kalerkantho

মঙ্গলবার । ৬ ডিসেম্বর ২০১৬। ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৫ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।

গলদ থাকছেই

কিশোরগঞ্জের নরসুন্দা প্রকল্প

শফিক আদনান, কিশোরগঞ্জ   

২৭ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



গলদ থাকছেই

কিশোরগঞ্জের নরসুন্দা প্রকল্পে নির্মাণ করা হচ্ছে দৃষ্টিনন্দন স্থাপনা। ছবি : কালের কণ্ঠ

প্রকল্পের উদ্দেশ্য ছিল নদী খনন করে ব্রহ্মপুত্র নদ থেকে নরসুন্দায় পানিপ্রবাহ নিশ্চিত করা। আর ওই চলমান নদীকে ঘিরে শহর সুন্দরভাবে সাজানো।

এ জন্য শহরে ছয় কিলোমিটার নদীর পাড় সিসি ব্লক দিয়ে বাঁধাই করা, ছোট-বড় মিলিয়ে ১০টি দৃষ্টিনন্দন সেতু নির্মাণ, ওয়াকওয়ে, দুটি পার্ক, মুক্তমঞ্চ, সুউচ্চ নদী পর্যবেক্ষণ টাওয়ারসহ আরো কিছু কাজ হাতে নেওয়া হয়। এলজিইডির দাবি, এরই মধ্যে তারা এসবের ৮০ শতাংশ কাজ শেষ করেছে। তবে যে নদীকে ঘিরে এত আয়োজন, সেই নদীতে পানিপ্রবাহ নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। এ ক্ষেত্রে প্রকল্প ঘিরে কিশোরগঞ্জবাসীর স্বপ্ন ও প্রত্যাশা অধরাই থেকে যাচ্ছে। নদীতে পানি না এলে সব আয়োজন মাঠে মারা যাবে বলে আশঙ্কা শহরবাসীর।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, পানিপ্রবাহের জন্য ৩৩ কিলোমিটার নদী খনন করা হলেও নরসুন্দা নদী ব্রহ্মপুত্র থেকে পাবে না এক ফোঁটা পানিও। আর নদীতে পানি না এলে শহর দৃষ্টিনন্দন করার কাজটিও সম্ভব হবে না। ময়লা-আবর্জনার ভাগাড়ে পরিণত হবে এ নদী। এ কথা স্বীকার করেছে বাস্তবায়নকারী সংস্থা এলজিইডিও। স্থানীয়রা বলছে, পরিকল্পনায় গলদ ছিল বলেই এমনটি হয়েছে। অন্যদিকে নরসুন্দা প্রকল্পের অধীনে বিপুল ব্যয়ে শহরে যেসব অবকাঠামো নির্মিত হচ্ছে, তার মান নিয়েও রয়েছে বিস্তর অভিযোগ।

কিশোরগঞ্জ এলজিইডি সূত্রে জানা গেছে, প্রায় ২০ কোটি টাকা ব্যয়ে হোসেনপুর উপজেলা থেকে শহর হয়ে নীলগঞ্জ পর্যন্ত ৩৩ কিলোমিটার নদী পুনঃখনন কাজ শেষ হয়েছে। পানি নিয়ন্ত্রণের জন্য হোসেনপুরের জামাইল এলাকায় নির্মাণ করা হয়েছে একটি স্লুইসগেট। কিন্তু স্লুইসগেট থেকে ব্রহ্মপুত্র আরো প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূরে। তা ছাড়া ব্রহ্মপুত্রের পানির স্তর স্লুইসগেট এলাকার চেয়ে অনেক নিচে। স্থানীয়রা জানিয়েছে, বর্তমান অবস্থায় প্রকল্পটি শেষ হলে নরসুন্দায় পানি ঢুকবে না, উল্টো নরসুন্দার পানি ব্রহ্মপুত্রে চলে যাবে। তাই ব্রহ্মপুত্রের চিন্তা বাদ দিয়ে নীলগঞ্জ এলাকায় রাবার ড্যাম নির্মাণ করে পানিপ্রবাহ নিশ্চিত করা যায় কি না তা নিয়ে ভাবছে এলজিইডি। ব্রহ্মপুত্র থেকে পানিপ্রবাহ নিশ্চিত করা না গেলে কেন রাষ্ট্রের কোটি কোটি টাকা অপচয় করা হলো, এখন এ প্রশ্নের উত্তর চাইছেন স্থানীয়রা।

সরেজমিন স্লুইসগেট এলাকায় গিয়ে কথা হয় চরজামাইল গ্রামের মমতাজ উদ্দিন ও আকরাম হোসেনের সঙ্গে। তাঁরা জানান, মূল ব্রহ্মপুত্র নদ অনেক নিচে। স্লুইসগেট থেকে চার-পাঁচ কিলোমিটার খাল আরো অন্তত ২০ থেকে ২৫ ফুট গভীর করে খনন করে ব্রহ্মপুত্রে মেলালেই পানিপ্রবাহের সম্ভাবনা তৈরি হবে।

কিশোরগঞ্জ পরিবেশ রক্ষা মঞ্চ পরমের আহ্বায়ক শরীফ সাদী আক্ষেপ করে বলেন, কিশোরগঞ্জবাসীর আন্দোলন-সংগ্রামের ফসল নরসুন্দা প্রকল্প। প্রকল্প শুরু হওয়ার পর আশাবাদ গড়ে উঠেছিল। কিন্তু আজ সর্বনাশা পথে এগিয়ে চলেছে এ প্রকল্প।

