kalerkantho


দুপুরের আগে ভোট শেষ

শরীফ আহেমদ শামীম, গাজীপুর   

১ এপ্রিল, ২০১৬ ০০:০০



দুপুরের আগে ভোট শেষ

সকাল ৮টার আগে জামালপুর ১ নম্বর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে ভোটারদের দীর্ঘ লাইন। বাইরে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ। পুলিশ ও প্রশাসন তত্পর। উৎসাহ নিয়ে বুথে প্রবেশ করলেও হতাশ মুখে বের হচ্ছেন ভোটাররা। কারণ, সদস্যদের ভোট গোপন কক্ষে দিতে পারলেও চেয়ারম্যান পদের ব্যালটে সিল দিতে হয়েছে প্রকাশ্যে, নৌকার এজেন্টের সামনে। শুধু এ কেন্দ্র নয়, গতকাল বৃহস্পতিবার গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলার সাতটি ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনে বেশির ভাগ কেন্দ্রে দেখা গেছে এমন চিত্র।

দিনভর কালীগঞ্জ ঘুরে দেখা যায়, বেশির ভাগ কেন্দ্রে শুরুতে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ থাকলেও বৃষ্টির পর হয়ে ওঠে অশান্ত ও ভীতিকর। সকাল ১১টার পর মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হলে বিএনপি ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের এজেন্ট ও সমর্থকদের বের করে দিয়ে উপজেলার প্রায় সবকটি কেন্দ্রে দখল করে নেয় আওয়ামী লীগের চেয়ারম্যান প্রার্থী ও নেতাকর্মীরা। চলে ব্যালটে সিল মারার উৎসব। আর এতে অসহায় হয়ে পড়েন বিএনপি ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের সমর্থক ভোটার ও তাঁদের এজেন্টরা। কোনো কোনো কেন্দ্রে অন্য প্রার্থীর এজেন্ট ও সমর্থকদের মারধর করা হয়। এ সময় অনেক কেন্দ্রে পুলিশকে নিরব দর্শকের মতো দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে। প্রার্থীদের অভিযোগ, তাঁরা পুলিশ ও প্রশাসনের সহযোগিতা চেয়ে পাননি।

জামালপুর ইউপির জামালপুর ১ নম্বর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও বেগম সাহিদা মোল্লা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্র দুটির অবস্থান পাশাপাশি। সকাল সাড়ে ৯টায় ওই দুই কেন্দ্রে গিয়ে দেখা গেল, নারী-পুরুষ অনেক ভোটার ফিরে যাচ্ছেন হতাশ মুখে। হোলারটেকের ভোটার জোসনা বেগম বলেন, ‘ভোট দিতে গিয়েছিলাম। কিন্তু সবাইকে চেয়ারম্যানের ভোট নৌকা মার্কায় প্রকাশ্যে দিতে হয়েছে এজেন্টের সামনে। ’

ওই দুই কেন্দ্রে ভোট পাঁচ হাজারের বেশি। বর্তমান ইউপি চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী খাইরুল আলমের বাড়ির পাশে এর অবস্থান। কেন্দ্রটি দখল নিতে মরিয়া হয়ে ওঠেন আওয়ামী লীগের প্রার্থী ফারুক মাস্টার ও তাঁর লোকজন। প্রকাশ্যে সিল মারার প্রতিবাদ করলে খাইরুলের বড় ভাই আবদুল আউয়াল বাদল, স্ত্রীর বড় ভাই আতিকুর রহমান, চাচাতো ভাই রফিকুল ইসলামকে মারধর করা হয়। তাঁদের ভোটকেন্দ্র থেকে বের করে দেওয়া হয়। খবর পেয়ে খাইরুল গেলে তাঁকেও নাজেহাল হতে হয়। এ সময় পুলিশ ও প্রশাসনের সহযোগিতা চেয়েও পাননি তিনি। দুপুর ১১টার দিকে কেন্দ্র দুটি দখলে নিয়ে সিল মারা শুরু করা হয়। দুপুরের পর ওই কেন্দ্র দুটি ছিল ভোটারশূন্য। ভোটারদের মাঝপথ থেকে ফেরত যেতে দেখা গেছে। খাইরুল অভিযোগ করে বলেন, ‘উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক আবু বক্কর সিদ্দিক, উপজেলা যুবলীগ সভাপতি আলমগীর হোসেন, উপজেলা যুবলীগের সদস্য মোজাম্মেল হোসেনের নেতৃত্বে দখল ও হামলা হয়। ’

