kalerkantho


ভোটের ভূরিভোজ আয়োজনে ওসি

শরীফ আহমেদ শামীম, গাজীপুর   

৩০ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



ভোটের ভূরিভোজ আয়োজনে ওসি

নির্বাচনী ভূরিভোজের জন্য কালীগঞ্জ থানার চত্বরে এভাবেই বেঁধে রাখা হয়েছে খাসি। ছবি : কালের কণ্ঠ

গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলার সাতটি ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) নির্বাচন কাল বৃহস্পতিবার। নির্বাচনে দায়িত্বপ্রাপ্ত ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ভোজের জন্য কালীগঞ্জ থানার ওসি মো. মুস্তাফিজুর রহমান চারটি খাসি কিনেছেন।

থানা চত্বরেই হবে এ ভোজসভা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুুক ইউপি নির্বাচনের একাধিক প্রার্থী ও থানার ঘনিষ্ঠ সূত্র জানায়, নির্বাচন উপলক্ষে আজ বুধবার দুপুরে ও কাল বৃহস্পতিবার দুপুরে কর্মকর্তাদের ভূরিভোজ করানো হবে। প্রায় ২০০ (প্রথম দিন ১০০ ও দ্বিতীয় দিন ১০০) লোকের খাওয়ানোর জন্য চারটি খাসি কেনা হয়েছে। গতকাল দুপুরের পর দুটি খাসি থানা চত্বরে দেখা গেছে। আরো দুটি আনা হচ্ছে। আনতে বলা হয়েছে বড় একটি গরুর অর্ধেক মাংসও। এ ছাড়া ১০ ধরনের ভর্তা, সবজি ও ডালের ব্যবস্থা করতে বলা হয়েছে। আইড় ও বোয়াল মাছের জন্য গতকাল থানা থেকে কিশোরগঞ্জের ভৈরব বাজারে লোক পাঠানো হয়েছে।

ওই সূত্র আরো জানায়, নির্বাচনের দিন আপ্যায়নের কথা বলে আওয়ামী লীগের চেয়ারম্যান ও মেম্বার পদপ্রার্থীদের কাছ থেকে ওসি চাঁদা নিয়েছেন।

এলাকার কয়েকটি শিল্প-কারখানার মালিকদের কাছ থেকেও চাঁদা তোলা হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মনিরুজ্জামান উপজেলার বড়গাঁও বাজার থেকে খাসিগুলো কিনেছেন বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে।

ওসি আতঙ্ক!

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, কালীগঞ্জের জাঙ্গালিয়া, জামালপুর, মোক্তারপুর, বক্তারপুর, তুমুলিয়া, বাহাদুরসাদী ও নাগরী ইউপিতে নির্বাচন হচ্ছে। নির্বাচনে প্রার্থীদের মধ্যে ওসি আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। বিএনপির ও আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী (স্বতন্ত্র) চেয়ারম্যান প্রার্থীদের কয়েকজন অভিযোগ করেন, ‘হুমকি ও হয়রানিতে অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে আওয়ামী লীগ না, নির্বাচনে এখন প্রধান প্রতিপক্ষ থানার ওসি। ’

জামালপুর ইউপিতে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী ও বর্তমান চেয়ারম্যান খায়রুল আলম বলেন, ‘পুলিশি হয়রানি ও হুমকিতে এলাকায় প্রচারণায় যেতে পারছি না। বৃহস্পতিবার ভোট। মঙ্গলবার ছিল প্রচারণার শেষ দিন। অথচ আমি বা কর্মী-সমর্থকদের কেউ মাঠে যেতে না পেরে ঘরে বসে আছি। বের হলেই পুলিশ কর্মীদের হুমকি দেয়। মাদক মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে জেলে পাঠানোর ভয় দেখায়। গোপনে বের হয়ে আওয়ামী লীগের প্রার্থীর কর্মীদের হামলার শিকার হয়েছেন আমার অনেক কর্মী। ’ তিনি অভিযোগ করে জানান, গত শনিবার রাতে তাঁর এক কর্মীকে হত্যা করে লাশ গাছে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। ওসি হত্যাকারীদের পক্ষ নিয়ে একে আত্মহত্যা বলে ধামাচাপা দিয়েছেন। নিহতের স্ত্রীকে থানায় অপদস্থ এমনকি মারতে তেড়ে গিয়েছেন। ভোটের দিন কেন্দ্রে গেলে তাঁর কর্মী ও সমর্থকদের গ্রেপ্তারের হুমকি দিয়েছেন। ওসির কাছে কোনো বিষয়ে অভিযোগ করলে, উল্টো ধমক এমনকি গ্রেপ্তারের হুমকি দিচ্ছেন। তিনি বলেন, ‘অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে, জামালপুরে সুষ্ঠু নির্বাচনে তিনি মূল বাধা। ’

জামালপুর ইউপিতে বিএনপির প্রার্থী হারুন অর রশিদ বলেন, ‘ওসি আওয়ামী লীগের প্রার্থীর চেয়েও খারাপ আচরণ করছেন। তাঁর কার্মকাণ্ডে অনেকে ধারণা করেন, তিনি দলীয় ক্যাডার। নির্বাচনী পরিবেশ দেখে মনে হচ্ছে, আওয়ামী লীগ না, নির্বাচনে আমার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ওসি। ’

বাহাদুরসাদী ইউপিতে বিএনপির চেয়ারম্যান প্রার্থী জয়নাল আবেদীন অভিযোগ করে বলেন, ‘পুলিশি হুমকিতে দিনে বের হতে পারি না। আওয়ামী লীগের প্রার্থীর কর্মীরা হামলা চালিয়ে আমার কর্মীদের আহত করছে। লিখিত অভিযোগ দিলে ওসি তা গ্রহণ না করে রিটার্নিং অফিসারের কাছে যেতে বলেন। কর্মীদের পুলিশ আটক ও মামলার হুমকি দিয়েই চলছে। এসব কারণে ভোটাররাও আতঙ্কিত। অনেক ভোটার বলছেন, ভয়ে তারা ভোট দিতে কেন্দ্রে যাবেন না। ’

নাগরী ইউপির বর্তমান চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী মো. সিরাজ মিয়া বলেন, ‘আওয়ামী লীগের প্রার্থী ও কর্মীদের হুমকিতে আমি নির্বাচনী প্রচারণা চালাতে পারছি না। আমার কর্মীদের ওপর প্রতিদিন হামলা ও নির্যাতন হচ্ছে। পুলিশকে জানালে উল্টো হামলাকারীদের পক্ষে সাফাই গায়। অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে ওসি আওয়ামী লীগের কর্মী-সমর্থকদের চেয়েও বেপরোয়া। তাঁর অধীনে নির্বাচন কোনোভাবে সুষ্ঠু হবে না। ’ তিনি জানান, এসব বিষয়ে তিনি রিটার্নিং অফিসারের কাছে অভিযোগ দিয়েছেন। কিন্তু কোনো প্রতিকার পাননি। কেন্দ্র দখল ও কারচুপির আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।

এ বিষয়ে ওসি মো. মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘প্রার্থীরা আচরণবিধি ভাঙলে বা অন্যায় কাজ করলে পুলিশ বসে থাকবে না। আইন অনুযায়ী আমি দায়িত্ব পালন করছি। ’ অযথা হয়রানি ও চাঁদা নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেন তিনি। তবে কর্মকর্তাদের খাওয়ার জন্যে খাসি কেনার কথা স্বীকার করেন।


মন্তব্য