kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৯ জানুয়ারি ২০১৭ । ৬ মাঘ ১৪২৩। ২০ রবিউস সানি ১৪৩৮।


ভোটকর্তার অদম্য সিল

লিমন বাসার, বগুড়া   

২৩ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



ভোটকর্তার অদম্য সিল

১১টা : গতকাল মঙ্গলবার। ঘড়ির কাঁটায় ঠিক ১১টা।

বগুড়ার সারিয়াকান্দি উপজেলার হাটশেরপুর নিজবলাইল উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্র। বাইরে পুলিশ, র‌্যাব ও বিজিবির কড়া নিরাপত্তা। মাঠে ভোটারদের দীর্ঘ লাইন। কক্ষের ভেতরে ফাঁকা। দ্বিতীয় তলার নির্ধারিত কক্ষে প্রিসাইডিং অফিসার শাহীন মিয়া ব্যালট ছিঁড়ে সিল মারায় ব্যস্ত। সকাল ১১টা পর্যন্ত মাত্র তিন ঘণ্টায় এই কেন্দ্রের একটি বুথে ৯৫ ভাগ ভোট জমা পড়েছে। অথচ বাইরে অপেক্ষমাণ ভোটাররা বলছে—চার ঘণ্টা ধরে লাইনে দাঁড়িয়ে তারা চুল পরিমাণ এগোতে পারেনি।

১০.৫০টা : নিজ বলাইল ১ নম্বর বোর্ড অফিস কেন্দ্রে গিয়ে দিখো গেছে, নৌকা প্রতীকের কার্ড লাগিয়ে কিছু উচ্ছৃঙ্খল যুবক পুলিশের সামনে ভোটারদের ভয়ভীতি দেখাচ্ছে। নৌকায় ভোট না দিলে বাড়িঘরে হামলা চালানোর হুমকি দিচ্ছে। পুলিশের পরিদর্শক কামরুজ্জামান বলেন, ‘কী করব ভাই? দলের লোক, কিছুই বলার নেই। অনুরোধ করেছি সরে যেতে। তারা কেউই কথা শোনে না। ’ কেন্দ্রের ভেতরে গিয়ে দেখা গেছে, ১১টা বাজার ১০ মিনিট আগেই ৫০ শতাংশ ভোট পড়েছে। কী করে এটা সম্ভব হলো? প্রিসাইডিং অফিসার রেজ্জাকুল আহসানের জবাব, ‘কেন্দ্রে ঢুকে ব্যালট ছিনিয়ে নিয়েছিল নৌকার পক্ষের লোকজন। জান নিয়ে কোনো মতে দায়িত্ব পালন করছি। পুলিশকে অনুরোধ করেও কোনো লাভ হয়নি। এখন যত দ্রুত ভোট নেওয়া শেষ হবে, ততই মঙ্গল। ’

১০.৩০টা : কুদুবপুর ইউনিয়নের শোলারতাইড় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা গেছে, প্রিসাইডিং অফিসার (উপজেলা সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা) আশরাফ আলী চেয়ারে বসে ঘুমাচ্ছেন। বাইরে ভোটারদের দীর্ঘ লাইন। ভোটগ্রহণে কচ্ছপ গতি। এর পরও সেখানে দুই হাজার ৪০৮ জন ভোটারের মধ্যে ৬০০ ভোট জমা হয়েছে। সাংবাদিক এসেছে জানতে পেরে চোখ ডলতে ডলতে প্রিসাইডিং অফিসার আশরাফ বলেন, ‘ভোটগ্রহণের গতি ভালো। এ জন্য এত ভোট পড়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই শতভাগ ভোট গ্রহণ করা যাবে। ’

৯.৩০টা : জোরগাছা ইউনিয়নের পারভেলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্র। বাইরে ভোটারদের দীর্ঘ লাইন স্কুলের মাঠ পেরিয়ে দূরে রাস্তায় গিয়ে ঠেকেছে। ভোটাররা জানায়, ভোর ৬টা থেকে লাইনে দাঁড়িয়েছে। আট-দশজন বাদে কেউ ভোট দিতে পারেনি। ঘটনা জানতে একটি কক্ষে ঢুকে দেখা গেল, নৌকা প্রতীকের পক্ষে নারী-পুরুষ আট-দশজন সিল মারতে ব্যস্ত। তাদের ব্যালট কেটে দেওয়া, স্বাক্ষর করাতে ব্যস্ত সহকারী প্রিসাইডিং অফিসার তাসলিমা খাতুন। ব্যালট বাক্স ভরা। প্রিসাইডিং অফিসার ছদরুল ইসলাম বলেন, ‘এই কেন্দ্রে এক হাজার ৯৬৪ জন ভোটারের মধ্যে ৪০ ভাগেরও বেশি ভোটার দেড় ঘণ্টার মধ্যে ভোট দিয়েছেন। ’

