kalerkantho


বিরোধের বলি তিন মাসের শিশু বালুমহাল নিয়ে সংঘর্ষ গ্রামবাসীর

হবিগঞ্জ প্রতিনিধি   

২২ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



মাটির ঘরে ঝোলানো দোলনা, তাতে বিছানা ছোট্ট শিশুর। পাশেই কাগজের ফুল, তোয়ালে, মশারি।

তিন মাসের শিশু তাছপিয়া আক্তার প্রমী এ দোলনায় আর দুলবে না, সদ্য শেখা হাসি-কান্নায় বিহ্বল করবে না সে স্বজনদের। বড়দের বিরোধে রবিবার গভীর রাতে মায়ের কোল থেকে কেড়ে নিয়ে তাকে হত্যা করা হয়েছে মাটিতে আছড়িয়ে ও পায়ে মাড়িয়ে। ঘটনাটি হবিগঞ্জের নোয়াবাদ এলাকার। খোয়াই নদীর বালু উত্তোলন নিয়ে দুই পক্ষের বিরোধে ঘটেছে এ পাষণ্ডতা।

হবিগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার শহিদুল ইসলাম বলেন, বালুমহাল নিয়ে দুই দিন ধরে এলাকাটিতে সংঘর্ষ হচ্ছে। রবিবার রাতে সংঘর্ষের সময় শিশু মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। তবে ময়নাতদন্ত ছাড়া বলা যাচ্ছে না শিশুটি কিভাবে মারা গেছে।

হবিগঞ্জ সদর মডেল থানার ওসি মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন বলেন, ঘটনার পর শাহিদা আক্তার নামে একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

অন্য আসামিদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।

হবিগঞ্জ সদর আধুনিক হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. দেবাশীষ দাশ জানান, ময়নাতদন্তের সময় শিশুর মাথায় আঘাত ও মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণের আলামত দেখা গেছে।

স্থানীয় সূত্র জানায়, মশাজান এলাকায় খোয়াই নদীর বালুমহাল থেকে ছাত্রলীগ নেতা মুছা আহমেদ রাজুসহ কয়েকজন বালু উত্তোলন করছিলেন। এ কাজ দেখাশোনার দায়িত্বে ছিলেন পাশের নোয়াবাদ গ্রামের আমজাদ আলী। বালু পরিবহনের সুবিধার্থে শনিবার সকাল ১১টায় রাস্তার কয়েকটি গাছ কাটা হয়। এতে বাধা দেন মশাজান গ্রামের মন্নর আলীসহ কয়েকজন। দুই পক্ষে সংঘর্ষ হলে রাতে মন্নর আলীসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে হবিগঞ্জ সদর মডেল থানায় মামলা করেন আমজাদ আলী। এ সংবাদে ক্ষিপ্ত হয়ে রবিবার রাত ৯টার দিকে মন্নর আলীর লোকজন হামলা চালায় বাদীর বাড়িতে। এ সময় আমজাদ আলীর ভাই আম্বর আলীর শিশুকন্যা তাছপিয়া আক্তার প্রমীর মৃত্যু হয়। দুই গ্রামের বাসিন্দাদের সংঘর্ষ থামাতে পুলিশ পাঁচ রাউন্ড রাবার বুলেট ছোড়ে। বর্তমানে এলাকায় থমথমে পরিবেশ বিরাজ করছে।

শোকার্ত মা আছমা আক্তার বলেন, ‘রাতে কয়েকজন ঘরে ঢুকে ভাঙচুর শুরু করে। তারা উত্তেজিত হয়ে তাছপিয়াকে কোল থেকে তুলে নিয়ে আছড়ে মাটিতে ফেলে দেয়। একজন তার গলার মধ্যে পা দিয়ে চাপা দেয়। ’

চাচা আমজাদ আলী বলেন, ‘মন্নর আলীদের সঙ্গে বালু উত্তোলন নিয়ে বিরোধ চলছিল। এর জেরে দুই দিন ধরে তারা হামলাসহ অত্যাচার চালিয়ে আসছিল। রবিবার রাত ৯টার দিকে তারা দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে আমাদের বাড়িতে হামলা চালায়। ’

গ্রামবাসী জানায়, হবিগঞ্জ শহরসংলগ্ন খোয়াই নদীর তীর ঘেঁষা গ্রাম নোয়াবাদ। এখানে নদীর চরে আবাদ ও কৃষিকাজ করে জীবিকা চলে গ্রামবাসীর। বালুমহালের জন্য নির্ধারিত কয়েকটি ঘাট থাকলেও সেখানে বালু কমে যাওয়ায় এখন গ্রামের ভেতরে ড্রেজার বসানো হচ্ছে। সম্প্রতি গ্রামের কদর আলীর সঙ্গে ৩০ হাজার টাকায় বালু উত্তোলনের জন্য চুক্তি করেছেন ছাত্রলীগ নেতা রাজু। কদর আলী জমি ব্যবহার করতে দেওয়ায় তাঁর সঙ্গে বিরোধ হয় গ্রামবাসীর। এরপর শনিবার গাছ কাটা নিয়ে ছাত্রলীগ নেতাদের বাধা দিলে সংঘর্ষ শুরু হয়। নোয়াবাদ গ্রামের লোকজন বালু ব্যবসায়ীদের হামলার মুখে অবরুদ্ধ হয়ে পড়লে ক্ষুব্ধ হয়ে কদর আলীর বাড়িতে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর করে। এ সময় তাঁর এক ছেলের শিশুকন্যা মারা যায়।

ময়নাতদন্তের পর গতকাল দুপুরে শিশু তাছপিয়ার লাশ গ্রামে আনলে শোকাবহ পরিবেশ তৈরি হয়। বালু ব্যবসায়ীসহ গ্রামবাসীর কয়েকজনের নাম উল্লেখ করে ক্ষোভ প্রকাশ করতে থাকে অনেকে। শোকার্ত মা আছমা আক্তার আহাজারি করে বারবার মূর্ছা যাচ্ছিলেন। বিকেলে বাড়ির পাশে কবরস্থানে দাফন করা হয় শিশুকে।

সংঘর্ষ ও শিশু মৃত্যুর ঘটনার পর নোয়াবাদ গ্রামে গতকাল র‌্যাব-পুলিশের টহল ছিল। অভিযুক্তরা গ্রাম থেকে গা ঢাকা দিয়েছে। বেশির ভাগ বাড়িতেই এখন তালা ঝুলছে।


মন্তব্য