kalerkantho

শুক্রবার । ৯ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৮ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


কলাপাড়া
পাখির কলোনি হবে গৈয়াতলা

পথ দেখাচ্ছেন হান্নান খান

জসীম পারভেজ, কলাপাড়া (পটুয়াখালী)   

৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



পথ দেখাচ্ছেন হান্নান খান

পটুয়াখালীর কলাপাড়ার নীলগঞ্জ ইউনিয়নের গৈয়াতলা গ্রামকে পাখির আবাসস্থল করার ব্রত নিয়ে কাজ করছেন হান্নান খান। গ্রামবাসীর সহযোগিতায় এখন ওই গ্রামের তেঁতুলগাছের শাখায় শাখায় পাখিগুলো কলোনি বাসা করে বাচ্চা দিচ্ছে। ছবি : কালের কণ্ঠ

লক্ষ্মীপেঁচার ছয়টি ছানার জীবন রক্ষা করে পুরস্কার পেয়েছিলেন। সেখান থেকে শুরু।

এরপর বিলুপ্তপ্রায় পেঁচায় ভরে যায় তাঁর বাড়ি। এ থেকে গ্রামের অন্যরা তাঁকে দেখে অনুপ্রাণিত হচ্ছেন। পুরো গ্রামকে পাখির কলোনি (আবাস) হিসেবে গড়ে তুলতে চাচ্ছেন তাঁরা।

পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার গৈয়াতলা গ্রামে গিয়ে জানা যায়, পাখি রক্ষা করে হান্নান খান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছ থেকে জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত হন। এতে উল্লসিত ও গর্বিত হয়ে ওঠেন গৈয়াতলা গ্রামের প্রতিটি পরিবারের সদস্যরা। সবাই তাঁর কাছে ছুটে গিয়ে পুরস্কার দেখেন এবং পাখি রক্ষা করার পরামর্শ ও কৌশল জেনে নেন। হান্নানের সাফল্যের গল্প শুনে ধীরে ধীরে গ্রামের অধিকাংশ কৃষকের ভেতর পাখি রক্ষার মানসিকতা তৈরি হয়। সেই থেকে ওই গ্রামের অনেক পরিবার পাখি রক্ষায় উদ্বুদ্ধ হয়ে ওঠে। পুরুষদের পাশাপাশি এগিয়ে আসে নারীরাও।

ওই গ্রামের কৃষক আশ্রাফ আলী হাওলাদার বলেন, ‘আমি প্রতিদিন সকালে চা-মুড়ি খাই। হান্নানের কাছে গল্প শুনে প্রথমদিকে সকালে খাওয়ার সময় কিছু মুড়ি শালিককে ছিটিয়ে দিতাম। আস্তে আস্তে শালিকের সংখ্যা বাড়তে থাকে। এরপর আমার বাড়ির একটি তেঁতুলগাছে গত বছর কয়েকটি বক বাসা বাঁধে। বাড়ির শিশুরা ওই বাসায় ফুটানো বকের বাচ্চা নেওয়ার চেষ্টা করে। আমি তাদের প্রতিহত করি। পাখি সংরক্ষণের বিষয়টি বুঝিয়ে বলি। তারাও পাখি রক্ষায় একাত্মতা ঘোষণা করে। এ বছর আমার তেঁতুলগাছে প্রায় ৩০-৪০টি বক ও পানকৌড়ি কলোনি গড়েছে। বাচ্চাও দিয়েছে। আমি প্রতিবছর ওই গাছ থেকে প্রায় আড়াই মণ তেঁতুল (প্রতি মণ দুই হাজার টাকা দরে) বিক্রি করতাম। কিন্তু বক-পানকৌড়ি আবাস গড়ে তোলায় এবার তেঁতুল বিক্রি করিনি। ওদের নিরাপত্তা ও সংরক্ষণের বিষয়টি প্রাধান্য দিয়েছি। ’

গ্রামের যুবক আরিফ শিকদার জানান, তিনি হান্নান খানের সঙ্গে পাখি রক্ষা এবং নিরাপদ আশ্রয়স্থল তৈরির জন্য গ্রামের বাড়ি বাড়ি ঘোরেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের বাড়ির বিভিন্ন গাছে শালিকের নিরাপদ আশ্রয়স্থল গড়ে উঠেছে। আমার মতো গ্রামের অন্য যুবকরাও এখন পাখি রক্ষায় সচেতন হয়েছে। ’