ওই কেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপপরিদর্শক (এসআই) বিনয় কুমার বলেন, ‘কোনো অনিয়ম হয়নি। কেন্দ্রও দখল হয়নি। ’ এজেন্টের সামনে প্রকাশ্যে সিল ও কেন্দ্র দখল করে সিল দেওয়ার বিষয়টি দেখালে বলেন, ‘বুথের ভেতরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের প্রবেশের নিয়ম নেই। ’

সকাল ১১টার দিকে জামালপুরের কলাপটুয়া কেন্দ্রে গিয়ে দেখা গেছে, বিএনপি ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের এজেন্ট ও কর্মী-সমর্থকরা বুকে নৌকা প্রতীক লাগিয়ে ঘুরছেন। জানতে চাইলে বিএনপির এজেন্ট আবু বকর বলেন, ‘সকালে আওয়ামী লীগের চেয়ারম্যান প্রার্থী ফারুক মাস্টার এসে বলে গেছেন, কেন্দ্রে থাকতে হলে বুকে নৌকা থাকতে হবে। ’ দুপুর ১২টার পর ওই কেন্দ্রে শুরু হয় সিল উৎসব। দখলের সময় বাধা দেওয়ায় ওই কেন্দ্রে বিদ্রোহী প্রার্থীর কর্মী সোহাগ, মুনসুর ও জয়নালকে কুপিয়ে আহত করা হয়।

উল্লেখ্য, গত বুধবার কালের কণ্ঠ’র প্রিয় দেশ পাতায় ‘ভোটের ভূরিভোজ আয়োজনে ওসি’ শিরোনামে কালীগঞ্জের নির্বাচনী অনিয়ম নিয়ে সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। ওই দিন সকালে ওসি মো. মুস্তাফিজুর রহমানকে প্রত্যাহার করা হয়। নির্বাচন কমিশনের নির্দেশে তাঁকে প্রত্যাহার করেন গাজীপুরের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ হারুন অর রশিদ। কিন্তু, ওসি বদল হলেও ভোটের আগে যে আশঙ্কা নৌকা প্রতীকের বিরোধী প্রার্থীরা করেছিলেন, তাই সত্যি হয়েছে।

চার প্রার্থীর নির্বাচন বর্জন

নির্বাচনে অনিয়ম ও কারচুপির অভিযোগ এনে দুপুরের পর চার প্রার্থী নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেন।

জামালপুর ইউপির আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী খাইরুল আলম বলেন, ‘প্রতিটি কেন্দ্র দখল করে আওয়ামী লীগের প্রার্থীর পক্ষে সিলমারা হয়েছে। আমার কর্মীদের হামলা করা হয়েছে। এতে ১৩ জন আহত হয়েছে। ছয়জনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। পুলিশ, নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসনকে জানিয়ে কোনো প্রতিকার পাইনি। ’

ওই ইউপির বিএনপির প্রার্থী হারুন-অর-রশিদ অভিযোগ করেন, ‘ভোটারদের কাছ থেকে ব্যালট পেপার ছিনিয়ে নিয়ে নৌকায় সিল মেরেছে। সকাল থেকে নৌকার লোকজন লাঠিসোঁটা নিয়ে সব কেন্দ্র থেকে আমার নির্বাচনী এজেন্টদের বের করে দিয়েছে। এ কারণে নির্বাচন বর্জনের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। ’

বাহাদুরসাদী ইউপির বিএনপির চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী জয়নাল আবেদীন শেখ বলেন, ‘নৌকার কর্মীরা কেন্দ্রে প্রবেশ করে ব্যালট পেপার ছিনিয়ে নিয়ে সিল মেরে বাক্সে ফেলছে। আমার এজেন্টদের কেন্দ্র থেকে বের করে দিয়েছে। ’

এ ছাড়া মুক্তারপুর ইউপির বিএনপির প্রার্থী মো. রফিকুল ইসলাম নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দিয়েছেন।

এ বিষয়ে রিটার্নিং অফিসার (কালীগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা) মো. শাহ আলম বলেন, ‘তাদের বর্জনের বিষয়টি শুনেছি। দুই-একটি এলাকায় বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোট হয়েছে। কোথাও কোনো গোলযোগ ঘটেনি। ’


মন্তব্য