kalerkantho


শ্যালককে জেতাতে ভোটকেন্দ্রে এমপি

লিমন বাসার, বগুড়া   

১ এপ্রিল, ২০১৬ ০০:০০



শ্যালককে জেতাতে ভোটকেন্দ্রে এমপি

ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে গতকাল বগুড়ার শিবগঞ্জের রায়নগর ইউনিয়নের মাহী সাওয়ার ডিগ্রি কলেজ কেন্দ্রে নেতাকর্মী ও পুলিশকে নির্দেশনা দিচ্ছেন বগুড়া-৩ আসনের সংসদ সদস্য শরীফুল ইসলাম জিন্নাহ (সাদা শার্ট); ইনসেটে ভোটকেন্দ্রের সামনে সংসদ সদস্যের গাড়ি। ছবি : কালের কণ্ঠ

বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলার রায়নগর ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনে চেয়ারম্যান প্রার্থী ফিরোজ আহম্মেদ রিজু। তাঁর বোনের স্বামী বগুড়া-৩ (শিবগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য (এমপি) শরিফুল ইসলাম জিন্নাহ।

জেলা জাতীয় পার্টির সভাপতি ও বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত এই এমপি গতকাল বৃহস্পতিবার ভোট দিতে কেন্দ্রে গিয়েছিলেন। ভোট দেওয়ার পর তাঁকে কেন্দ্রে প্রভাব বিস্তার করতে দেখা গেছে।

ঘটনার সূত্রপাত সকাল সাড়ে ৯টায়। পর‌্যাপ্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কড়া নজরদারির মধ্যে ভোট না দিয়ে ফিরে যাচ্ছেন রায়নগর ইউপির পার মহাস্থানের বাসিন্দা আমিনুল ইসলাম। কেন? জানতে চাইলে বলেন, ‘ব্যালটত ওরকেরোক দেখে সিল মারা লাগবি, না হলে বলে খবর আছে। সেজন্যে বাবা, বাড়িত যাচ্ছি। ঠিক করছি, এইবার ভোটই দিমু না। ’

অভিযোগ অনুসন্ধানে সাড়ে ৯টায় মহাস্থান ডিগ্রি কলেজ কেন্দ্রে গিয়ে দেখা গেল, প্রধান ফটকের পাশে সড়কে জাতীয় সংসদের স্টিকার লাগানো গাড়ি। এমপি শরিফুল ইসলাম জিন্নাহ কেন্দ্রের মধ্যে নেতাকর্মীদের নিয়ে দিকনির্দেশনা দিচ্ছেন।

কিছুক্ষণ পর তিনি ইশারায় সেখানে কর্তব্যরত এসআই নুর মোহাম্মদকে ডাকেন। বলে দেন, ‘কোনো সমস্যা সৃষ্টি না করতে। লোকজন যাতে কোনো কাজে বাধাগ্রস্ত না হয়। ’

এদিকে এমপিকে পেয়ে ওই কেন্দ্রে অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠে তাঁর কর্মীরা। পুলিশের সামনে মিছিল ও স্লোগান দিতে থাকে। এতে করে ভোটারদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। ভেতরে দেখা গেল, ভোট দিতে যাঁরা এসেছেন তাঁদের বেশির ভাগ সকাল ৭টা থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন। প্রিসাইডিং অফিসার এস এম ইকবাল জানান, তিন হাজার ২৬৯ ভোটারের মধ্যে ৯০০ ভোট ইতিমধ্যে পড়েছে।

৯টা ২০ মিনিটের দিকে এমপি কেন্দ্র ত্যাগ করেন। এরপর সেখানে তাঁর স্ত্রী এসে ভোটগ্রহণ তদারকি শুরু করেন। আধা কিলোমিটার দূরে বুলুরচক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে সংসদ সদস্য স্টিকার লাগানো আরো একটি গাড়িতে বসে এমপির ছেলে হুসাইন শরিফ সঞ্চয় কেন্দ্রের দেখভাল করছেন। সেখানে প্রতীকসহ প্রার্থীর ছবি ছাপানো গেঞ্জি পরে বিশাল কর্মী বাহিনী মাঠ ও বুথ তদারকি করছে। ভোটারদের বলে দেওয়া হচ্ছে, ‘চেয়ারম্যানের সিল মারো দেখে দেখে। না মারলে বাড়িত যাও। ’ এই ইউপির ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী সাইফুজ্জামান চুন্নু বলেন, ‘এমপি, তাঁর স্ত্রী ও ছেলেকে নিয়ে প্রকাশ্যে মাঠে নেমেছেন। ভোটারদের তাঁর কর্মীরা ভয়ভীতি দেখাচ্ছে। সবচেয়ে বেশি প্রভাব খাটানোর চেষ্টা করছেন সিকেন্দারাবাদ মাদ্রাসা, করতকোলা হাই স্কুল ও বুলুরচকে। এসব কেন্দ্র থেকে অনেক ভোটার ভোট না দিয়ে ফিরে গেছেন। তাঁদের নানাভাবে প্রভাবিত করার চেষ্টা করা হয়েছে। ’ এ বিষয়ে এমপি শরিফুল ইসলাম জিন্নাহ বলেন, ‘আমি কোথাও প্রভাব খাটাইনি। কেন্দ্রে গিয়ে ভোট দিয়েই চলে এসেছি। যারা এসব বলছে, তারা ষড়যন্ত্র করছে। ’

