kalerkantho

শনিবার । ৩ ডিসেম্বর ২০১৬। ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ২ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


উত্তরের হাইওয়েতে ‘হাওয়াই প্রকল্প’

লিমন বাসার, বগুড়া   

৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



উত্তরের হাইওয়েতে ‘হাওয়াই প্রকল্প’

বগুড়া সড়ক বিভাগের ব্ল্যাকস্পট ঘোঘাব্রিজ এলাকা এখনো ঝোপঝাড়-জঙ্গলে ভরা। ইনসেটে রাস্তার কাজ চলার ব্যাপারে সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড লাগানো হলেও কাজের খোঁজ নেই। ছবিগুলো গতকাল তোলা। ছবি : কালের কণ্ঠ

ঢাকা-উত্তরাঞ্চল মহাসড়ক (হাইওয়ে) এশিয়ান হাইওয়েতে অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে। পুরো মহাসড়ক চার বা আট লেনে উন্নীত করা হবে।

এর টাঙ্গাইল অংশে চার লেনের কাজ চলছে। অথচ বগুড়া-গাইবান্ধা অংশে দুর্ঘটনা কমানোর কথা বলে বাঁক ‘দূর’ করার অহেতুক প্রকল্প হাতে নিয়েছে সড়ক বিভাগ। এর ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় সাড়ে ১৭ কোটি টাকা।

সড়ক বিভাগের নথি থেকে জানা গেছে, বগুড়ার চান্দাইকোনা থেকে গাইবান্ধার ধাপেরহাট পর্যন্ত ৯৬ কিলোমিটারে ১৫টি ঝুঁকিস্থান (ব্ল্যাক স্পট) চিহ্নিত করা হয়েছে। ঝুঁকি দূর করতে প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে ১৭ কোটি ৩২ লাখ ৩৬ হাজার ৯৯১ টাকা ৮৪ পয়সা। এ কাজের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে সড়ক বিভাগ থেকে গত বছরের ২৪ ফেব্রুয়ারি বগুড়া সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মন্ত্রণালয়ে একটি প্রতিবেদন দেন। এতে উল্লেখ করা হয়, ঢাকা (মিরপুর), উথলী, পাটুরিয়া নাটাখোলা, কাশিনাথপুর, বগুড়া, রংপুর বেলডাঙ্গা, বাংলাবান্ধা পর্যন্ত জাতীয় মহাসড়ক। উত্তরবঙ্গের সব যানবাহন এ সড়কপথে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে চলাচল করে। সড়কটি নেপালের সঙ্গে ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার হয়ে আসছে। তা ছাড়া সড়কটি প্রস্তাবিত এশিয়ান হাইওয়ের অংশ। পঞ্চগড় থেকে উত্তোলিত বিপুল পরিমাণ পাথর এ সড়ক দিয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পরিবহন হয়ে থাকে। সড়কের বিভিন্ন অংশের বাজার এলাকায় ইন্টারসেকশন (একাধিক ছোট রাস্তা) থাকায় প্রায় দুর্ঘটনা ঘটে। দুর্ঘটনাকবলিত স্থানে নিরাপদ সড়ক প্রতিষ্ঠা একান্ত প্রয়োজন।

এ প্রতিবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সরকারের বার্ষিক উন্নয়ন প্রকল্পে (এডিপি/জিওবি) অন্তর্ভুক্ত হয়ে ২০১৫ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি সেটি অনুমোদিত হয়। এরপর সড়ক অঞ্চল রংপুর বিভাগের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী এ কিউ এম ইকরাম উল্লাহ বগুড়া সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী বরাবর চিঠি দিয়ে পরবর্তী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য পাঠান।

এ প্রকল্পে মহাসড়কের ঝুঁকিপূর্ণ যেসব এলাকা চিহ্নিত করা রয়েছে তার মধ্যে বগুড়া অংশে রয়েছে ৬৫ কিলোমিটারের মধ্যে ঘোগা ব্রিজ বাসস্ট্যান্ড, ঘোগা, ছোনকা বাজার বাসস্ট্যান্ড, মির্জাপুর বাজার, নাসিরুন্নেছা স্কুল ইন্টারসেকশন, নয়মাইল হাট/বাসস্ট্যান্ড, বাঘোপাড়া বাজার ও ফাঁসিতলা স্কুল বাসস্ট্যান্ড। গাইবান্ধা অংশে রয়েছে গোবিন্দগঞ্জ বাজার, গোবিন্দগঞ্জ থানা ইন্টারসেকশন, কাকলী বালুয়াহাট বাজার, কাকলী কালীতলা বাজার, পলাশবাড়ী ইন্টারসেকশন, কালীতলা বাসস্ট্যান্ড, কোমরপুর বাজার ও ধাপেরহাট, পীরগঞ্জ।

