kalerkantho


আফরিদা খুঁজে পেলেন ঠিকানা

গোপালগঞ্জ

প্রসূন মণ্ডল, গোপালগঞ্জ   

৩ এপ্রিল, ২০১৬ ০০:০০



আফরিদা খুঁজে পেলেন ঠিকানা

বিয়ের পর বর নাফিউর আসাদ রুবেলের সঙ্গে আফরিদা খাতুন। ছবি : কালের কণ্ঠ

কাচ্চি বিরিয়ানি, মুরগির রোস্ট, ডিম ভুনা, দই, মিষ্টি ও কোমল পানীয়তে আপ্যায়ন। বরযাত্রী ৮০ জন।

কনের বাড়ির লোক মিলে ৫০০ জনের আয়োজন। চারপাশে রঙিন পতাকায় সাজসাজ রব। উৎসবের গান বাজছে, তরুণ-তরুণীরা নাচছে। উপহার হিসেবে এসেছে রঙিন টেলিভিশন, ফ্রিজ, ডিনার সেট, সেলাইমেশিন, মুদি দোকানের মালামালসহ অন্যান্য গৃহস্থালি পণ্য। কোনো কিছুর কমতি নেই। কিন্তু যার জন্য এত আয়োজন, সেই মেয়ের আনন্দ অন্যখানে। ১৯ বছর তাঁর কোনো ঠিকানা ছিল না। এবার তিনি সেই ঠিকানা পেলেন।

কনে আফরিদা খাতুনের এক বছর বয়সে ঠাঁই হয়েছিল রাজশাহীর শিশুনিবাসে।

ছয় বছর বয়সে তাঁকে পাঠানো হয় নওগাঁ শিশু পরিবারে। সেখান থেকে যশোর শিশু পরিবার হয়ে টুঙ্গীপাড়া শেখ রাসেল দুস্থ শিশু প্রশিক্ষণ ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে ঠাঁই হয়। মেয়েটি মা-বাবার নাম জানেন না। দেখতে দেখতে বছর পেরিয়ে শিশু থেকে কৈশোর-যৌবনে পা দেন। তাঁকে পুনর্বাসনের জন্য সমাজসেবা অধিদপ্তর ও টুঙ্গীপাড়া উপজেলা প্রশাসনের এত দিন চিন্তার অন্ত ছিল না। এবার তাদের সেই চিন্তা দূর হলো। তাই বিয়ের অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন খোদ জেলা প্রশাসক মো. খলিলুর রহমান। আরো ছিলেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মোমিনুর রহমান, টুঙ্গীপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শফিউল্লাহ, সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপপরিচালক সমীর মল্লিক, ওই প্রতিষ্ঠানের সহকারী পরিচালক ফারহানা নাসরিন। এ ছাড়া স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও আশাশুনি উপজেলার কাদাকাটি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান দিপংকর সরকার, বরের চাচা আব্দুস সালাম সরদার উপস্থিত ছিলেন।

গত শুক্রবার সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার তেঁতুলিয়া গ্রামের শহীদুল ইসলাম সরদারের ছেলে নাফিউর আসাদ রুবেলের সঙ্গে মেয়েটির বিয়ে হয়। দুই লাখ টাকা দেনমোহর ধার্য হয়। অনুষ্ঠানে মেয়ের উকিল বাবা ছিলেন পুনর্বাসন কেন্দ্রের হাউস প্যারেন্ট মো. কামরুজ্জামান ঠাকুর। বিয়ে পড়ান মওলানা আব্দুল কাইয়ুম।

