kalerkantho

শুক্রবার । ২০ জানুয়ারি ২০১৭ । ৭ মাঘ ১৪২৩। ২১ রবিউস সানি ১৪৩৮।


ভোটকর্তার সামনেই ধুমছে নৌকায় সিল

অরণ্য ইমতিয়াজ, টাঙ্গাইল   

২৪ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



ভোটকর্তার সামনেই ধুমছে নৌকায় সিল

কেউ ভোটারদের ব্যালট পেপার কেড়ে নিয়ে মারছে সিল, আবার কেউ আওয়ামী লীগের প্রার্থীকে প্রকাশ্যে ভোট দিতে ভোটারদের বাধ্য করছে। ঘটেছে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীকে মারধরের ঘটনাও। কোনো কোনো কেন্দ্রে ভোটারদের উপস্থিতিও ছিল বেশ। শান্তির সুবাতাস বইছিল কিছু কেন্দ্রে। ভোটগ্রহণের সময় বড় ধরনের সহিংসতার খোঁজ মেলেনি কোথাও। টাঙ্গাইলের নাগরপুরে গতকাল বুধবার অনুষ্ঠিত ১১টি ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনের ছবি ছিল এ রকমই।

প্রথম দফায় সারা দেশের সঙ্গে এ উপজেলায়ও গত ২২ মার্চ ১১টি ইউপিতে নির্বাচন হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ২০ মার্চ কালিহাতীতে উপনির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করায় নাগরপুরে ইউপি নির্বাচন এক দিন পিছিয়ে ২৩ মার্চ করা হয়। পরে উচ্চ আদালতের আদেশে ২০ মার্চের কালিহাতী উপনির্বাচন স্থগিত হয়ে গেলেও নাগরপুরের ইউপি নির্বাচনের ২৩ মার্চ বহাল থাকে।

গতকাল সকাল পৌনে ৯টার দিকে নাগরপুর সদর ইউনিয়নের দুয়াজানী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, ভোটারদের লম্বা লাইন। নারী ভোটারের উপস্থিতি ব্যাপক। এই কেন্দ্রের প্রিসাইডিং অফিসার (ভোট কর্মকর্তা) শামস উদ্দিন জানান, তাঁর কেন্দ্রে ভোটার তিন হাজার ৩১২ জন। সকাল ৮টা থেকেই ভোটারদের ভিড় শুরু হয়। তাদের মধ্যে উত্ফুল্ল ভাব ছিল। সোয়া ৯টার দিকে সেখানে আসেন বিএনপি মনোনীত প্রার্থী হাবিবুর রহমান হবি। তিনি জানান, ভোটারদের উপস্থিতি খুব ভালো। এখন পর্যন্ত সুষ্ঠু ভোট হচ্ছে। সোয়া ৯টা পর্যন্ত নির্বাচন নিয়ে কোনো অভিযোগ তিনি করেননি। ভোটার আব্দুল জলিল বলেন, ‘অনেক আগে লাইনে দাঁড়াইছি। ম্যালা মানুষ। ভোট দিতে দেরি হইতাছে। ’ তাঁর পাশে থাকা শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘মানুষের ভিড়ের কারণে ভোট দিতে দেরি হইতাছে। আর কোনো সমস্যা নাই। এহানে কোনো গ্যাঞ্জাম হয় নাই। ’

বেকড়া ইউনিয়নের এবতেদায়ি মাদ্রাসা কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, দুটি বুথের সামনে ভোটারদের ছোট দুটি লাইন। বাইরে পুলিশ। কেন্দ্রের ভেতরে সহকারী প্রিসাইডিং অফিসারের কাছ থেকে ব্যালট পেপার নিয়ে সেখানে প্রকাশ্যে নৌকা প্রতীকে সিল দেওয়া হচ্ছে। পাশে দাঁড়িয়ে ছিল আওয়ামী লীগের এক কর্মী। ওই কক্ষের অন্য পাশেই প্রিসাইডিং অফিসার ঘোরাঘুরি করছেন। সাংবাদিকের উপস্থিতি টের পেয়ে প্রকাশ্যে সিল মারা বন্ধ করে গোপন কক্ষে গিয়ে ভোট দেওয়া হয়।

এ ব্যাপারে প্রিসাইডিং অফিসার শায়েস্তা খানকে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, নির্বাচন সুষ্ঠু হচ্ছে। কোনো সমস্যা নেই। কোনো অনিয়ম হচ্ছে না। স্বাভাবিকভাবেই ভোটাররা ভোট দিচ্ছে। তবে একসময় দুজন লোক কেন্দ্রে প্রবেশ করে গণ্ডগোল করার চেষ্টা করেছে। কিন্তু পুলিশের কারণে তারা তা করতে পারেনি।

তবে অভিযোগ উঠেছে, ওই কেন্দ্রে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী ও বিএনপির এজেন্টদের বের করে দেওয়া হয়। আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীকে মারধর করা হয়।

