kalerkantho

26th march banner

ব্যালট ভোটারের সিল আ. লীগের

এমরান হাসান সোহেল, পটুয়াখালী   

২৩ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



ব্যালট ভোটারের সিল আ. লীগের

পটুয়াখালীর বাউফলের ধূলিয়া ইউনিয়নের চাঁদকাঠী জিএন ইসলামিয়া দাখিল মাদ্রাসা কেন্দ্রে ভোটারদের কাছ থেকে ব্যালট ছিনিয়ে নিয়ে প্রকাশ্যে সিল মারে আওয়ামী লীগকর্মীরা। ছবি : কালের কণ্ঠ

মঙ্গলবার। ঘড়ির কাঁটায় তখন সকাল ৮টা ২০ মিনিট। পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার চাঁদকাঠি জিএন ইসলামিয়া দাখিল মাদ্রাসা কেন্দ্র। ছয়টি বুথের সামনে নারী-পুরুষের দীর্ঘ লাইন। পুরোপুরি শান্তিপূর্ণ ভোটের ছবি। কিন্তু বুথের ভেতরের ছবি আবার আলাদা। এখানে ধুলিয়া ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনের ভোট চলছে। ভোটার ব্যালট পেপার হাতে নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তা নিয়ে যাচ্ছে নৌকা প্রতীকের প্রার্থী আনিচুর রহমান হাওলাদারের (আব্দুর রব) লোকজন। টেবিলের ওপর রেখে চেয়ারম্যান প্রার্থীর নৌকা প্রতীকে সিল মারছে তারা। প্রতিটি বুথ ঘুরে দেখা গেছে এ রকম ভোট দখলের ছবি।

সাংবাদিকদের উপস্থিতি টের পেয়ে আওয়ামী লীগের প্রার্থীর লোকজন বুথ থেকে বেরিয়ে যায়। সাংবাদিকদের একটি দল ওখানে অবস্থান করার সময় ভোটাররা ইচ্ছেমতো বুথে গিয়ে ভোট দিয়েছেন। সাইফুল নামের এক ভোটার এ সময় ভোট দিয়ে বেরিয়ে বলেন, ‘ভাই, আপনাদের কারণে আমার ভোটটা আমিই দিছি। আমাদের বাড়ির দুইজন ভোট দিতে এসে চেয়ারম্যান প্রার্থীদের ব্যালটে নিজেরা ভোট দিতে পারেন নাই। ভাই আমি কৃতজ্ঞ আপনাদের কাছে। ’

ওই কেন্দ্র থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় বিউটি বেগম নামে এক ভোটার বলেন, ‘চেয়ারম্যান ব্যালেটে সিল মারতে পারি নাই। আমার তোন ব্যালট লইয়া গ্যাছে। ’ একই ধরনের অভিযোগ করেন আমির হোসেন, নুরুল আমিন, মো. সোহাগ ও ফেরদৌসী বেগম। ভোট দিতে না পারা রফিকুল আলম নামের এক ভোটার ক্ষুব্ধ মনোভাব প্রকাশ করে অন্যদের বলেন, ‘কেন্দ্রে যাও কী করতে? ব্যালট লইয়া যায়। ’ এসব কথা শুনে অনেকে আবার কেন্দ্রে না গিয়ে বাড়ির পথে পা বাড়ায়।

ওই কেন্দ্রে অবস্থানকালে বিএনপি প্রার্থী আব্দুল জব্বার মৃধা ৮টা ৪০ মিনিটে কেন্দ্র পরিদর্শনে আসেন। তিনি ভ্রাম্যমাণ আদালতের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এবং প্রিসাইডিং অফিসারের কাছে এজেন্টকে মারধর করে বের করে দেওয়া এবং দেখিয়ে ভোট দেওয়ার কারণে স্থগিত করার অনুরোধ করেন। কেন্দ্রে নানা অনিয়মের ব্যাপারে প্রিসাইডিং অফিসার ইমরান হোসেন বলেন, ‘এখানে শান্তিপূর্ণ ভোট চলছে, কোনো অনিয়ম নেই। ’

ওই কেন্দ্রের দায়িত্বে থাকা বিএনপি প্রার্থীর এজেন্টদের দেখা গেল প্রায় ৪০০ গজ দূরে। কেন্দ্র থেকে বের করে দেওয়ার সময় মারধরের কারণে দুজনের মুখে ফোলা জখম রয়েছে। এরই মধ্যে খবর আসে ওই ইউনিয়নের জামালকাঠি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে নির্ধারিত চেয়ারম্যান প্রার্থীকে ভোট দেওয়া হচ্ছিল। এ নিয়ে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি সমর্থকদের মধ্যে সংর্ঘষ বেঁধেছে। এরই মধ্যে খবর আসে ওই উপজেলার বগা ইউনিয়নে ভোট বর্জন করেছেন আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী এস এম ইউসুফ।   এর কিছুক্ষণ পরই কেশবপুর ইউপিতে ভোট বর্জনের ঘোষণা দেন স্বতন্ত্র প্রার্থী  মো. তসলিম তালুকদার।

৯টা ২০ মিনিটে ওই ইউনিয়নের চাঁদকাঠি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে গিয়ে দেখা গেছে একই ছবি। মোটরসাইকেল থামাতেই নৌকা প্রতীক বুকে জড়ানো কয়েকজন ছুটে এসে বলে, ‘এখানে ভোটের পরিবেশ একেবারে শান্তিপূর্ণ। কোনো ঝামেলা নেই। ’ বুথের ভেতরের দৃশ্য ছিল চাঁদকাঠি জিএন ইসলামিয়া দাখিল মাদ্রাসা কেন্দ্রের মতো। সকাল ১০টা ৫ মিনিটে ওই কেন্দ্র পরিদর্শনে এসে বিএনপির প্রার্থী ও বর্তমান চেয়ারম্যান আব্দুল জব্বার মৃধা ভোট বর্জনের ঘোষণা দেন।

সকাল ১১টায় সূর্যমণি ইউপির ইদ্রকুল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে গিয়ে দেখা গেছে, আওয়ামী লীগের প্রার্থী আনোয়ার হোসেন বাচ্চুর সমর্থকরা প্রকাশ্যে ভোটারদের কাছ থেকে ব্যালট ছিনিয়ে নিয়ে নৌকা প্রতীকে সিল মারছে। ওই কেন্দ্রে থাকা অবস্থায় খবর আসে ওই ইউনিয়নের সূর্যমণি মাধ্যমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রের ব্যালট ছিনতাই করে আওয়ামী লীগের কর্মীরা নিয়ে গেছে।

সকাল ১১টা ২৫ মিনিটে কনকদিয়া ইউপির বর্তমান চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ বিদ্রোহী প্রার্থী মিজানুর রহমান হিরন অভিযোগ করেন, সাকিব রায়হানের নেতৃত্বে সব কেন্দ্র দখল হয়ে গেছে। সাকিব বাউফল উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও স্থানীয় সংসদ সদস্য আ স ম ফিরোজের ছেলে। ফিরোজ চিফ হুইপও। তাই ওই প্রার্থী ভোট বর্জনের ঘোষণা দিয়েছেন। এই ইউপিতে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হচ্ছেন মো. শাহিন হাওলাদার। ধুলিয়া ও কেশবপুর ইউপির দায়িত্বে থাকা রিটার্নিং অফিসার এস এম শাহজাদা বলেন, ‘পিসাইডিং অফিসাররা আমাকে জানিয়েছেন, সুষ্ঠু এবং শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোট হয়েছে। কিছু কিছু কেন্দ্রে গোলযোগ দেখা দিলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করেছে। ’


মন্তব্য