kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৮ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৭ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।

ভোলা

মেঘনায় দস্যুর ভয়

শিমুল চৌধুরী, ভোলা   

৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



মেঘনায় দস্যুর ভয়

শেরপুরের শ্রীবরদী উপজেলার পাহাড়ি জুলগাঁও গ্রামে বন্য হাতি এক কৃষকের টংঘর গুঁড়িয়ে দেয়। এতে কৃষক দুদু মিয়া নিহত হয়েছেন। ছবিটি গতকালের। ছবি : কালের কণ্ঠ

ভোলার নদ-নদী ও সাগরে জেলেদের জালে কাঙ্ক্ষিত রুপালি ইলিশ ধরা পড়তে শুরু করেছে। আর এ সুযোগে জলদস্যুরাও তৎপর হয়ে উঠেছে।

গত এক মাসে মেঘনা নদীতে অন্তত ১৫টি ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে। গত ১০ দিনে শুধু মনপুরার মেঘনা নদীতেই অন্তত চারটি ডাকাতি সংঘটিত হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ভোলার মনপুরার মেঘনা নদীতে গত শুক্রবার সকালে জেলেদের ওপর হামলা চালিয়েছে হাতিয়ার জলদস্যু আলাউদ্দিন বাহিনী। মনপুরার বদনার চরসংলগ্ন মেঘনা নদী থেকে মাছ ধরা অবস্থায় এ হামলা চালানো হয়। এ সময় ছয় জেলেকে অপহরণ করে নিয়ে যায় তারা। মুক্তিপণের দাবিতে জেলেদের অপহরণ করলেও পরে পুলিশ ও কোস্ট গার্ডের অভিযানের মুখে দুপুরে জেলেদের ছেড়ে দেয় তারা।

ভোলার মনপুরার মেঘনা নদীতে গত বৃহস্পতিবার গভীর রাতে সশস্ত্র জলদস্যুরা জেলেদের ওপর হামলা চালিয়েছে। এ সময় ট্রলারসহ এক জেলেকে অপহরণ করে নিয়ে যায় তারা। অপহৃত জেলে ও ট্রলার ছাড়িয়ে আনতে জলদস্যু বাহিনীর প্রধান জলদস্যু সম্রাট আলাউদ্দিন তিন লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করছে। দুই দিন পর মুক্তিপণ দিয়ে ছাড়া পান অপহৃত জেলে রাকিব।

মনপুরার রামনেওয়াজ মৎস্য ঘাটের আড়তদার ও স্থানীয় জেলে সূত্রে জানা যায়, সোহরাব মাঝি ও রাকিব মাঝি বৃহস্পতিবার উপজেলার জাগলা চরসংলগ্ন মেঘনা নদীতে ইলিশ ধরার জন্য জাল ফেলেন। রাত সাড়ে ১২টার দিকে হাতিয়ার জলদস্যু বাহিনীর প্রধান আলাউদ্দিন, কৃষ্ণ, রুবেল ও আরিফ বাহিনী জাগলার চর থেকে ট্রলারযোগে অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে তাদের ওপর হামলা চালায়। উপর্যুপরি গুলি ছুড়তে থাকে। একপর্যায়ে উভয় ট্রলারের জেলেদের বেঁধে জাগলা চরে নিয়ে যায়। তবে সোহরাব মাঝি মেঘনা নদীতে ঝাঁপিয়ে রক্ষা পান। রাকিবকে ছাড়ার ক্ষেত্রে দুই লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়। এ নিয়ে চলছে দর কষাকষি। তা ছাড়া সোহরাব মাঝির ট্রলারের জন্য চাওয়া হয় এক লাখ টাকা।

স্থানীয় আড়তদার ও জেলেরা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানায়, যেখানে জলদস্যুরা জেলেদের ওপর হামলা চালায়, সেখান থেকে কোস্ট গার্ড ক্যাম্পের দূরত্ব মাত্র দেড় কিলোমিটার। কোস্ট গার্ড ইচ্ছা করলে এক ঘণ্টার মধ্যে জলদস্যুদের আটক করতে পারে। জেলেদের অভিযোগ, কোস্ট গার্ডের সঙ্গে যোগসাজশ করে জলদস্যুরা মেঘনায় জেলেদের অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায় করে। এর একটি অংশ পান হাতিয়ার কোস্ট গার্ড সদস্যরা। এলাকাবাসীর অভিযোগ, দিনের পর দিন নদীতে একের পর এক ঘটনা ঘটেই যাচ্ছে। এর মধ্য দিয়ে শত শত জেলেকে প্রাণ দিতে হয়েছে। অনেকে নিখোঁজ। এ অবস্থায় ভয়ে জেলেরা নদীতে মাছ ধরতে যেতে চায় না। কিন্তু জেলেদের সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হচ্ছে পুলিশ ও কোস্ট গার্ড।