এই বিয়ে উপলক্ষে গোপালগঞ্জের শেখ রাসেল দুস্থ শিশু প্রশিক্ষণ ও পুনর্বাসন কেন্দ্র রঙিন পতাকা ও লাল-নীল-বেগুনি রঙের কাগজের নিশান টাঙিয়ে সাজানো হয়। গত বৃহস্পতিবারের গায়েহলুদ ও শুক্রবার বিভিন্ন অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে দিনভর চলে নানা অনুষ্ঠানিকতা। পুনর্বাসন কেন্দ্রটির ৩০০ নিবাসী (মেয়ে) আনন্দে মেতে ছিল। সাউন্ড বক্স বাজিয়ে নেচে-গেয়ে আনন্দ করে তারা। বিকেলে নতুন দম্পতিকে স্থানীয় রীতিতে দুধভাত খাইয়ে সব আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে বিদায় জানানো হয়।

কনে আফরিদা তাঁর অনুভূতি ব্যক্ত করতে গিয়ে বলেন, ‘আমি ছোটবেলা থেকে বিভিন্ন হোমে বড় হয়েছি। মা-বাবা নেই, তা কখনো বুঝতে পারিনি। সব সময় হোমের বোনদের সঙ্গে লেখাপড়া ও খেলাধুলা করে বড় হয়েছি। শিক্ষকরা ছিলেন আমার মা-বাবার মতো। আজ আমাকে যেভাবে স্বামীর বাড়ি পাঠানো হলো, তা আমার জন্য বিরাট পাওয়া। কারণ ধনাঢ্য বাড়ির বিয়েতেও এত গণ্যমান্য ব্যক্তি উপস্থিত থাকেন না। যা আমার ক্ষেত্রে হয়েছে। আমি দাম্পত্য জীবনে সবার দোয়া ও আশীর্বাদ কামনা করি। যাতে শ্বশুর-শাশুড়িকে মা-বাবার আসনে বসিয়ে আগের অভাব পূরণ করতে পারি। ’

বর নাফিউর আসাদ রুবেল বলেন, ‘স্ত্রীকে নিয়ে আগামী দিনের একটি সুন্দর স্বপ্ন দেখছি। আমি মা-বাবার একমাত্র ছেলে। বাবা প্রবাসে। মেয়েটির না ছিল কোনো পরিচয়, না ছিল কোনো সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য। তার কষ্টের কথা ভেবে মা-বাবাকে রাজি করিয়ে বিয়ে করতে পেরে নিজেকে গর্বিত মনে করছি। আমার কারণে তাঁর একটি নতুন ঠিকানা হলো। আমি তাকে সুখে রাখব, সুন্দর জীবন যাপন করব। ’

শেখ রাসেল দুস্থ প্রশিক্ষণ ও পুর্নবাসন কেন্দ্রের সহকারী পরিচালক ফারহানা নাসরিন বলেন, ‘১৮ বছর পূর্ণ হওয়ায় প্রতিষ্ঠানের নিয়মানুযায়ী মেয়েটির আর এখানে রাখার সুযোগ ছিল না। তাকে আমরা বিভিন্ন প্রশিক্ষণ পুনর্বাসনে চেষ্টা করেছি। মা-বাবা বা আত্মীয়স্বজনের পরিচয় জানি না। এদিকে তার বিয়ের বয়সও হয়েছে। ’

গোপালগঞ্জ সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপপরিচালক সমীর মল্লিক বলেন, ‘আট-দশটা মেয়ের যেমন বিয়ে হয়, আমরা তেমন অনুষ্ঠানিকতাই করেছি। কমতি রাখিনি, যাতে সে মনে না করে তার মা-বাবা নেই। আমরা তার অভিভাবকের অভাব পূরণের চেষ্টা করেছি। ’

টুঙ্গীপাড়ার ইউএনও মো. শফিউল্লাহ বলেন, ‘উপজেলা প্রশাসন ও সমাজসেবা অধিদপ্তর মেয়েটির একটি নতুন ঠিকানা দিতে পেরে আনন্দিত। এই নতুন দম্পতি যাতে সুখে থাকতে পারে তার জন্য আমাদের সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে। আগামীতেও আমরা খবর রাখব ও সব ধরনের সহযোগিতা দেওয়ার চেষ্টা করব। ’


মন্তব্য