নরসুন্দা নদীকে কিশোরগঞ্জের দুঃখ বলা হতো। দখলে দখলে বিপর্যস্ত নদী ডাস্টবিনে পরিণত হয়েছিল। শহরে ছিল না হাঁটার জন্য ফুটপাত, খেলাধুলা ও চিত্তবিনোদনের কোনো জায়গা। বহু আন্দোলনের পর নরসুন্দা উদ্ধারে ২০১২ সালে সরকার এগিয়ে আসে। নদীকেন্দ্রিক শহর নির্মাণে নেওয়া হয় ব্যাপক পরিকল্পনা। জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদ একনেকে অনুমোদিত প্রকল্পের নাম দেওয়া হয়, ‘নরসুন্দা নদী পুনর্বাসন ও কিশোরগঞ্জ পৌরসভাসংলগ্ন এলাকা উন্নয়ন প্রকল্প। ’ প্রথমে বরাদ্দ প্রায় ৬৪ কোটি টাকা হলেও পরে আরেক দফা বেড়ে তা ১১০ কোটিতে দাঁড়ায়। প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্ব পায় স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর। যার কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল গত বছর । কিন্তু এরই মধ্যে সময় দুই দফা বাড়ানো হয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, খোদ পৌরসভা কাজের মান নিয়ে সন্তুষ্ট নয়। নবনির্বাচিত পৌর মেয়র মাহমুদ পারভেজ এ কারণে বেশ কয়েকবার কাজ বন্ধ করে দিয়েছিলেন। শহরের পাগলা মসজিদ এলাকায় নদীর পাড়ে যে সিসি ব্লক বসানো হয়েছিল, তা যথাযথ না হওয়ায় কয়েক দিনের মধ্যে ধসে যায়। লোকজনের হাঁটাহাঁটির জন্য নদীর দুই পারে সিরামিক ইট দিয়ে যে ছয় কিলোমিটার ওয়াকওয়ে নির্মাণ করা হয়েছিল, সেখানে দেওয়া হয়েছে নিম্নমানের ইট। গুরুদয়াল কলেজ এলাকায়ও সিসি ব্লক দেবে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। পৌর মেয়রের হস্তক্ষেপে এগুলো আবার নতুন করে বসানো হচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে কিশোরগঞ্জ পৌরসভার মেয়র মাহমুদ পারভেজ বলেন, ‘শহরের ভেতর নদীর দুই পাড়ে যেভাবে সিসি ব্লক বসানোর কথা ছিল, তা বসানো হয়নি। ওয়াকওয়েতে যে সিরামিক ইট বসানো হয়েছে, এগুলোও খুবই নিম্নমানের। আমি এ ব্যাপারে এলজিইডির সঙ্গে কথা বলার পর তারা কিছু জায়গায় তা নতুন করে বসিয়েছে। আমি মনে করি, এ প্রকল্পের মাধ্যমে শহরবাসী যে সুফলটুকু পাওয়ার কথা ছিল, তা পাবে না। প্রকল্পটি বোঝার জন্য আমি এলজিইডির কাছে প্রকল্পের বিস্তারিত তথ্য চেয়েছিলাম। কিন্তু তারা তা দেয়নি। ’ তবে কিশোরগঞ্জ স্থানীয় সরকার অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী গোলাম মওলা জানান, তারা যথাসাধ্য চেষ্টা করছেন কাজের মান ঠিক রাখতে। যখন যেখানে সমস্যা হচ্ছে তাত্ক্ষণিকভাবে এর সমাধান করা হচ্ছে। আর নদীতে পানিপ্রবাহের ব্যাপারে হতাশা প্রকাশ করে তিনি বলেন, এখন পানিপ্রবাহ নিশ্চিত করার জন্য নতুন আরেকটি প্রকল্পের কথা ভাবা হচ্ছে।

প্রকল্প পরিচালক আবদুস সালাম মণ্ডল কালের কণ্ঠকে বলেন, ব্রহ্মপুত্র শুকিয়ে যাচ্ছে। এ নদী থেকে নরসুন্দায় পানি আনা এখন কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে বৃষ্টির পানি, শহরের ড্রেন ও বাসাবাড়ির পানিও নরসুন্দার পানির উৎস হতে পারে যদি তা নোংরা করা না হয়, শহরের পশু জবাইয়ের বর্জ্যসহ বিষাক্ত বর্জ্য যদি নদীতে ফেলা না হয়। তাহলে যে পানি থাকবে, সেটা দিয়ে গোসল করা না গেলেও পরিবেশ সুন্দর দেখাবে। এখন শহরবাসীকে এ বিষয়ে সচেতন হতে হবে। পানির বিকল্প উৎস নিয়ে ভাবা হচ্ছে। অবশ্য তিনি পরিকল্পনায় গলদের কথা মানতে নারাজ। তিনি বলেন, পরিকল্পনা করার সময় ব্রহ্মপুত্রের অবস্থা আরো ভালো ছিল।

স্থানীয় ব্যবসায়ী সরকার কবির উদ্দিন তালুকদার ও আনিসুজ্জামান মুসা বলেন, এ প্রকল্পের জন্য শহরের অন্তত কয়েক হাজার দোকান ও স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়েছে। প্রকল্পের স্বার্থে সবাই তখন তা মেনে নিয়েছিল। শহরবাসীর স্বপ্ন ছিল, এ প্রকল্পের মাধ্যমে নরসুন্দায় পানিপ্রবাহ নিশ্চিত করাসহ নদীকেন্দ্রিক আধুনিক কিশোরগঞ্জ শহর গড়ে উঠবে। কিন্তু বর্তমান অবস্থা কিশোরগঞ্জবাসী কিছুতেই মেনে নেবে না।


মন্তব্য