এদিকে মনপুরার মেঘনায় প্রতিনিয়ত জলদস্যুদের হামলার ভয়ে জেলেদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। মেঘনায় রাতে জেলেরা ইলিশ মাছ ধরতে সাহস পাচ্ছে না। এ অবস্থায় মেঘনায় পুলিশ প্রশাসনসহ স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সাধারণ জনগণের সমন্বয়ে শনিবার রাতে তিনটি বোট নিয়ে জলদস্যুদের ধরার জন্য চরপাতালিয়ায় অভিযান চালানো হয়। অভিযানে জলদস্যুদের ব্যবহৃত একটি বোট উদ্ধার করলেও কোনো জলদস্যুকে আটক করা সম্ভব হয়নি।

অভিযানে অংশ নেওয়া দক্ষিণ সাকুচিয়া ইউপি চেয়ারম্যান অলিউল্লাহ কাজল বলেন, ‘দক্ষিণ সাকুচিয়া ইউনিয়নসংলগ্ন চরপাতালিয়া চরে জলদস্যুদের একটি বোট দুপুর ২টার দিকে বালুভাঙ্গা খালের ভেতর ঢোকার খবর পাই। তাৎক্ষণিকভাবে হাতিয়া জোনের কোস্ট গার্ড ও মনপুরা থানার পুলিশকে জানাই। জলদস্যুদের ধরার জন্য ৩০০-৪০০ লোক নিয়ে বিকেল ৩টা থেকে অপেক্ষা করতে থাকি। কিন্তু কোস্ট গার্ড ও পুলিশ আসে রাত ৮টার দিকে। পরে রাত ১১টার দিকে চরপাতালিয়ার বালুভাঙ্গা খালের ভেতর থেকে জলদস্যুদের ব্যবহৃত একটি বোট উদ্ধার করি। বর্তমানে সেটি পুলিশ হেফাজতে রয়েছে। ’

এ ব্যাপারে মনপুরা থানার এসআই হাদিস উল্লাহ বলেন, ‘দীর্ঘ তিন ঘণ্টার অভিযানে আমরা জলদস্যুদের ব্যবহৃত একটি বোট উদ্ধার করি। তবে কোনো জলদস্যুকে গ্রেপ্তার করতে পারিনি। দিনের বেলা হলে জলদস্যুদের ধরা যেত। এ অভিযান অব্যাহত থাকবে। ’

মনপুরা থানার ওসি মো. শাহিন খান কালের কণ্ঠকে বলেন, গত ৯ দিনে মনপুরার মেঘনা নদীতে দু-তিনটি ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে। হাতিয়ার জলদস্যু বাহিনীর প্রধান আলাউদ্দিন বাহিনী মেঘনা থেকে গত দু-তিন দিনে ১৩ জেলেকে অপহরণ করে নিয়ে যায়। পরে অবশ্য পুলিশ ও কোস্ট গার্ড সদস্যরা অভিযান চালিয়ে অপহৃত জেলেদের উদ্ধার করেন।

এ ব্যাপারে হাতিয়া জোনের কোস্ট গার্ড প্রধান লে. কমান্ডার ওমর ফারুক বলেন, ‘আমরা জলদস্যুদের হামলার ঘটনা শোনার সঙ্গে সঙ্গে মেঘনায় অভিযান চালাই। সর্বশেষ অপহৃত জেলে ও ট্রলার উদ্ধার করতে মেঘনায় অভিযান অব্যাহত রাখা হয়েছে। ’

তবে এ বিষয়ে পুলিশ সুপার মোকতার হোসেন কালের কণ্ঠকে জানান, ভোলার মেঘনা ও তেঁতুলিয়া নদী এলাকায় জলদস্যুরা শান্ত রয়েছে। শুধু মনপুরায় দু-একটি ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে। এ বিষয়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জেলেরা আড়তদারসহ বিভিন্ন লোকের কাছ থেকে দাদন নিয়ে নদীতে মাছ ধরছে। ওই দাদনের টাকা পরিশোধ করতে না পেরে অনেক জেলে ডাকাতির নাটক সাজাচ্ছে।


মন্তব্য