kalerkantho


পাহাড়ে ‘সশস্ত্র দুঃসাহস’ অসহায় বড় দুই দল!

ফজলে এলাহী, রাঙামাটি   

২৫ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



পাহাড়ে ‘সশস্ত্র দুঃসাহস’ অসহায় বড় দুই দল!

প্রথম দফা ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনে দেশজুড়ে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের একচ্ছত্র প্রাধান্য। পরের দফা নির্বাচনে নৌকা প্রতীক পেতে দলীয় নেতাদের মধ্যে চলছে কাড়াকাড়ি-মারামারি। কিন্তু পাহাড়ি জনপদ রাঙামাটিতে সেই দাপুটে ক্ষমতাসীনরাই অনেকটা অসহায়! অবিশ্বাস্য মনে হলেও নৌকা প্রতীক নিয়ে চেয়ারম্যান পদে লড়তে প্রার্থী খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না রাঙামাটির অনেক ইউনিয়নে। তবে এমন পরিস্থিতি দলটির নিজেদের সাংগঠনিক অযোগ্যতার কারণে নয়। পাহাড়ের আঞ্চলিক দলগুলোর ‘সশস্ত্র দুঃসাহস’ দেশ কাঁপানো আওয়ামী লীগকে ফেলেছে মহা দুচিন্তায়।

ফলে পাহাড়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জেলা রাঙামাটির ৪৯ ইউনিয়নের মধ্যে ৩০টিতে প্রার্থী দিতে পারলেও বাকি ১৯টিতে প্রার্থীই দিতে পারেনি দলটি। এর মধ্যে খোদ রাঙামাটি সদর উপজেলার একটি ইউনিয়নেও কোনো আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী আঞ্চলিক দলগুলোর হুমকির কারণে প্রার্থী হওয়ার সাহস দেখায়নি। ফলে রাঙামাটি সদরের একটি এবং জুরাছড়ির ১০টি ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের কোনো প্রার্থীই নেই! বরকল আর নানিয়ারচরের ৯ ইউনিয়নের মধ্যে একটি বাঙালি অধ্যুষিত হওয়ায় কেবল ওই ইউনিয়নেই প্রার্থী দিতে পেরেছে দলটি। শুধুই কি আওয়ামী লীগ! একই অবস্থা বিএনপিরও। জেলার ৪৯টি ইউনিয়নের মধ্যে মাত্র ২০টিতে প্রার্থী চূড়ান্ত করতে পেরেছে দলটি। আওয়ামী লীগের মতো বিএনপিও রাঙামাটি সদর, জুরাছড়ি, নানিয়ারচর, বরকলে কোনো প্রার্থী দিতে পারেনি আঞ্চলিক দলগুলোর ভয়ভীতির কারণে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, পাহাড়ের তিন প্রভাবশালী আঞ্চলিক রাজনৈতিক দল, জনসংহতি সমিতি (সন্তু), জনসংহতি সমিতি (এম এন লারমা) এবং ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের (ইউপিডিএফ) ভয়ভীতি আর হুমকির কারণে বিএনপি বা আওয়ামী লীগের কোনো প্রার্থীই নির্বাচন করতে আগ্রহী নয়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে রাঙামাটি সদরের একটি ইউনিয়নের সম্ভাব্য চেয়ারম্যান প্রার্থী ও আওয়ামী লীগ নেতা বলেন, ‘ভোটে দাঁড়িয়ে কি জীবনটা হারাব নাকি! নির্বাচন করব বলার পর থেকেই তো ঘরেই থাকতে পারছি না। ভোটে দাঁড়ানো বা নির্বাচিত হওয়ার চেয়ে বেঁচে থাকাটাই জরুরি। ’ এরই মধ্যে নির্বাচনে দাঁড়ানোর ব্যাপারে আগ্রহ প্রকাশ করায় অপহৃত হয়েছেন নানিয়ারচরের সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান পঞ্চানন চাকমা। গত ১৩ মার্চ তাঁকে অপহরণ করা হলেও আজও তাঁর খোঁজ মেলেনি।

রাঙামাটি জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মো. মুছা মাতব্বর জানান, জেএসএস একদিকে চুক্তি বাস্তবায়নের দাবি করবে আর অন্যদিকে সন্ত্রাস-চাঁদাবাজি-অস্ত্রবাজির গুণ্ডামি করে কাউকে নির্বাচনে দাঁড়াতে দেবে না, এটা তো হয় না। সারা দেশে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকলেও পাহাড়ে জনসংহতি সমিতি ও অন্য পাহাড়ি আঞ্চলিক দলগুলো অস্ত্রের মাধ্যমে উপজেলা নির্বাচন ও সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ায় তাদের আত্মবিশ্বাস বেড়ে গেছে, তারা একই কায়দা ইউপি নির্বাচনেও প্রয়োগ করতে চাইছে। আমাদের নেতাকর্মীদের নানাভাবে হুমকি দিয়ে এলাকা ছাড়া করছে, নির্বাচন করতে দিচ্ছে না।

