kalerkantho


কেন্দ্র ফাঁকা, বাক্স ভরা

কে এম সবুজ, ঝালকাঠি   

২১ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০




কেন্দ্র ফাঁকা, বাক্স ভরা

ঝালকাঠি পৌর নির্বাচনে আদর্শ বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রে গতকাল সকাল ১১টায় এ রকমই চিত্র চোখে পড়ে। সিটি কিন্ডারগার্টেন কেন্দ্রে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী মেয়র প্রার্থী আফজাল হোসেনের ওপর হামলা হলে পুলিশ তাঁকে উদ্ধার করে (ইনসেটে)। ছবি : কালের কণ্ঠ

গতকাল রবিবার সকাল ৮টায় ঝালকাঠি পৌরসভার ১৮টি কেন্দ্রে ভোট গ্রহণ শুরু হয়। শুরুতে কয়েকটি কেন্দ্রে নারী ভোটারের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো।

সকাল ১০টার মধ্যে কেন্দ্রগুলো ফাঁকা হয়ে যায়। কিন্তু ভোট বন্ধ হয়নি। দুপুরের মধ্যে ব্যালট পেপারে ভরে যায় বাক্স।

সকাল সাড়ে ১০টার দিকে আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থীর কর্মীরা ২ নম্বর ওয়ার্ডের পৌরসভা আদর্শ মাধ্যমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে ঢুকে বিএনপির মেয়র প্রার্থী ও আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীর এজেন্টদের বের করে দেয়। এর পর থেকে ১৪টি কেন্দ্র থেকে আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী ছাড়া বাকি সব প্রার্থীর এজেন্টদের বের করে দেওয়া হয়। এ খবর ছড়িয়ে পড়লে ভোটার উপস্থিতি কমতে শুরু করে। সকাল ১১টার দিকে সবগুলো কেন্দ্র ভোটারশূন্য হয়ে যায়। এই সুযোগে আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী লিয়াকত আলী তালুকদারের এজেন্টরা কেন্দ্র দখলে নিয়ে নৌকা প্রতীকে সিল মারে। এ ছাড়া সকাল ১১টার পরে কেন্দ্রে প্রবেশকারী ভোটারের কাছ থেকে মেয়রের ব্যালট কেড়ে নিয়ে নৌকায় সিল দিয়ে দেয় আওয়ামী লীগ প্রার্থীর এজেন্টরা।

যারা ব্যালট দিতে রাজি হননি, তাদের প্রকাশ্যে নৌকায় সিল দিতে বাধ্য করা হয়। এসব ঘটনা প্রিসাইডিং কর্মকর্তাদের জানালে তাঁরা কোনো ব্যবস্থা নেননি। সরেজমিনে ভোটকেন্দ্রগুলো ঘুরে এসব তথ্য জানা গেছে।

বিদ্রোহী প্রার্থীর ওপর হামলা : নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী আফজাল হোসেনের ওপর হামলা করেছে দলীয় প্রার্থীর কর্মীরা। গতকাল সকাল সাড়ে ৯টায় পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সিটি কিন্ডারগার্টেন কেন্দ্রে এ হামলার ঘটনা ঘটে। হামলায় প্রার্থীসহ পাঁচজন আহত হয়। এ সময় পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য লাঠিচার্জ ও এক রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছোড়ে।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, আফজাল ওই কেন্দ্র পরিদর্শনে এসে হইচই দেখে পিস্তল প্রদর্শন করেন। খবর পেয়ে দলীয় প্রার্থীর সমর্থকরা তাঁর ওপর হামলা চালায়। এ সময় আফজালসহ তাঁর চার কর্মীকে মারধর করা হয়। পুলিশ আহত আফজালকে উদ্ধার করে ঝালকাঠি সদর হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসা দেয়। পরে পুলিশ, র‌্যাব ও বিজিবি এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। এ সময় আধাঘণ্টা ভোটগ্রহণ বন্ধ থাকে ওই কেন্দ্রে। পরে সকাল সাড়ে ১০টায় পুনরায় ভোট গ্রহণ শুরু হয়েছে বলে জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা ড. মিজানুর রহমান জানান। এদিকে আফজালকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বরিশাল শেরেবাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