হাইওয়ে পুলিশের পশ্চিমাঞ্চল সূত্র জানায়, সড়ক বিভাগের চিহ্নিত এ ব্ল্যাক স্পটে গত পাঁচ বছরে ২০ জন নিহতের তথ্য রয়েছে। তবে এ সড়কে আরো এমন কিছু ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা রয়েছে, যেখানে বিগত পাঁচ বছরে দুই শতাধিক মানুষ মারা গেছে। আহত হয়েছে আরো অন্তত ৫০০ মানুষ। এ রাস্তার উভয় পাশে হার্ডশোল্ডারিং (হালকা যানবাহন চলাচল উপযোগী) করা হয়েছে ১২ বছর আগে। প্রতিবছর সেটির রক্ষণাবেক্ষণে খরচ করা হচ্ছে কোটি টাকা। এরপর সেই একই সড়ক ঝুঁকিমুক্ত করার নামে নেওয়া হয়েছে অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প। গত ১৬ মার্চ থেকে শুরু করা এ কাজে পাঁচটি ভাগের মধ্যে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বেলাল কনস্ট্রাকশন (মূল কাজ রয়েছে র‌্যাব আরসির নামে) প্রথম দুই ভাগ কাজ শেষ করেছে। প্রকল্পের মেয়াদ আগামী ১৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত থাকলেও বাকি তিন ভাগ কাজে হাত দেওয়া হয়নি।

সড়ক বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ইতিমধ্যে জাতীয় এ মহাসড়কের টাঙ্গাইলের এলেঙ্গা অংশে এশিয়ান হাইওয়ের চার লেনের কাজ শুরু হয়েছে। আগামী দেড় থেকে দুই বছরের মধ্যে বগুড়া ও গাইবান্ধার এই ৯৬ কিলোমিটার অংশেও চার লেনের সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু এরই ফাঁকে ভালো সড়কের নিচে আগে থেকে থাকা সাববেজ (খোয়া-বালুর মিশ্রণ), বেসকোর্স (পাথর-বালুর মিশ্রণ) ও বিসি-টপ (কার্পেটিং) তুলে পুরনো মালামাল ব্যবহার করা হচ্ছে। অথচ কাজটির বাজেট তৈরির সময় প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ব্ল্যাক স্পটে কোনো পুরনো মালামাল নেই।

এ বিষয়ে বগুড়ার মির্জাপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আলী মন্টু বলেন, ‘মহাসড়কের পাশে সম্প্রসারিত রাস্তা আগে থেকেই ছিল। সেই রাস্তাটি মেশিন দিয়ে কেটে সেখান থেকে মাটি ও পাথর তুলে নিয়ে অন্যত্র ফেলা হয়েছে। এরপর নিম্নমানের বালু ও খুবই কমসংখ্যক খোয়ার মিশ্রণ দিয়ে তৈরি করা মালামাল দিয়ে খুঁড়ে ফেলা অংশ ভরাট করা হয়েছে। এখন এভাবেই পড়ে রয়েছে রাস্তাটি। এতে মানুষের দুর্ভোগ বেড়েছে। ঝুঁকিও বেড়েছে। ’

বক্তব্য নেওয়ার জন্য ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কুড়িগ্রামের বেলাল কনস্ট্রাকশনের মালিক বেলাল হোসেনের মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করে এবং এসএমএস পাঠিয়ে সাড়া পাওয়া যায়নি।

সড়ক বিভাগের বগুড়া সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী সাদেকুল ইসলাম বলেন, ‘একটি কাজ করতে গেলে কিছু ভুলত্রুটি হয়ে থাকে। অল্প কিছু পুরনো মালামাল ব্যবহারের কথা শুনেছি। বিস্তারিত জানার পর ব্যবস্থা নেব। কাজটি নির্ধারিত সময়ে শেষ করা সম্ভব না। ’

বগুড়া সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুল হালিম বলেন, ‘কোথাও পুরনো মালামাল ব্যবহার করা হচ্ছে না। ’

সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের অধীন সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব এম এ এন সিদ্দিক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ব্ল্যাক স্পট নিয়ে অরাজকতার বিষয়টি সড়ক বিভাগের স্থানীয় কর্মকর্তারা ভালো বলতে পারবেন। তবে এ ব্যাপারে যেকোনো অভিযোগ অবশ্যই তদন্ত করে দেখা হবে। ’


মন্তব্য