজার ৪০০ টাকা থেকে ৫৮ হাজার ১০০ টাকার প্রকল্প রয়েছে। বসতবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও মসজিদে সোলার প্যানেল স্থাপনের জন্য ওই প্রকল্পগুলো নেওয়া হয়। রাজীবপুরে সোলার প্যানেল সরবরাহ করছে আরডিএ নামের সংস্থা আর রৌমারীতে সরবরাহ করছে রহিম আফরোজ নামের সোলার কম্পানি। প্রকল্প সভাপতিরা অভিযোগ করেছেন, ইউএনও এবং পিআইও সোলার কম্পানির সঙ্গে সমঝোতা করেছেন। সে অনুযায়ী বরাদ্দকৃত টাকার তিন ভাগের এক ভাগ দিয়ে সোলার প্যানেল দিচ্ছে ওই কম্পানিগুলো।

রৌমারীর দাঁতভাঙ্গা ইউপি সদস্য নুর মোহাম্মদ ডন অভিযোগ করেন, ‘প্রকল্প পাওয়ার জন্য আগেই আমরা এমপিকে টাকা দিয়েছি। ১৫ হাজার টাকার বিনিময়ে এমপি আমাকে বরাদ্দ দিয়েছেন ৫০ হাজার টাকা। আমার মতো প্রায় সব প্রকল্প সভাপতিই এমপিকে টাকা দিয়ে প্রকল্প নিয়েছেন। এমপি টাকা নেওয়ার পর এখন পিআইও এবং ইউএনও আরেক ফাঁদ তৈরি করেছেন। ’

ইমান আলী নামের এক প্রকল্প সভাপতি অভিযোগ করেন, “আমাদের বিল দিবে, আমরা সোলার কিনে স্থাপন করব। সঠিক সোলার স্থাপন করেছি কি না, তারা এসে দেখবে। পিআইও কয়, ‘এখানে স্বাক্ষর দেন, সোলার প্যানেল আপনার বাড়িতে চলে যাবে। ’ আমার প্রকল্পের বরাদ্দ হলো ১৮ হাজার ৪০০ টাকা। তারা দিচ্ছে ছয় হাজার টাকার সোলার। বাকি ১২ হাজার টাকা নাই। ”

ওই দুই উপজেলার দায়িত্বে থাকা পিআইও সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘এখানে আমার একার করার কিছু নেই। ইউএনও ও উপজেলা চেয়ারম্যান যা নির্দেশ দিবেন, আমি সেটাই করব। তা ছাড়া মন্ত্রণালয়ের নির্দেশ রয়েছে পিআর-কাবিটা প্রকল্পগুলোতে অবশ্যই সোলার প্যানেল স্থাপন করতে হবে। কিন্তু প্রকল্প সভাপতিরা তা করছেন না। এ কারণে প্রশাসন সোলার প্যানেল কিনে সরবরাহের উদ্যোগ নিয়েছে। ’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এমপি তো বলবেনই দেওয়ার জন্য। কারণ তিনি তো আগেই প্রকল্প থেকে অর্থ নিয়েছেন। ’

রৌমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবদুল্লাহ আল মামুন তালুকদার এবং রাজীবপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাসির উদ্দিন মাহমুদ ওই অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, মন্ত্রণালয়ের নির্দেশমতোই ওই প্রকল্পগুলোর বরাদ্দকৃত টাকায় সোলার প্যানেল কিনে দেওয়া হচ্ছে। প্রকল্প সভাপতিরা যদি তা গ্রহণ না করেন, তাহলে অর্থ ফেরত দেওয়া হবে। প্রকল্পগুলো জুনের মধ্যে বাস্তবায়ন দেখিয়ে বরাদ্দ করা অর্থ উত্তোলন করে নিজেদের অ্যাকাউন্টে জমা রেখেছেন জানিয়ে তাঁরা বলেন, ‘আমরা এ কাজ করতেই পারি। কিন্তু আমরা তো সরকারি বরাদ্দকৃত টাকার ক্ষতি করিনি। ’

অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে স্থানীয় সংসদ সদস্য রুহুল আমিন বলেন, ‘টিআর-কাবিটা প্রকল্পে আমি টনপ্রতি অর্থ নিয়েছি, এমন তথ্য মিথ্যা। আমি কোনো ঘুষ খাই না। ’ তিনি আরো বলেন, ‘আমার বরাদ্দের অর্থ যার নামে বরাদ্দ দিয়েছি, সেই প্রকল্প সভাপতি বা তিনি নিজেই অর্থ উত্তোলন করতে পারবেন। কিন্তু এখানে পিআইও এবং ইউএনও নিজেরাই নিয়ম তৈরি করেছেন। তাঁরা প্রকল্পগুলোর কাজ বাস্তবায়ন দেখিয়ে সমুদয় অর্থ উত্তোলন করে তাঁদের নিজের অ্যাকাউন্টে রেখেছেন। এটা তাঁরা করতে পারেন না। ’


মন্তব্য