ওই কেন্দ্রে আফজালের স্ত্রী ফরিদা ইয়াসমিন ছবি অভিযোগ করে বলেন, ‘আমার স্বামী কেন্দ্রে প্রবেশ করামাত্র দলীয় প্রার্থীর কর্মীরা বাঁশ দিয়ে পিটিয়ে আহত করে। এ সময় তাঁর জামা ছিঁড়ে ফেলা হয়। কয়েকজন পুলিশ ও ভোটার তাঁকে বিদ্যালয়ের একটি কক্ষে নিয়ে যায়। পরে র‌্যাব ও বিজিবি এসে তাঁকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করে। কোনো কেন্দ্রে সুষ্ঠু নির্বাচন হয়নি। সব কেন্দ্র দখল করে আওয়ামী লীগ প্রার্থীর লোকজন নৌকা প্রতীকে সিল মেরেছে। ’

দফায় দফায় হামলা : সকাল সাড়ে ৯টার দিকে বিদ্রোহী প্রার্থীর ওপর হামলার পর শুরু হয় বিভিন্ন কেন্দ্রে কাউন্সিলর প্রার্থীদের মধ্যে দফায় দফায় হামলা। দুপুর সোয়া একটার সময় সিটি কিন্ডার গার্টেন কেন্দ্রে দুই কাউন্সিলর প্রার্থী ও তাদের কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ বাধে। এতে উভয় পক্ষের কাউন্সিলর প্রার্থী রফিকুল ইসলামসহ ৯ জন আহত হয়। আহতদের মধ্যে প্রার্থীসহ চারজনকে ঝালকাঠি সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, কাউন্সিলর প্রার্থী রফিকুল ইসলাম কেন্দ্রে প্রবেশ করলে প্রতিদ্বন্দ্বী কাউন্সিলর প্রার্থী (ঝালকাঠি শহর যুবলীগের সভাপতি) আবদুল হক খলিফার দুই ছেলে হামলা করে। লাঠির আঘাতে তাঁর মাথায় গুরুতর জখম হয়। তাঁকে রক্ষা করতে গিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ বাধে। এতে সাতজন আহত হয়। দ্রুত তাঁকে ঝালকাঠি সদর হাসপাতালে নেওয়া হয়। খবর পেয়ে রফিকুলের কর্মী-সমর্থকরা এসে হকের দুই ছেলেকে পিটিয়ে আহত করে। এর আগে বেলা ১২টার দিকে কিফাইনগর প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে কাউন্সিলর প্রার্থী ফরিদ হোসেন ও জামাল হোসেনের কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ বাধে। এতে ফরিদ আহত হন। আহতকে ঝালকাঠি সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

ছাত্রলীগ নেতাসহ আটক ৭ : দুপুর ১টার দিকে ঝালকাঠি সরকারি মহিলা কলেজ কেন্দ্রে কাউন্সিলর প্রার্থী আলমগীর হোসেনের পক্ষ হয়ে ব্যালট পেপার ছিনিয়ে নিয়ে সিল মারার সময় জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি হাদিসুর রহমান মিলনকে আটক করে পুলিশ। এ সময় পুলিশ সুপার সুভাষ চন্দ্র সাহার নেতৃত্বে একটি দল লাঠিচার্জ করে। একই সময় পুলিশ বিভিন্ন ভোটকেন্দ্রে অভিযান চালিয়ে আরো ছয়জনকে আটক করে।

বিএনপির পুনর্নির্বাচন দাবি : ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ এনে ঝালকাঠি পৌর নির্বাচনের ফল প্রত্যাখ্যান করেছে বিএনপি। ভোটগ্রহণ শেষে গতকাল সন্ধ্যায় বিএনপির মেয়র প্রার্থী (শহর শাখার সভাপতি) অনাদী কুমার দাস সংবাদ সম্মেলনে এ ঘোষণা দেন। একই সঙ্গে তিনি পুনরায় নির্বাচন দাবি করেন। সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে তিনি বলেন, ‘সকাল ৮টা থেকে ১০টা পর্যন্ত ঠিকমতো ভোট হয়। এরপর আওয়ামী লীগের লোকজন সব কেন্দ্র দখল করে বিএনপির এজেন্টদের বের করে দেয়। তারা ভোট দিতে বাধা প্রদান করে ও ইচ্ছামতো নৌকায় সিল দেয়। ’ আনাদী দাসের বাড়িতে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মনিরুল ইসলাম নূপুর, সাংগঠনিক সম্পাদক মেহেদী হাসান খান বাপ্পী, যুব বিষয়ক সম্পাদক রবিউল হোসেন তুহিন, জেলা ছাত্রদলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক এনামুল হক সাজু প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

রিটার্নিং কর্মকর্তা ও ঝালকাঠির অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক ড. মিজানুর রহমান বলেন, ‘পৌরসভা নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয়েছে। এখন ভোট গণনা চলছে। দু-একটি অভিযোগ পেয়েছি, তা তদন্ত করে দেখা হবে। ’


মন্তব্য