kalerkantho

কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকত

স্রোতে বালু ক্ষয়

কলাপাড়া (পটুয়াখালী) প্রতিনিধি   

২৭ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



স্রোতে বালু ক্ষয়

তীব্র স্রোতে কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকতের লেম্পচর এলাকার বনাঞ্চলের বালু সরে যাওয়ায় এভাবেই গাছের শিকড় বেরিয়ে এসেছে। একইভাবে সৈকতের বালু সরে যাওয়ায় মাটি বেরিয়ে এসেছে। ছবি : কালের কণ্ঠ

পটুয়াখালীর কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকতে প্রায় দুই কিলোমিটার জুড়ে জোয়ার-ভাটায় স্রোতের সঙ্গে ক্ষয়ে যাচ্ছে বালু। বেরিয়ে এসেছে মাটির স্তর।

সেই মাটিও এখন ক্ষয় হচ্ছে। এতে সৈকতের সৌন্দর্যহানি ঘটছে।

গত বৃহস্পতিবার বিকেলে সৈকতে গিয়ে দেখা গেছে, সমুদ্রে ভাটা চলছে। মোটরসাইকেলে চলাচলে ট্যুরিস্ট পুলিশের নিষেধাজ্ঞা থাকায় হেঁটে তীরের পশ্চিম দিকে গেলে চোখে পড়ে অস্বাভাবিক দৃশ্য। বালুর সৈকতে বিশাল এলাকাজুড়ে জেগে উঠেছে মাটির স্তর। নারী-পুরুষ ও শিশুরা বালু সরে বেরিয়ে আসা মাটির স্তর খুঁড়ছে। সৈকতের ক্ষতির দিকে চিন্তা না করে উনুনে আগুন জ্বালানোর জন্য এরা মাটি খুঁড়ে তুলে আনছে বিভিন্ন প্রজাতির গাছের শিকড়।

দুই শিশুকে নিয়ে মাটি খোঁড়ার সময় মোছাম্মত কহিনুর বেগম বলেন, ‘মোরা ঘরে নারী, তবে বাইরে পুরুষের সমান কাম হরি (করি)। স্বামী নাই।

তিন মাইয়্যা পোলা লইয়্যা এইরহম মাডি ছালাইয়্যা গাছের মুড়া (গাড়া) উডাই। দাউড় (লাকড়ি) বেইচ্যা টাহা কামাই করইর‌্যা চাইল-ডাইল কিন্না খাই। সাগর পাড়ের ক্ষতি অইবো কি অইবো না হেই চিন্তা কইর‌্যা কোন লাভ নাই। ’

সৈকতের মাঝিবাড়ী পয়েন্টে বালু সরে বেরিয়ে আসা বড় বড় মাটির স্তরের দেখা গেলেও আরো একটু পশ্চিমে গেলে দেখা যায় ভিন্ন ছবি। এখানকার বালু সরে বেরিয়ে আসা মাটি ক্ষয়ে গেছে। আড়াআড়িভাবে ক্ষয়ে খাদের মতো তৈরি হয়েছে। দেখলে মনে হবে, ট্রাক্টর কিংবা চাকাওয়ালা যানবাহন চলাচল করায় এমনটি হয়েছে।

এ ব্যাপারে স্থানীয় বয়োজ্যেষ্ঠ কুদ্দুস মিয়া বলেন, ‘কয়েক বছর ধইর‌্যা সাগরের ঢেউ আর হোত খোবলাইয়্যা (নিম্নমুখী খরস্রোত) সৈকতের বালি সরাইয়্যা লইয়্যা যায়। গত বুধবার জোয়ারের সময়ও ওই অবস্থা অইছিলো সাগরের পাড়ে। কির জন্য যে সাগর এমন করে আল্লায়ই ভালো জানে। আমাদের দেহা মতে (দেখা মতে) সাগরের হোত (স্রোত) পরিবর্তন অইছে। এই কারণে এক্যাক (একেক) জায়গায় এক্যাক রহমের ভাঙন আর গড়ার খেলা চলছে। কোন কোন হানে দ্যাখপেন, বালি সইর‌্যা যাইয়্যা বড় বড় মাডির আস্তারণ বালির নিচ দিয়া বাইর অইয়্যা আইছে। আবার কোন কোন হানে দ্যাখপেন, সাগরের তীর অইতে সাগরের দিকে লম্বালম্বিভাবে মাডি বাইর অইয়্যা আইছে। আবার কোন কোন হানে দ্যাখপেন, গাছের গোড়ার বালি সইর‌্যা যাইয়্যা গাছগুলা উপড়াইয়্যা পইড়্যা গ্যাছে। ’

কুয়াকাটায় ভ্রমণে আসা পর্যটক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকত আমাদের কাছে সুন্দর একটি স্থান। পৃথিবীর সব সৈকতের চেয়ে এটি অত্যন্ত নিরাপদ। তবে বর্তমানে যে হারে সৈকতের বালু সরে যাচ্ছে, তা দেখে আমাদের হৃদয়ে ক্ষতের সৃষ্টি করে। কুয়াকাটা সৈকত রক্ষায় এখনই পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। ’

পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ভূতথ্য বিজ্ঞান (জিইও আর্থ ইনফরমেশন সায়েন্স) অনুষদের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আ ক ম মোস্তফা জামান বলেন, ‘কুয়াকাটা থেকে ১০ কিলোমিটার দক্ষিণে একটি ডুবোচর সৃষ্টি হয়েছে। ওই চরের কারণে স্রোতের গতি পরিবর্তন হয়ে গেছে। স্রোত পূর্বদিক দিয়ে পশ্চিমে যাওয়ার সময় সৈকতে প্রবল চাপ সৃষ্টি করায় বালু ক্ষয়ে যায়। সৈকতের ভাঙন ও বালুক্ষয় রোধে পূর্বদিকে গঙ্গামতিচরের পাশে সাগরের ভেতর জেগে ওঠা ডুবোচরসংলগ্ন আড়াআড়ি বাঁধ দেওয়া প্রয়োজন। এটা হলে সমুদ্রের স্রোত সৈকতমুখী হবে না। এর ফলে সৈকতের ভাঙন রোধ করা সম্ভব। এ জন্য সরকারকে নানামুখী পদক্ষেপ নিতে হবে। ’


মন্তব্য