kalerkantho

মঙ্গলবার । ১৭ জানুয়ারি ২০১৭ । ৪ মাঘ ১৪২৩। ১৮ রবিউস সানি ১৪৩৮।


চারপাশে হিংস্রতার ছবি

ইউপি নির্বাচনে গলাচিপায় সহিংসতা

এমরান হাসান সোহেল, পটুয়াখালী   

২৯ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



চারপাশে হিংস্রতার ছবি

ইউপি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে গত ২২ মার্চ পটুয়াখালীর গলাচিপায় আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী এরশাদ হোসেন বাদলের নেতৃত্বে হামলা চালানো হয় আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী সরদার আব্দুর রহমান নয়া মিয়ার বাড়িতে। হামলায় বিধ্বস্ত ঘরটি এখনো সেভাবেই পড়ে আছে। ইনসেটে সেই ইট, যেটি দিয়ে ঘরের লোকজনের মাথা থেঁতলে দেওয়া হয়। ছবি দুটি গত শনিবার তোলা। ছবি : কালের কণ্ঠ

হাতে হাতে দেশীয় অস্ত্র। চোখেমুখে হিংস্রতা। এগিয়ে আসছে কয়েক শ লোক। বাড়ির লোকজন ভয়ে আশ্রয় নিল খাটের নিচে। কিন্তু তেড়ে আসা দুর্বৃত্তরা থামল না। নিমেষেই ঘরের দরজা-জানালা গুঁড়িয়ে দিল। ঘরে ঢুকে টেঁটাবিদ্ধ করে খাটের নিচ থেকে বের করে আনল তাদের। এরপর ইট-হাতুড়ি দিয়ে কারো মাথা ফাটাল, কারোর ভেঙে দিল হাত-পা; কাউকে কোপাল ধারালো অস্ত্র দিয়ে। ঘরে-বাইরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ল রক্ত। আসবাবসহ সব জিনিস তছনছও করল হামলাকারীরা। আগুনে জ্বালিয়ে দেওয়া হলো মালপত্র। গত ২২ মার্চ বিকেলে এভাবেই তাণ্ডব চালানো হয় পটুয়াখালীর গলাচিপার চিকনিকান্দি ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে (ইউপি) আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী সরদার আব্দুর রহমান নয়া মিয়ার কালারাজা গ্রামের বাড়িতে। কাছেই নির্বাচনী কেন্দ্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা উপস্থিত থাকলেও পরিবারটিকে রক্ষায় কেউ এগিয়ে আসেননি।

ওই দিন হামলার দৃশ্য দেখে ভয়ে নানাবাড়ি গিয়ে আশ্রয় নিয়েছিল বাকরুদ্ধ হয়ে পড়া সাত বছরের শিশু তানিম। এখনো তার ভয় কাটেনি। এখনো সে নিজ বাড়ি ফেরেনি। বাড়ি ফেরার কথা বললেই হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে সরদার আব্দুর রহমান নয়া মিয়ার ভাতিজা তানিম। ওই দিনের সন্ত্রাসী হামলার শিকার পরিবাটির ১০ সদস্যের সাতজন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে এবং তিনজন পটুয়াখালী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে প্রাণ বাঁচাতে লড়াই করছে। সূত্র জানায়, চিকনিকান্দি ইউপি নির্বাচনে আওয়ামী লীগ মনোনীত চেয়ারম্যান প্রার্থী এবং বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলায় ফাঁসির রায় কার্যকর হওয়া মেজর মহিউদ্দিনের মামাতো ভাই এরশাদ হোসেন বাদলের নেতৃত্বে ওই হামলা হয়।

সরেজমিনে দেখা যায়, সরদার আব্দুর রহমান নয়া মিয়ার ঘরটি এখনো ওভাবেই তছনছ হয়ে পড়ে আছে। ঘরের ভেতর ভুতুড়ে অবস্থা বিরাজ করছে। ভয়ে কোনো লোক সেখানে যায় না। এলাকার কোনো ব্যক্তি নাম প্রকাশ করে ওই ঘটনা বিষয়ে বক্তব্য দিতে রাজি হয়নি এ প্রতিনিধির কাছে। তারা বাদলের হুমকিতে ওই বাড়িতে গিয়ে কাউকে সহানুভূতিও দেখাতে সাহস পায়নি। গলাচিপা থানার পুলিশ এখন পর্যন্ত খোঁজ নেয়নি নির্যাতিত পরিবারটির। পরিবারটির অভিযোগ, এ ঘটনায় মামলা নিতেও রাজি হননি গলাচিপা থানার ওসি আব্দুর রাজ্জাক।

