kalerkantho

25th march banner

‘ভিন্ন রকম দোকান’

তারিকুল হক তারিক, কুষ্টিয়া   

৩১ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



‘ভিন্ন রকম দোকান’

কুষ্টিয়ার কুমারখালী রেলস্টেশনে হামিদুর রহমান শিপনের সেই ভিন্ন রকম দোকান। ছবি : কালের কণ্ঠ

দোকানভরা পণ্যের পসরা। বিকিকিনিও বেশ। দোকানে ঢুকে ক্রেতা কিনছেন পছন্দের পণ্য। প্রতিটি পণ্যের গায়ে দামও লেখা। দোকানটিতে সব কিছু থাকলেও নেই বিক্রেতা। দোকান থেকে পছন্দের পণ্য কিনে দাম পরিশোধ করার জন্য রয়েছে একটি বাক্স। সেই বাক্সেই ক্রেতারা ফেলেন টাকা। বিস্ময়কর হলেও সত্য, এভাবেই সাত মাস ধরে চলতে থাকলেও দোকানের জিনিসপত্র  কোনো দিন চুরি হয়নি। কোনো দিন হিসাবেও টাকা কম পড়েনি।

দোকানটির নামই ‘ভিন্ন রকম দোকান’। কুষ্টিয়ার কুমারখালী রেলস্টেশনে প্লাটফর্মের পাশেই চোখে পড়বে এই ব্যতিক্রমী দোকানটি। ট্রেনের যাত্রী থেকে শুরু করে এলাকার সবার দৃষ্টি কেড়েছে কুষ্টিয়ার কুমারখালীর কাজীপাড়া গ্রামের হামিদুর রহমান শিপনের এই অদ্ভুত দোকানরাজ্যটি। সংসার চালাতে একটু বাড়তি আয়ের উদ্দেশে এবং মানুষের প্রতি বিশ্বাসের ওপর ভর করে ‘অস্বাভাবিক’ এই ভাবনাটি বাস্তবে রূপ দিয়েছেন শিপন।

ওই দোকানের মালিক হামিদুর রহমান শিপন পেশায় হকার। তিনি কখনো বাসে, কখনো ট্রেনে চেপে আবার কখনো বা ফুটপাতে বসে গামছা, রুমাল, লুঙ্গি বিক্রি করেন। কুষ্টিয়ার প্রাচীন এই কুমারখালী রেলস্টেশন দিয়ে প্রতিদিন শত শত যাত্রী যাতায়াত করেন। হামিদুর রহমান শিপনের এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগে খুশি হয়ে তাঁদের অনেকেই প্রয়োজনীয় জিনিসটি এই ‘ভিন্ন রকম দোকান’ থেকেই কিনে থাকেন। এ ব্যাপারে কুমারখালী স্টেশনে কর্মরত বেসরকারিভাবে পরিচালিত ট্রেনের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এন এল ট্রেডিং ও নাজ কনস্ট্রাকশনের এজেন্ট মাসুদুল আলম জানান, ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকার মালামাল এই দোকানে খোলা থাকলেও কোনো দিন চুরি হয়নি। আমাদের সমাজে কেউ কাউকে বিশ্বাস করতে পারে না। সেই সমাজে মানুষের প্রতি একজন হকারের যে বিশ্বাস তাতে আমরা এই  হকারকে স্যালুট করি।

বুধবার সকালে ভিন্ন রকম দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে হামিদুর রহমান শিপন জানান, ‘৯ বছর ধরে আমি হকারি করি, কিন্তু দুই মেয়ে ও এক ছেলেকে নিয়ে একটু ভালোভাবে সংসারটা চালানোর জন্য আমার এই উদ্যোগ। আমি ফুটপাতে রুমাল, গামছা বিক্রি করি। বাড়তি আয়ের জন্য দোকান দিয়েছি কিন্তু দোকানে বসে থাকা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। দৈনিক সংসার চালানোর খরচ শুধু দোকান থেকে ওঠে না। তাই দোকান খুলে রেখে আমি ফুটপাতে ঘুরে ঘুরে গামছা, রুমাল বিক্রি করি। ক্রেতারা দোকানে এসে জিনিস পছন্দ হলে সেটা দামের তালিকা দেখে টাকা বাক্সে রেখে চলে যান। খোলা দোকানে চুরি হয় না? জানতে চাইলে হামিদুর রহমান শিপন জানান, আমি মানুষকে বিশ্বাস করি, আর এই বিশ্বাসের ওপর ভর করেই দোকান করেছি। সাত মাস ধরে এভাবেই  দোকান চলছে। দৈনিক ৫০০ থেকে এক হাজার ২০০ টাকার জিনিস বিক্রি হয়। আর সেখান থেকে তাঁর আয় হয় ১৫০ থেকে ২০০ টাকা। এর পাশাপাশি হকারি করে আর যে টাকা আয় হয় তা দিয়ে ছেলেমেয়ের লেখাপড়াসহ সংসারটা ভালোই চলে যাচ্ছে। শিপনের বড় মেয়ে সুমাইয়া অষ্টম শ্রেণিতে এবং ছেলে জিম তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ছে।   শিপন জানান, ‘রাতে এসে টাকা নিয়ে দোকান বন্ধ করি এবং সকালে এসে খুলে মাল রেখে চলে যাই। ’ 

বুধবার সকালে এই দোকানে পণ্য কিনতে আসা আজিজুর রহমান জানান, এই দোকানের কথা শুনে আমি রাজবাড়ীর বেলগাছি থেকে দেখতে আসলাম। কিছু একটা কিনব। এই প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলার সময়ও সুমন আলী নামের এক ক্রেতা দোকান থেকে একটি গামছা কিনলে দোকানদার শিপন নির্ধারিত দাম থেকে ১০ টাকা কম নিলেন। টাকা নিজে হাতে না নিয়ে ক্রেতাকে দিয়ে বাক্সে রাখতে বললেন। দোকানদার শিপন বলেন, ‘কখনো আমি নিজে দোকানে উপস্থিত থাকলে ওই ক্রেতার সম্মানে ১০ টাকা কম নিই, যদিও তাতে আমার লাভ কম হয়। তবু এটা আমি করে থাকি। ’


মন্তব্য