রাঙামাটি জেলা বিএনপির সভাপতি মো. শাহ আলম বলেন, আঞ্চলিক দলগুলোর কাছে যে পাহাড়ের মানুষ জিম্মি তা আরেকবার প্রমাণিত হচ্ছে। তাদের অস্ত্রের দাপটের কারণে আমাদের দলের নেতাকর্মীরাও নির্বাচনে অংশ নিতে ভয় পাচ্ছে। পাহাড়ে নির্বাচন সুষ্ঠু হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। অস্ত্রের দাপটে পাহাড়ের মানুষ অসহায় বলেও মন্তব্য করেন এই বিএনপি নেতা।

তবে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি নেতাদের অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির মুখপাত্র সজীব চাকমা বলেন, ‘আমরা এই ধরনের রাজনীতি করি না। পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়িত না হওয়ায় জনগণ তাদের প্রত্যাখ্যান করেছে বলেই এরা প্রার্থী পাচ্ছে না। এখন দোষ চাপাচ্ছে আমাদের ওপর। এসব অভিযোগ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন। নির্বাচনে কারচুপি করার আগাম প্রস্তুতি হিসেবে তারা এসব বলে জেএসএসের ভাবমূর্তি নষ্ট করতে চাইছে। জনসংহতি সমিতি বরাবরই গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে বিশ্বাসী বলে দাবি করেন তিনি।

এদিকে জাতীয় দল আর আঞ্চলিক দলগুলোর মুখোমুখি দাবির মধ্যে আঞ্চলিক দলগুলোর চাপ কতটা প্রবল হয়ে উঠেছে তা টের পাওয়া যাচ্ছে জেলার কয়েকটি উপজেলায় বেশ কিছু নেতাকর্মী আওয়ামী লীগ ও বিএনপি ছাড়ায়। নির্বাচনে অংশ নিতে হলে জাতীয় রাজনীতি ছাড়তে হবে এমন শর্তারোপ করায় আওয়ামী লীগ ও বিএনপি থেকে এরই মধ্যে পদত্যাগ করেছেন কয়েকজন সম্ভাব্য প্রার্থী। যদিও কৌশলগত কারণে দুটি দলই এদের নাম ও তালিকা জানাতে অপারগতা জানিয়েছে।

জনসংহতি সমিতির প্রবল নিয়ন্ত্রণাধীন রাঙামাটি জেলায় এই সমস্যা হলেও প্রতিবেশী দুই পার্বত্য জেলা বান্দরবান এবং খাগড়াছড়িতে সমস্যা তীব্র নয়। বান্দরবানের ৩১টি ইউনিয়ন এবং খাগড়াছড়ির ৩৭টি ইউনিয়নের প্রায় সবগুলোতেই প্রার্থী দিতে পারছে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি। এমনটাই জানিয়েছেন সেখানকার সংবাদকর্মীরা।

সহিংসতা আর চাপ চলছে সমানতালে : তৃতীয় দফায় আগামী ২৩ এপ্রিল রাঙামাটির বিভিন্ন ইউনিয়নে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।

এরই মধ্যে নিজেদের দলীয় প্রার্থিতা প্রায় চূড়ান্ত করেছে বড় দুই দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি। আঞ্চলিক দলগুলোও নিজেদের মধ্যে অঘোষিত ভাগাভাগির কাজ শেষ করেছে। এরই মধ্যে গত ২১ মার্চ বান্দরবানের রুমায় গ্যালাইঙ্গ্যা ইউনিয়নের একজন সম্ভাব্য ইউপি চেয়ারম্যান প্রার্থী শান্তি ত্রিপুরাকে গুলি করে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। ১৩ মার্চ রাঙামাটির নানিয়ারচরের সদর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ও এবারের সম্ভাব্য প্রার্থী পঞ্চানন চাকমাকেও অপহরণ করেছে সন্ত্রাসীরা, এখনো তাঁর খোঁজ মেলেনি। এ দুটির কোনোটিই বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। প্রায় প্রতিটি ইউনিয়ন থেকেই পাওয়া যাচ্ছে ‘ভয়’ আর ‘চাপের’ তথ্য।


মন্তব্য