৯.০০টা : জোরগাছা বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রের কক্ষে গিয়ে দেখা গেছে, সহকারী প্রিসাইডিং অফিসার আব্দুল মালেক মোবাইল ফোনে কথা বলছেন আর ব্যালটে সিল মারছেন। ভোটার ভেবে প্রথমে একগাল হেসে বললেন, ‘ভোট দেওয়া লাগবি না। বাড়িত যান, ভোট হয়্যা গেছে। ’ পরে সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে বলেন, ‘ব্যালটে সই দিতে গিয়ে ভুল করে সিল মেরেছি। এখন থেকে সতর্ক থাকব। ’ এই কেন্দ্রের প্রিসাইডিং অফিসার মিজানুর রহমান বলেন, ‘সবাইকে বলেছি আইন মেনে কাজ করতে। কেউ অন্যায় করলে নিজ দায়িত্বে করবে। ’ তবে তিনি বাক্স ভরার ব্যাপারে কোনো মন্তব্য করতে চাননি।

বগুড়ার ১৩টি ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনের মধ্যে সারিয়াকান্দির বিভিন্ন কেন্দ্র ঘুরে ঠিক এমন চিত্র মিলেছে। বেশির ভাগ কেন্দ্র সরকারি দলের কর্মীরা দখলে নিয়েছে। কোনো কোনো কেন্দ্রে শত শত ভোটার গিয়ে দেখেছে, তাদের ভোট আগেই দেওয়া হয়ে গেছে। হাটশেরপুর ইউনিয়নে নিউ বলাইল কেন্দ্রে ধানের শীষ প্রতীকের চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী আলিনুর রহমানের স্ত্রী মনোয়ারা সুলতানা অভিযোগ করেন, ‘নৌকার পক্ষের লোকজন আমাদের লোকজনকে মারপিট করে কেন্দ্র থেকে বের করে দিয়েছে। পুলিশের কাছে অভিযোগ করলেও তারা কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। এ ছাড়া প্রতিপক্ষের লোকজন আমাকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করেছে। আমাকেও ভোট দিতে দেয়নি। ’

এই কেন্দ্রের ভোটার রফিকুল ইসলাম, আমিনুল, ফরিদ মিয়া, সবুজ আলী ও সুজানুর রহমানসহ আরো অনেকে অভিযোগ করে বলেন, তাঁরা ভোর ৬টা থেকে লাইনে দাঁড়িয়েছেন। কিন্তু কেন্দ্রে ঢুকে জানতে পারেন, ভোট দেওয়া হয়ে গেছে। এখন তাঁরা বাড়ি ফিরে যাচ্ছেন।

এ ছাড়া কেন্দ্র এলাকায় যানবাহন চলাচলে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা তা মানছে না। অবাধে মোটরসাইকেল, ব্যক্তিগত গাড়ি চলাচল ছিল সবখানে। কোনো কোনো এলাকায় মোটরসাইকেলে চারজন করে ঘুরতে দেখা গেছে।

পুরাতন বোর্ড অফিস কেন্দ্রে ভোটার সামসুল, আরেফিন, হাকিম মোল্লা ও আরশাদ আলী অভিযোগ করে বলেন, ‘কেন্দ্রের মধ্যে নৌকার পক্ষে স্লোগান দিয়ে হামলা হলো। বাক্স ছিনিয়ে নিতে না পেরে ব্যালট পেপার নিয়ে গেল। কিন্তু পুলিশ কিছুই বলল না। ’

শোলারতাইড় কেন্দ্রে ধানের শীষের চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী লুত্ফুল হায়দার বলেন, ‘বাইরে লাইন দেখে মন ভরে যাবে। যে কেউ ভাববে, সুষ্ঠু ভোট হচ্ছে। ভেতরে যত কাজ। এখানে দুই ঘণ্টায় মাত্র ১০ জন ভোট দিলেও ৪০ ভাগ ভোট পড়েছে বলে ঘোষণা দেওয়া হচ্ছে। নৌকার লোকজন ভেতরে রামরাজত্ব করলেও সবাই নীরব দর্শক। ’

বিষয়টি নিয়ে প্রিসাইডিং অফিসার ছদরুল আলম বলেন, ‘আমার করার কিছু নেই। কেউ কথা শোনে না। আমি চুপচাপ নিজের কক্ষে বসে আছি। ’

কর্ণিবাড়ী ইউনিয়নের দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তা সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার গাজিউর রহমান অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘ভোট সুষুমভাবে হয়েছে। বিএনপি প্রার্থীর অভিযোগ ঠিক নয়। ’


মন্তব্য