হান্নান খান এ প্রতিবেদককে নিয়ে ওই গ্রামের আকবর হাওলাদার, আনোয়ার মুন্সি, জাহিদ মৃধা, সৈয়দ মৃধা, মস্তফা হাওলাদার ও জব্বার মোল্লার বাড়ি ঘুরে দেখান। ওই সব বাড়ির বাঁশঝাড়, তেঁতুল, জিলাপি, মেহগনিসহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছে বক, পানকৌড়ি, শালিক ও দোয়েল পাখি বাসা বেঁধেছে। বর্ষা শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বক ও পানকৌড়ি বাসা বেঁধে বাচ্চা ফুটিয়ে গাছগুলো দখলে রেখেছে। গ্রামের বহু কৃষকের বাড়ির গাছে গাছে পাখির কলকাকলিতে সকাল-বিকেল মুখরিত হয়ে উঠছে।

পাখি সম্পর্কে পড়াশোনাও শুরু করেছেন হান্নান। তিনি গাছে বাসা বেঁধে বাচ্চা দেওয়া বক সম্পর্কে বলেন, ‘এগুলোর বৈজ্ঞানিক নাম ইগরেটা গার্জেট্টা। এই প্রজাতির বক গুঁড়ো মাছ, ব্যাঙ ও কৃষকের ক্ষেতের ক্ষতিকারক পোকা-মাকড় খেয়ে জীবনধারণ করে। এই বক পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় ভূমিকা রাখে। ’

উল্লেখ্য, ২০১৩ সালে হান্নানের বাড়ির তালগাছের কোটরে ছয়টি লক্ষ্মীপেঁচার ছানা ছিল। ছানাগুলো নিয়ে স্থানীয় বিদ্যালয়ের শিশুশিক্ষার্থীরা খেলছিল। তাদের হাত থেকে বাচ্চাগুলো রক্ষা করেন তিনি। পরে উড়ে যাওয়ার আগ পর্যন্ত নজরে রাখেন। এ ঘটনা নিয়ে ওই বছর ১১ মার্চ কালের কণ্ঠে ‘তালগাছের কোটরে লক্ষ্মীপেঁচার ছানা’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদনটি প্রধানমন্ত্রীর নজরে আসে। তাঁর নির্দেশনায় বন বিভাগ প্রতিবেদনের সত্যতা সম্পর্কে খোঁজখবর নেয়। পরে ২০১৪ সালের ৬ জুন প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে সোনার মেডেল নেন তিনি। সে সময় প্রধানমন্ত্রী তাঁকে পাখি সংরক্ষণের কাজ অব্যাহত রাখার পরামর্শ দেন। এর পর থেকে তিনি গ্রামের গাছে গাছে পাখির নিরাপদ আবাসস্থল গড়ে তোলার জন্য অন্যদের উদ্বুদ্ধ করেন।

হান্নান খান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘প্রতিবছর ডিসেম্বরে আমার বাড়ির পাশে মরা তাল ও নারিকেলগাছের কোটরে লক্ষ্মীপেঁচা ডিম দিয়ে বাচ্চা ফুটাচ্ছে। ফেব্রুয়ারিতে ছানাগুলো উড়ে যায়। ২০১৩ সাল থেকে আমি লক্ষ্মীপেঁচা রক্ষার কাজ শুরু করেছি। এখন শুধু গৈয়াতলা গ্রামেই নয়, লক্ষ্মীপেঁচার বংশ বিস্তার হয়ে নীলগঞ্জ ইউনিয়নের প্রতিটি গ্রামে ছড়িয়ে পড়েছে। আমার উদ্দেশ্য এই গ্রামকে শুধু লক্ষ্মীপেঁচা নয়, সব পাখির কলোনি হিসেবে গড়ে তোলা। ’

এ বিষয়ে নীলগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট নাসির মাহমুদ বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে হান্নান খান জাতীয় পুরস্কার গ্রহণ করেছেন। এতে আমরা নীলগঞ্জবাসী গর্বিত। তিনি পাখি সংরক্ষণ ও আবাস নির্মাণে যথেষ্ট সচেতন। তাঁর কার্যক্রমের জন্য গ্রামের সবাই সহযোগিতা করছে। নির্বাচনের পর আমরা নতুন পরিষদের দায়িত্ব নিয়েছি। পরিষদের উদ্যোগে তাঁকে সহযোগিতা করার জন্য পদক্ষেপ নিব। ’

কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার দায়িত্বে থাকা সহকারী কমিশনার (ভূমি) দীপক কুমার রায় বলেন, ‘তাঁকে আর্থিক কিংবা পরামর্শ দিয়ে সহযোগিতার বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অবহিত করা হয়েছে। আমরাও চাই, তাঁর মতো উপকূলীয় এলাকার সব মানুষ প্রাণ-প্রকৃতি রক্ষায় এগিয়ে আসুক। ’


মন্তব্য