সেখান থেকে বেরিয়ে আসার পর পাশের রাস্তার মোড়ে এ নিয়ে আলোচনা করছিল স্থানীয় ভোটাররা। তাদের কেউ ভোট দিতে পারেনি। সালাম খান বলেন, ‘ভোট দিতে গিয়ে ফিরে আইছি। তারাই (নৌকার লোক) ভোট দিতাছে। আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী, বিএনপি প্রার্থীর কোনো লোক ভেতরে থাকতে দেয় নাই। ’ বেকড়া গ্রামের আবদুল আউয়াল, বাতেন মিয়া, ইছাক মোল্লা, রাসেল মিয়াসহ অর্ধশতাধিক লোক সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে সেখানে ভিড় করে। তারা বলে, তারা কেন্দ্রে গিয়ে লাইনে দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু ভোট দিতে না পেরে ফিরে এসেছে। নৌকার লোক কেন্দ্রে আছে, তারাই ভোট দিচ্ছে। পরে তারা দুই হাতের বৃদ্ধাঙ্গুল দেখায়, কিন্তু তাতে অমোচনীয় কালির দাগ নেই। আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী কেন্দ্রে গেলে তাঁকে মারধর করা হয় বলে তারা জানায়।

কিছুদূরেই রাস্তার পাশে চেয়ারে বসে ছিলেন বিদ্রোহী প্রার্থী মোল্লা মনিরুজ্জামান মিঠু। তাঁর কপালে আঘাতের চিহ্ন, পায়ে ও পায়জামায় মাটির দাগ। পেছনে কয়েকজন পাখা দিয়ে তাঁকে বাতাস করছে। মিঠু কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সকাল ৮টার পরপর এবতেদায়ি মাদ্রাসা কেন্দ্র পরিদর্শনে গিয়ে দেখি, নৌকার লোকজন জাল ভোট দিচ্ছে। একজনই ব্যালট পেপার নিয়ে বারবার ভোট দিচ্ছে। এর প্রতিবাদ করলে আওয়ামী লীগের লোকজন আমার ওপর হামলা করে। আমাকে মারধরের এক পর্যায়ে আমি পুকুরের পানিতে পড়ে যাই। ’ মিঠুর এজেন্ট আকলিমা খানম বলেন, ‘জাল ভোট দেওয়ার প্রতিবাদ করলে তাদের লোকজন আমাকেও মারধর করে। ’ এই বলে তিনি তাঁর ডান চোখের নিচে জখমের দাগ দেখান।

সলিমাবাদ ইউনিয়নের সলিমাবাদ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রের আওয়ামী লীগের লোকজন ভোটারদের নৌকা প্রতীকে প্রকাশ্যে ভোট দিতে বাধ্য করে। সকাল ১১টার দিকে একজন নারী ভোট দিয়ে বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কয়েকজন লোক ধেয়ে এসে তাঁকে ধরে ফেলে এবং টেনে বের করে নিয়ে যেতে চায়। সালমা নামের ওই ভোটার বলেন, ‘আমি তাগো (নৌকায়) বুট দেই নাই দেইখা আমারে ধরছে। আমার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করতাছে। ’ সূত্র জানায়, ওই কেন্দ্রে শুধু আওয়ামী লীগের লোকজন ছিল। আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী ও বিএনপির লোকজন ছিল না। প্রিসাইডিং অফিসার নুরুন নবী জানান, সাড়ে ১০টার দিকে একজন লোক হঠাৎ কেন্দ্রে প্রবেশ করে হইচই শুরু করে। তার পেছনে আরো কয়েকজন ঢুকে পড়ে। তারাও হইচই শুরু করে। এক আনসার সদস্যের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করে। পরে তারা চলে যায়। অন্য কোনো সমস্যা হয়নি।

সাড়ে ১১টার দিকে সলিমাবাদ তেবাড়িয়া কেন্দ্রে দেখা হয় সলিমাবাদ ইউনিয়নের আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী শফিকুল ইসলামের সঙ্গে। তখন তাঁর পাঞ্জাবি ছিল ছেঁড়া। তিনি জানান, সকাল সাড়ে ১০টার দিকে তিনি সলিমাবাদ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে প্রবেশ করার সঙ্গে সঙ্গে আওয়ামী লীগের লোকজন তাঁকে মারধর শুরু করে এবং তাঁর মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেয়। এ ইউনিয়নের তিনটি কেন্দ্রে তাঁর এজেন্টদের বের করে দেওয়া হয়। সেখানে আওয়ামী লীগের লোকজন ব্যালট পেপার নিয়ে সিল মারে বলে তিনি অভিযোগ করেন। তবে সলিমাবাদ তেবাড়িয়া কেন্দ্রে কোনো সমস্যা হয়নি বলে ভোটারসহ সংশ্লিষ্টরা জানান।

উপজেলার অন্যান্য কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ নিয়ে কোনো প্রার্থী বড় ধরনের কোনো অভিযোগ তোলেননি।


মন্তব্য