kalerkantho

শনিবার । ৩ ডিসেম্বর ২০১৬। ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ২ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


মেঘনায় নৌযানে চাঁদাবাজি

আইনশৃঙ্খলা সভায় উষ্মা, আলটিমেটাম

সোনারগাঁ (নারায়ণগঞ্জ) প্রতিনিধি   

১ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ উপজেলার মেঘনা নদীতে বিভিন্ন নৌযান থেকে প্রতিদিন মোটা অঙ্কের চাঁদা আদায় করা হচ্ছে। এদিকে চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানানোয় গত এক সপ্তাহে অন্তত ২৫ জন নৌযান শ্রমিককে মারধর করা হয়েছে।

গতকাল বুধবার উপজেলায় আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় চাঁদাবাজদের অবিলম্বে গ্রেপ্তার করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়। আগামী ১৫ দিনের মধ্যে চাঁদা তোলা বন্ধ না হলে নৌযান ধর্মঘটসহ কঠোর আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দেন নৌযান শ্রমিক-কর্মচারী ইউনিয়নের নেতারা।

নৌযান মালিক ও শ্রমিকরা জানায়, উপজলার মেঘনা নদী দিয়ে সিলেট, সুনামগঞ্জ, ছাতক, টেকেরহাটসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে ছেড়ে আসা বালুবাহী বাল্কহেড, পাথর ও কয়লাবাহী জাহাজসহ বিভিন্ন নৌযানে হানা দিয়ে অস্ত্রের মুখে মোটা অঙ্কের চাঁদা আদায় করা হচ্ছে। মেঘনা সেতু এলাকায় জাকির মিয়া ও তাঁর সহযোগী মোহাম্মদ আলী, আল আমিন এবং শম্ভুপুরা এলাকায় নাছির বাহিনীর সদস্যরা এসব চাঁদা তুলছে। নৌ পুলিশ ও বিআইডাব্লিউটিএর কিছু দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারীর সঙ্গে যোগসাজশ করে ওই চাঁদা তুলছে সন্ত্রাসীরা। গত ১৯ আগস্ট মেঘনা ঘাট এলাকার জাকির বাহিনীর সদস্যরা অনামিকা সাদিয়া বালুবাহী বাল্কহেডের সুকানি নিজাম উদ্দীন খানকে পিটিয়ে জখম করে তাঁর সঙ্গে থাকা সাত হাজার টাকা ও মোবাইল ফোনসেট ছিনিয়ে নেয়। ২৪ আগস্ট এমবি আরজু পাথরবাহী জাহাজের লস্কর রফিক মিয়াকে পিটিয়ে আহত করে ছয় হাজার ২০০ টাকা, মোবাইল ফোনসেটসহ মালামাল নিয়ে যায়। গত ২৩ আগস্ট পাঁচ ভাই বাল্কহেডের চালক জাফর মিয়া ও শ্রমিক কামাল হোসেনকে মারধর করে পাঁচ হাজার টাকা, ২৫ আগস্ট রোস্তম আলী বাল্কহেডের চালক জাকির মিয়াকে মারধর করে তাঁর কাছ থেকে ১৬ হাজার ২০০ টাকা নিয়ে যায়।

মেঘনা নদীর শম্ভুপুরা এলাকার আওয়ামী লীগ নেতা নাছির উদ্দীন মেম্বারের নেতৃত্বে তাঁর সহযোগী জুবে আলম খোকন, জানে আলম, হানিফ মিয়া ও বাদশা মিয়া গত ২৭ আগস্ট এমভি ডেমরা কার্গোর সুকানি খাইরুল ইসলামকে পিটিয়ে জখম করে সাড়ে চার হাজার টাকাসহ মালামাল নিয়ে যায়। ২৮ আগস্ট মায়ের দোয়া কার্গোর সুকানি রফিকুল ইসলামকে পিটিয়ে সাড়ে তিন হাজার টাকা ও মোবাইল ফোনসেট, ৩০ আগস্ট শাহীন ও তামিম নামের একটি বাল্কহেডের চালক রুহুল আলমকে দুই দিন ধরে আটকে রেখে ২০ হাজার টাকা আদায় করে পরে ছেড়ে দেওয়া হয়। গত এক সপ্তাহে এমন অন্তত ২৫ জন শ্রমিক ও চালককে মারধর করে তাঁদের সর্বস্ব লুটে নেওয়া হয়।

