kalerkantho

নদীর পানিই ভরসা

বিশ্ব পানি দিবস আজ

এমরান হাসান সোহেল, পটুয়াখালী   

২২ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



নদীর পানিই ভরসা

পটুয়াখালীর পূর্ব দিক দিয়ে বহমান তেঁতুলিয়া নদীর বুক ফুঁড়ে জেগে ওঠা চন্দ্রদ্বীপ ইউনিয়ন। এই চরে হাজার হাজার মানুষের বাস।

চারপাশে শুধু পানি আর পানি। সুপেয় নয়। তবু রান্নাবান্নাসহ ওই নদীর পানিই পান করতে হয় তাদের। প্রায় ৫০ বছরের অধিক সময় ধরে বিশুদ্ধ পানির সংকট চললেও তা নিরসনে এগিয়ে আসেনি সরকার।

পটুয়াখালী সদর থেকে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার পূর্ব দিকে বাউফল উপজেলার কালাইয়া লঞ্চঘাট। এরপর ৩০ মিনিটের খেয়া পাড়ি দিয়ে চন্দ্রদ্বীপ ভূখণ্ড শুরু। ছোট ছোট প্রায় আটটি চর নিয়ে ওই ইউনিয়ন। এখানে প্রায় ১৫ হাজার মানুষের বাস। নদীতে মাছ শিকার এবং চরের জমিতে আবাদ করে তারা জীবিকা নির্বাহ করে।

কিন্তু বিশুদ্ধ পানির অভাবে তারা পানিবাহিত নানা রোগে ভোগে বারো মাস।

ওই ইউনিয়নের চরব্যারেটে (পটুয়াখালী জেলার শেষ ভূখণ্ড) গত শুক্রবার দুপুরে গেলে দেখা যায়, গ্রামের বাসিন্দা মো. নয়ন খাঁ কাঁধে একটি কলস নিয়ে ছুটছেন। জিজ্ঞেস করলে বলেন, ‘আমাগো এলাকায় কল (গভীর নলকূপ) নাই। মিয়াজানের গুচ্ছ গ্রামের তোন এই এক কলস পানি আনছি। ঘরে মেহমান আছে। এই লইগ্যা কলের পানি আনছি। মেহমান না থাকলে আমরা নদীর পানি খাই। ’ তিনি জানান, অনেক সময় ফিটকিরি ব্যবহার করেন। তা শেষ হয়ে গেলে সরাসরি নদীর পানিই পান করেন। দিন এনে দিন খাওয়া অভাবী পরিবার কয়েক কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে বিশুদ্ধ পানি পান করাটাকে বিলাসিতা মনে করে।

চরব্যারেটের মো. শাজাহান হাওলাদার বলেন, ‘কলের তোন পানি আনতে দেড়-দুই ঘণ্টা সোময় লাগে। আমাগো গরিব মাইনস্যের হেই সোময় কি আছে? আমরা নদীর পানি খাই। চরে গরিব মাইনস্যের বসবাস। এই লইগ্যা চরের মাইনস্যের দিকে কেউ হির্রাও (ফিরেও) চায় না। ’ তিনি জানান, অতিথি আগমন, ঈদ বা উৎসব ছাড়া চরের মানুষ গভীর নলকূপের পানি পান করে না।

ওই চরের জয়নব বিবি বলেন, ‘বাবা, আমরা এই নদীর পানি খাইয়া রোজা থাহি, রোজা খুলি। আমাগো পানির আবার ভালমোন্দ। ’

এই ইউনিয়নের প্রায় সব পরিবারের একই অবস্থা। এ কারণে চরের শিশুরা পানিবাহিত নানা রোগে ভোগে সব সময়। শিশুদের ডায়রিয়া ও আমাশয়ের মতো জটিল রোগ সহজে ছাড়ে না। এ কারণে ওই এলাকার শিশুদের শারীরিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়। ভাঙা শরীর নিয়ে বেড়ে ওঠে তারা।

চরব্যারেটের মো. সোলায়মান সিকদার বলেন, ‘আমাগো গুরাগ্যারার (ছেলেমেয়ে) রোগ ছাড়ে না। পাতলা পায়খানা লইগ্যাই থাহে। আবার অষুধ খাওয়াই। ’

দক্ষিণ চরওয়াডেলের বাসিন্দা মো. রফিক চৌকিদার বলেন, ‘কত স্যারেরা (সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তা) চরে আয় (আসে)। আমরা একটা কল দিতে কইছি সবাইরে। কেউ আমাগোরে একটা কল দেয় নাই। ’

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চন্দ্রদ্বীপ ইউনিয়নে সাতটি গভীর নলকূপ। এর মধ্যে দু-একটি প্রায়ই অকেজো হয়ে থাকে। তবে বর্ষা মৌসুমে এ অবস্থার আরো অবনতি হয়। বেড়িবাঁধ না থাকায় জোয়ারের পানিতে অধিকাংশ এলাকা প্লাবিত হয়। এর ফলে নলকূপগুলো আরো বেশি অকেজো থাকে।

শুধু চন্দ্রদ্বীপ ইউনিয়নের চরগুলো নয়, বিশুদ্ধ পানির সংকট রয়েছে পটুয়াখালীর অন্য চরগুলোতেও। দশমিনা উপজেলার চরহাদি, চরশাহজালাল ও চরবোরহান। রাঙ্গাবালী উপজেলার মৌডুবি, গহিনখালী, চরকাশেম, আগুনমুখার চর ও আন্ডার চর। গলাচিপা উপজেলার দরিবাহের চর, গজালিয়া, চরকাজল ও চরবিশ্বাস এবং বাউফল উপজেলার আমরখালী, চরবাসুদেবপাশা, চরপাকডাল, চরমমিনপুরে গভীর নলকূপের অভাব রয়েছে। রয়েছে বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট।

এ বিষয়ে পটুয়াখালী মেডিক্যাল কলেজের শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. সিদ্ধার্থ শংকর দাস বলেন, “বিশুদ্ধ পানির অভাবে কলেরা, আমাশয়, হেপাটাইটিস ‘এ’ ভাইরাস এবং টাইফয়েডের মতো জটিল রোগ হয়। এ জন্য শিশুসহ সব মানুষেরই গভীর নলকূপ অথবা পানি বিশুদ্ধকরণ বড়ি কিংবা ফিটকিরি দিয়ে পানি বিশুদ্ধ করে পান করা উচিত। ”

পটুয়াখালীর জেলা প্রশাসক (ডিসি) শামীমুল হক সিদ্দিকী বলেন, ‘চরাঞ্চলে গভীর নলকূপ স্থাপনের বিষয়টি সরকারের প্রতিবছরের রুটিন ওয়ার্ক (নিত্যনৈমিত্তিক কাজ)। এ বছরও এ কার্যক্রম চলবে। ’


মন্তব্য