kalerkantho

ভোট দিল শিশুরা!

আবদুর রহমান, কুমিল্লা (দক্ষিণ)   

২১ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



ভোট দিল শিশুরা!

কুমিল্লার নাঙ্গলকোট পৌর নির্বাচনে খান্নাপাড়া ও বাতুপাড়া (ইনসেটে) কেন্দ্রে গতকাল এভাবেই লাইনে দাঁড়িয়ে ভোট দিতে দেখা যায় বহিরাগত কিশোরদের। ছবি : কালের কণ্ঠ

শিশু আইন অনুযায়ী ১৮ বছরের নিচে প্রত্যেকে শিশু। এরা ভোট দিতে পারবে না। কোনো রাজনৈতিক কাজে তাদের ব্যবহার করা যাবে না। গতকাল রবিবার এর উল্টো চিত্র দেখা গেছে নাঙ্গলকোট পৌরসভা নির্বাচনে। সকাল পৌনে ৯টায় দাউদপুর রফিকুল হক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে গিয়ে দেখা গেছে, একদল শিশু লাইনে দাঁড়িয়ে রয়েছে। তারা একের পর এক গিয়ে বিভিন্নজনের নামে ভোট দিচ্ছে। আর কেন্দ্রের সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছে একদল বহিরাগত যুবক। তারা প্রকৃত ভোটারদের কেন্দ্রে ঢুকতে দিচ্ছে না। পর্যাপ্ত পুলিশ সদস্য থাকলেও তাঁরা নীরব ভূমিকা পালন করছেন।

প্রিসাইডিং অফিসার গোলাম রসুল জানান, এ কেন্দ্রে ভোটার সংখ্যা দুই হাজার ১৯১ জন। এর মধ্যে প্রায় ৬০০ ভোট হয়ে গেছে। এ কেন্দ্রের একটি বুথে গিয়ে দেখা গেল, ১৩ বছর বয়সী এক শিশু ভোট দিতে এসে নিজের নাম বলছে দিদারুল ইসলাম। বাবা আবদুল বাতেন, গ্রাম চৌগুড়ি। এ সময় পাশের এক যুবক চিৎকার দিয়ে বলেন, ‘ওর নাম দিদার না, রাসেল। বাড়ি হেসাখাল গ্রামে। ’ এ কথা শুনে দৌড়ে পালাল ওই শিশু। পরে জানা গেল, সে ৩০০ টাকার বিনিময়ে জাল ভোট দিতে এসেছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই কেন্দ্রের এক ভোটার বলেন, ‘বহিরাগত ক্যাডার ও শিশুদের বিভিন্ন ইউনিয়ন থেকে ভাড়া করে আনা হয়েছে। তারা এভাবে কেন্দ্র দখল করে ভোট দেবে। আর পুলিশকেও মোটা অঙ্কের টাকা দিয়ে ম্যানেজ করা হয়েছে। তাই পুলিশও নীরব। ’

