kalerkantho


‘ওরা যে এত বর্বর তা আগে বুঝিনি’

সৈয়দপুরে গৃহবধূ ফাহমিদাকে নির্যাতন

সৈয়দপুর (নীলফামারী) প্রতিনিধি   

২২ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



‘ওরা যে এত বর্বর পাষাণ, তা আগে বুঝিনি। সবাই মিলে আমাকে আগুনে পুড়িয়ে মেরে ফেলতে চেয়েছিল। পুলিশ এসে আমাকে উদ্ধার না করলে মেরেই ফেলত। মানুষ কি এত নিষ্ঠুর, নির্দয় হতে পারে?’ নীলফামারীর সৈয়দপুর উপজেলা শহরের গৃহবধূ ফাহমিদা মল্লিক স্বামী ও তার পরিবারের সদস্যদের নির্মম নির্যাতনের বর্ণনা দিচ্ছিলেন এভাবে। তিনি সৈয়দপুর ১০০ শয্যার হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে কাতরাচ্ছেন তিন দিন ধরে।

গত শনিবার রাতে স্বামীর বাড়ি থেকে তাঁকে গুরুতর আহত অবস্থায় উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করেছে পুলিশ। এখনো তাঁর শরীরের বিভিন্ন জায়গায় নির্যাতনের চিহ্ন রয়েছে। গত রবিবার রাতে ওই হাসপাতালের মহিলা ওয়ার্ডে বসে তাঁর সঙ্গে কথা হয় এ প্রতিবেদকের। সেদিনের অত্যাচার-নির্যাতনের বর্ণনা দিতে গিয়ে হাউমাউ করে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। এ সময় সেখানে উপস্থিত অনেকে চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি।

পরিবার সূত্রে জানা গেছে, ২০১২ সালের ২৫ মে শহরের নতুন বাবুপাড়া হাজি কলোনির মৃত শেখ আমানতের ছেলে মাসুদ রানা মুকুলের (৩৪) সঙ্গে পারিবারিকভাবে বিয়ে হয় ফাহমিদা মল্লিকের (২০)। ফাহমিদা শহরের মুন্সিপাড়ার মৃত আসগার মল্লিকের মেয়ে। বিয়ের সময় যৌতুক হিসেবে জামাতাকে ৫০ হাজার টাকা, স্বর্ণালংকারসহ প্রায় আড়াই লাখ টাকা দেন শ্বশুর। কিন্তু যৌতুক লোভী স্বামী ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা বিয়ের কিছুদিন যেতে না যেতে আরো দুই লাখ টাকা দাবি করে। এ জন্য চাপ দেয়। বধূর ওপর কারণে-অকারণে চালায় নির্যাতন। কিন্তু তাদের নির্যাতন চোখ বুঝে সহ্য করে স্বামীর বাড়িতে পড়ে থাকেন তিনি। পরবর্তীতে তাঁর ওপর অত্যাচার-নির্যাতনের মাত্রা বেড়ে যায়। এতে গৃহবধূর বাবা মেয়ের সুখের কথা ভেবে ঋণ গ্রহণ করে জামাতার হাতে এক লাখ ২৫ হাজার টাকা তুলে দেন। কিন্তু এতেও জামাতার মন ভরেনি। সে তার দাবিকৃত যৌতুকের বাকি ৭৫ হাজার টাকার জন্য আবারও অমানুষিক নির্যাতন করতে থাকে। গত বছরের ৮ জানুয়ারি আরো এক লাখ ৭৫ হাজার টাকা নিয়ে আসার জন্য প্রচণ্ড চাপ দেয়। কিন্তু বাবার আর্থিক অনটনের কারণে তা আনতে অপারগতা প্রকাশ করেন বধূ। আর এতে ক্ষিপ্ত হয়ে স্বামী ও তার পরিবারের সদস্যরা মিলে গৃহবধূকে বেদম মারপিট করে। একপর্যায়ে তাঁকে স্বামীর বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়। এতে অনেকটা নিরুপায় হয়ে গৃহবধূ তাঁর বাবার বাড়িতে এসে আশ্রয় নেন। পরে স্বামী ওই বধূর কোনো খোঁজখবর করেননি। একাধিকবার দেনদরবার করেও আপস-মীমাংসা করা যায়নি। গত বছরের ১৯ অক্টোবর যৌতুক আইনে আদালতে একটি মামলা হয়। মামলায় গৃহবধূর স্বামী, ভাশুর মাসুদ আখতার বকুল (৩৬), ননদ লতা বেগম (৪০) ও ননদের মেয়ে জেসমিন আবেদীন রুমীকে (২৪) আসামি করা হয়। গত ১৬ মার্চ ছিল মামলার ধার্য দিন। ওই দিন জেলে যাওয়ার ভয়ে সুচতুর স্বামী স্ত্রীকে আর নির্যাতন করবে না মর্মে আদালতে একটি লিখিত অঙ্গীকারনামা দেয়। আদালত চত্বর থেকে বের হয়ে স্ত্রীকে একটি অটোরিকশায় নিয়ে বাড়ির উদ্দেশে রওনা হয়। কিন্তু নীলফামারী থেকে সৈয়দপুর আসার পথে স্ত্রীকে অটোরিকশায় বসিয়ে রেখে সুকৌশলে সটকে পড়ে স্বামী।

সৈয়দপুর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. নজরুল ইসলাম বলেন, ‘এ নিয়ে আদালতে মামলা বিচারাধীন। তার পরও ওই ঘটনার বিষয়ে গৃহবধূর পরিবারের লিখিত অভিযোগ পেলে আইনগত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ’


মন্তব্য