ওই দিন যা ঘটেছিল : স্থানীয় লোকজন নাম না প্রকাশের শর্তে জানায়, ২২ মার্চ ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার প্রায় দুই ঘণ্টা বাকি ছিল। তখন এরশাদ হোসেন বাদল তাঁর ২০০-৩০০ লোক নিয়ে সশস্ত্র অবস্থায় চিকনিকান্দি ইউনিয়নের কালারাজা সিনিয়র মাদ্রাসা ভোটকেন্দ্রে যান। কেন্দ্র দখল করে ব্যালটে সিল মারার পর প্রায় ৫০০ গজ দূরে নয়া মিয়ার বাড়িতে হানা দিয়ে তাণ্ডব চালায় তারা।

নয়া মিয়ার বড় ভাই মতিয়ার রহমান সরদারের স্ত্রী রাহিমা বেগম জানান, দা, সড়কি, চাপাতি, কুড়াল, চল (টেঁটা), হাতুড়িসহ নানা ধরনের অস্ত্র নিয়ে দুই শর বেশি লোক হামলা চালায় বাড়িতে। হামলাকারীরা প্রথমে ঘরের ১২টি জানালার ১১টি ও ছয়টি দরজার পাঁচটি ভেঙে ঘরে ঢোকে। পরে পুরো ঘর লণ্ডভণ্ড করে। পরিবারের সদস্যরা প্রাণ বাঁচাতে ওই ঘরের খাটের নিচে আশ্রয় নেয়। কিন্তু হামলাকারীরা খাটের নিচ থেকে টেঁটাবিদ্ধ করে একে একে বের করে আনে নয়া মিয়ার মেয়ে সিমি ও তামিমা, ছেলে তাজ, সাজ ও সানি, ভাইয়ের ছেলে রাজীব ও তাজিন, বড় ভাইয়ের স্ত্রী নাজমা বেগম, জামাতা মোশারেফ, স্ত্রী সাজেদা বেগম ও ভাতিজার স্ত্রী নাজমাকে। পরে তাদের কাউকে ইট-হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে হাত-পা ভেঙে দেয়। কারো মাথা ফাটায়। কাউকে কুপিয়ে জখম করে। ঘরের সব মাল ভেঙে তছনছ করে। পোশাকসহ গুরুত্বপূর্ণ মালপত্র একদফা ঘরে, দ্বিতীয় দফা উঠানে আগুনে পুড়িয়ে দেয়। ফিরে যাওয়ার হামলাকারীরা হুমকি দেয়, এলাকার কেউ ওই বাড়িতে গেলে তাদের পরিণতিও একই রকম হবে। এই তাণ্ডবের সময় ভোটকেন্দ্রে অবস্থান করছিলেন আইনশৃঙ্খলার দায়িত্বে থাকা বিভিন্ন বাহিনীর সদস্যরা। স্থানীয় কিছু লোক তাঁদের অনুরোধ করলেও ওই বাড়ির কাউকে রক্ষায় এগিয়ে আসেননি তাঁরা। এখনো ওই বাড়িতে স্থানীয় লোকজনের কোনো আনাগোনা নেই। ওই বাড়িতে কাজ করা মস্তফা হাওলাদার ও আলেয়া বেগমও হুমকি পেয়ে গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন।

এদিকে গত শনিবার পটুয়াখালী সাংবাদিকদের একটি টিম ঘটনাস্থল পরির্দশন করে। পরে রাতে ওই ‘পরিত্যক্ত’ ঘরটি থেকে পড়ে থাকা কিছু মাল দুর্বৃত্তরা নিয়ে যায় বলে জানা গেছে। পটুয়াখালীর পুলিশ সুপার সৈয়দ মুশফিকুর রহমান বলেন, ‘বিষয়টি আমাকে জানানো হয়নি। অবশ্যই মামলা হবে এবং ঘটনার সঙ্গে জড়িত অপরাধীদের দ্রুত গ্রেপ্তার করা হবে। ’ গলাচিপা থানার ওসি আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ‘নয়া মিয়ার লোকেরা বর্তমান চেয়ারম্যানের (বাদল) দুই ভাইকে মারধর করেছে। তারপর উভয় পক্ষের মধ্যে মারামারি হয়েছে। সে (নয়া মিয়া) মামলা নিয়ে থানায় আসেনি। ’ অভিযুক্ত এরশাদ হোসেন বাদল বলেন, ‘আমার দুই ভাইকে ভোটের পর তারা মারধর করেছে। একপর্যায়ে খবর আসে তারা মারা গেছে। ওই খবরে এলাকার হাজার হাজার জনতা ঐক্য হয়ে তাদের (নয়া মিয়া) বাড়িতে হামলা চালিয়েছে, এমনটা আমি শুনেছি। আমি তখন এলাকায় ছিলাম না। ’

সরদার আব্দুর রহমান নয়া মিয়া বলেন, ‘শনিবার সাংবাদিকরা আমার বাড়ি ঘুরে আসার পর প্রথমবারের মতো ওসি আমার বাড়িতে গিয়েছিলেন। বাদলের কোনো লোককে মারধরের ঘটনা সম্পূর্ণ বানোয়াট। আপনারা (সাংবাদিক) আমার বাড়ি যাওয়ার পর ওসি মামলার কথা বলছেন। ’


মন্তব্য