ভোটারদের হুমকি : শিবগঞ্জের ১২টি ইউপিতে গতকাল ভোট হয়েছে। সকাল সাড়ে ১০টা থেকে দুই ঘণ্টা বিহার, ময়দানহাটা, পিরব, বুড়িগঞ্জ ও কিচক ইউপি ঘুরে দেখা গেছে, প্রতিটি কেন্দ্রে চেয়ারম্যানের ভোটটি দেখে দেওয়ার জন্য হুমকি দেওয়া হচ্ছে। মোলামগাড়ি উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে ভোট দিতে আসা ৬৫ বছরের বৃদ্ধ আলিমুন বেওয়া বলেন, ‘সেই বিয়ান খ্যাকা খাড়া হয়্যা আছি। লাইন ক্যামবা লড়িচ্চে না। ভোট দিবার পারমু কিনা আল্লাহ জানেন। ’

দুপুর ১২টার দিকে ময়দানহাটা ইউপির নৌকা ও ধানের শীষ প্রতীকের কর্মীদের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া শুরু হয়। এরপর সেখানে বিজিবি, র‌্যাব ও ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে ভ্রাম্যমাণ দল হাজির হলে দুই পক্ষের লোকজন পালিয়ে যায়। এই কেন্দ্রে একাধিক ভোটার অভিযোগ করে বলেন, ‘নৌকা প্রতীকের এস এম রূপমের লোকজন প্রকাশ্যে সিল মারতে বলেছে। না হলে বাড়িতে হামলা করার হুমকি দিয়েছে। ’

অভিযোগ সত্য জানিয়ে ধানের শীষ প্রতীকের মাহবুবুল আলম মানিক বলেন, ‘আমার অনেক কর্মী ভয়ে বাড়ি চলে গেছে। তাদের আর ভোটকেন্দ্রে আনতে পারিনি। অভিযোগ জানিয়েও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। ’

নৌকার প্রার্থী রূপম বলেন, ‘নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে। কাউকে ভয়ভীতি দেখানো হয়নি। ’

কেন্দ্র দখল : বিকেল ৩টার দিকে কিচক ইউপির কিচক বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়, বেলাইদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, গাংইট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, শোলাগাড়ি ও হরিপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্র দখল করে নেয় নৌকা প্রতীকের কর্মীরা। সেখানে দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যদের সামনে নৌকায় সিল মেরে নির্বিঘ্নে কেন্দ্র ত্যাগ করে তারা। শেষ বেলায় ভোট দিতে এসে ব্যালটের অভাবে ভোটাররা ভোট দিতে পারেননি। তবে সেখানকার দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রিসাইডিং অফিসাররা এ ব্যাপারে কথা বলতে চাননি। এ বিষয়ে বগুড়ার পুলিশ সুপার (এসপি) আসাদুজ্জামান বলেন, ‘ছোটখাটো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে। পুলিশ সবখানে সজাগ ছিল। ’

নেতারাই প্রিসাইডিং অফিসার : এদিকে সোনাতলা উপজেলায় আওয়ামী লীগের নেতাদের ভোটের দায়িত্ব প্রদানের ঘটনায় বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। এ কারণে ছয়টি ইউপির বেশির ভাগে ভোট কারচুপি হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মধুপুর ইউপির সোনাতলা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব মহিলা ডিগ্রি কলেজের আওয়ামী লীগ নেতা বেশির ভাগ শিক্ষককে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছেন দড়িহাসরাজ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রের প্রিসাইডিং অফিসার (বালুয়াহাট ইউনিয়ন যুবলীগের সভাপতি) আব্দুল আজিজ, শালিখা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রিসাইডিং অফিসার (সোনাতলা উপজেলা আওয়ামী লীগের শিক্ষা বিষয়ক সম্পাদক) রুহুল আমিন, তেকানী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী প্রিসাইডিং অফিসার ছাত্রলীগ নেতা নয়ন মিয়া (যিনি বর্তমানে বগুড়া সরকারি আযিযুল হক কলেজে স্নাতক চতুর্থ বর্ষের ছাত্র)।

এ বিষয়ে সোনাতলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) হাবিবুর রহমান বলেন, ‘রাজনৈতিক পরিচয়ে কাউকে নির্বাচনের দায়িত্ব দেওয়া হয়নি। নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানে সব ধরনের প্রস্তুতি ছিল। ’


মন্তব্য