সকাল সাড়ে ৯টায় ধাতীশ্বর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে গিয়ে একই দৃশ্য দেখা যায়। ১৩ থেকে ১৬ বছর বয়সী ২০-২৫ জন শিশু লাইনে দাঁড়িয়ে আছে। তবে এ কেন্দ্রে নারী ভোটারের উপস্থিতি ছিল না। কেন্দ্র থেকে ২০০ গজ দূরে অবস্থান নিয়েছে একদল লোক। তারা কোনো ভোটারকে কেন্দ্রে ঢুকতে দিচ্ছে না। ঘুরেফিরে ওই ২০-২৫ জনই ভোট দিচ্ছে। সকাল ১০টায় বাতুপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কেন্দ্রে গিয়ে একই অবস্থা দেখা গেছে। অন্যান্য কেন্দ্রের মতো এখানে একদল শিশু-কিশোর লাইনে দাঁড়িয়ে। তবে এদের মাথায় লাল ফিতা ও গায়ে প্রার্থীর ছবিসহ গেঞ্জি। আগের মতো এরাও একের পর এক ভোট দিচ্ছে। এ কেন্দ্রের চার-পাঁচজন নারী ভোটার লাইনে দাঁড়িয়ে আছে। পরে জানা গেছে, লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা নারীরা ভাড়ায় এসেছে ভোট দিতে। এরা স্থানীয় ভোটার নয়। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে খান্নাপাড়া এ মজিদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ঢুকলে হইচই শুরু হয়। এক যুবক শিশু ভোটারদের উদ্দেশে বলেন, ‘সাংবাদিক আইছে, সিরিয়াল ধর। ’ খান্নাপাড়া গ্রামের আবদুর রহমানের ছেলে রিপন বলেন, ‘এ কেন্দ্রে প্রকৃত ভোটাররা ভোট দিতে পারেনি। বহিরাগত কিছু লোক ভয়ভীতি দেখিয়ে ভোটারদের তাড়িয়ে দিয়েছে। বহিরাগতরাই সকাল থেকে কেন্দ্র দখল নিয়ে নৌকা প্রতীকে একের পর এক ভোট দিচ্ছে। এখন আপনারা (সাংবাদিকরা) এসেছেন। তাই জাল ভোট দেওয়া বন্ধ রয়েছে। আপনারা গেলে আবার শুরু হবে। ’ সকাল ১১টার দিকে নাগদা কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, পুলিশের সামনে নারী বুথে ঢুকে জাল ভোট দিচ্ছে একদল যুবক। পরে সাংবাদিকদের দেখে পুলিশ ওই যুবকদের তাড়িয়ে দিল। সরেজমিনে গিয়ে জানা গেছে, কেন্দ্র দখল করে জাল ভোট দিয়েছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী আবদুল মালেকের পক্ষের ভাড়াটে শিশু-কিশোর ও যুবকরা। এ পৌরসভা নির্বাচনে মোট ১১টি কেন্দ্রের মধ্যে পৌর সদরের দুটি কেন্দ্র ছাড়া সব কেন্দ্র দখল নেয় বহিরাগতরা। বেশির ভাগ কেন্দ্রে গিয়ে দেখা গেছে, বিএনপির প্রার্থীর এজেন্টদের বের করে দেওয়া হয়েছে। তাঁদের পরিবর্তে আওয়ামী লীগের কর্মীদের বানানো হয়েছে বিএনপির এজেন্ট।

এদিকে সকাল ১১টা ৫ মিনিটে নাঙ্গলকোট উপজেলা ও পৌর বিএনপি কার্যালয়ে জরুরি সংবাদ সম্মেলনে নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেন বিএনপির প্রার্থী জাহাঙ্গীর আলম মজুমদার। এ সময় তিনি বলেন, ‘প্রতিটি কেন্দ্র থেকে আমাদের এজেন্টদের বের করে দেওয়া হয়েছে। আওয়ামী লীগের কর্মীদের বিএনপির এজেন্ট বানানো হয়েছে। প্রতিটি কেন্দ্র দখল করে ভোট ডাকাতি করেছে আওয়ামী লীগের কর্মীরা। তারা প্রতিটি কেন্দ্রে জাল ভোটের উৎসব করেছে। তাই আমরা এই প্রহসনের নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দিলাম। ’ একই সঙ্গে বিএনপি সমর্থক বেশ কয়েকজন কাউন্সিলর প্রার্থীও নির্বাচন বর্জন করেন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন পৌর বিএনপির সভাপতি নুরুল আমিন জসিম, উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক নুরুল আফসার নয়ন প্রমুখ।

এ বিষয়ে পৌর নির্বাচনের রিটার্নিং অফিসার (উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা) মো. সাঈদুল আরীফ বলেন, ‘কোথাও দু-একটি বিছিন্ন ঘটনা ছাড়া নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে। বিএনপির এসব অভিযোগ সত্য নয়। তবে অভিযোগ পেলে তদন্ত করে দেখা হবে। ’

উল্লেখ্য, গতকাল অনুষ্ঠিত এ পৌরসভা নির্বাচনে মেয়র পদে পাঁচজন প্রার্থী ছিলেন। তাঁরা হলেন উপজেলা যুবলীগের আহ্বায়ক আবদুল মালেক (নৌকা), পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম মজুমদার (ধানের শীষ), স্বতন্ত্র প্রার্থী উপজেলা যুবদলের সভাপতি আনোয়ার হোসেন ওরফে ছোট নয়ন (জগ), জাতীয় পার্টির কাজী জামাল উদ্দিন (লাঙল) ও ইসলামী অন্দোলনের ইসমাইল হোসেন (হাতপাখা)। এ পৌরসভায় মোট ভোটার ১৭ হাজার ২১৮ জন।


মন্তব্য