অনুসন্ধান চালিয়ে জানা যায়, মেঘনা সেতুর পূর্ব পাশে বিআইডাব্লিউটিএ থেকে ঘাটের ইজারা নেন স্থানীয় যুবলীগকর্মী জাকির হোসেন। অভিযোগ রয়েছে, সহযোগীদের নিয়ে তিনি নদীতে নৌযান শ্রমিকদের অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে নগদ টাকা, মোবাইল ফোন, মালামালসহ সর্বস্ব লুটে নেন। কেউ চাঁদা দিতে অস্বীকার করলে তাদের মারধর করে নদীতে ফেলে দেওয়া হয়। উপজেলার শম্ভুপুরা এলাকায় বন্দর উপজেলার জাতীয় পার্টির নেতা নান্নু মিয়া মেসার্স রিফাত এন্টারপ্রাইজের নামে বালুমহাল ইজারা নেন। তিনিও শম্ভুপুরার আওয়ামী লীগ নেতা স্থানীয় ইউপি সদস্য নাছির উদ্দীনের নেতৃত্বে নৌযানগুলোতে লুটপাট চালান। জামাল হোসেন হত্যা মামলার প্রধান আসামি নাছির উদ্দীন মেম্বার কিছুদিন পলাতক থাকলেও আবার এলাকায় এসে চাঁদাবাজি শুরু করেছেন।

আহত শ্রমিক জাফর মিয়া ও জামাল হোসেন বলেন, ‘মেঘনা সেতু এলাকায় জাকির হোসেন ও শম্ভুপুরা এলাকায় নাছির উদ্দীন মেম্বারের লোকজন অস্ত্রের মুখে আমাদের জিম্মি করে টাকা-পয়সাসহ সব কিছু লুট করে নিয়ে যায়। তাদের কাছে আমরা অসহায় হয়ে পড়েছি। ’

ফাহিম তামিম নৌযানের মালিক ফাইজুল ইসলাম বলেন, ‘মেঘনা নদীতে যেভাবে চাঁদা আদায় করা হচ্ছে, এ অবস্থা চলতে থাকলে ব্যবসা বন্ধ করে দেওয়া ছাড়া উপায় দেখছি না। ’ তবে নাছির উদ্দীন মেম্বার ও জাকির হোসেনের দাবি, তাঁরা নৌযানে চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত নন।

স্থানীয় পিরোজপুর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মাসুদুর রহমান মাসুম গতকাল আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় বলেন, মেঘনা নদীতে চাঁদাবাজদের দৌরাত্ম্য দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে।

বাংলাদেশ নৌযান শ্রমিক-কর্মচারী ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক সবুজ শিকদার ও ডেমরা শাখার সভাপতি জাকির হোসেন বলেন, মেঘনা নদীতে জাকির ও নাছির বাহিনী অস্ত্রের মুখে চাঁদাবাজি করছে। তাদের বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ করেও কোনো ফল পাওয়া যাচ্ছে না। আগামী ১৫ দিনের মধ্যে চাঁদা আদায় বন্ধ না হলে শ্রমিকদের সঙ্গে নিয়ে নৌযান ধর্মঘটসহ কঠোর আন্দোলন কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।

বিআইডাব্লিউটিএ নারায়ণগঞ্জের যুগ্ম পরিচালক আরিফুল ইসলাম জানান, নদীতে নৌযানে চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

নৌ পুলিশের পূর্ব বিভাগের প্রধান আব্দুল মান্নান কালের কণ্ঠকে বলেন, বৈদ্যের বাজার ও মেঘনা সেতু এলাকায় শিগগিরই অস্থায়ী পুলিশ ক্যাম্প স্থাপনের পাশাপাশি টহলের ব্যবস্থা করা হবে। নৌ পুলিশের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ পেলে তাদেরও ছাড় দেওয়া হবে না।

নারায়ণগঞ্জ-৩ সোনারগাঁ আসনের সংসদ সদস্য লিয়াকত হোসেন খোকা জানান, নৌযানে চাঁদাবাজি কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না। চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পুলিশকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।


মন্তব্য