kalerkantho

সুরকির বদলে বালু

মানিকগঞ্জে জমিদারবাড়ি সংস্কারে অনিয়ম

মানিকগঞ্জ প্রতিনিধি   

১৯ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



সুরকির বদলে বালু

মানিকগঞ্জের সাটুরিয়া উপজেলার বালিয়াটি জমিদারবাড়ি সংস্কার করা হচ্ছে। ছবিটি গতকাল তোলা। ছবি : কালের কণ্ঠ

মানিকগঞ্জের সাটুরিয়া উপজেলার বালিয়াটি জমিদারবাড়ি সংস্কারে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। সংস্কারকাজে সুরকির বদলে বালু ব্যবহার করা হচ্ছে।

কর্মকর্তাদের দাবি, মূল নির্মাণকাজে বালু ব্যবহার করা হয়েছিল। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, ব্রিটিশ আমলে তৈরি কোনো স্থাপনায় বালু ব্যবহারের নজির আছে কি?

প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের সূত্র মতে, ১৮৮৫ সালে জমিদার গোবিন্দ লাল সাহা এ বাড়ি তৈরি করেন। ৫ দশমিক ৮৮ একর জমির ওপর সাতটি বিশাল ভবনে রয়েছে ২০৯টি কক্ষ। সাতটি বাঁধানো ঘাটসহ একটি পুকুর। পুরো বাড়িটি সীমানাপ্রাচীর দিয়ে ঘেরা। বাড়ির সামনের অংশে দক্ষিণ দিকে রয়েছে প্রায় একই মাপের চারটি বিশাল ভবন। বাকি তিনটি পেছনের অংশে। দক্ষিণ দিক দিয়ে প্রবেশপথে রয়েছে চারটি সিংহ দরজা। স্থাপনাগুলোর আকর্ষণীয় দিকগুলো হচ্ছে সারিবদ্ধ বিশাল আকৃতির করিনথিয়ান থাম, লোহার বিম, ঢালাই লোহার পেঁচানো সিঁড়ি, রঙিন কাচের জানালা, কক্ষের ভেতরে বিশাল আকৃতির বেলজিয়াম আয়না, কারুকার্যখচিত দেয়াল, মেঝে ও ঝাড়বাতি।

১৯৮৭ সালে গেজেটের মাধ্যমে বাড়িটিকে প্রত্নতত্ত্ব সম্পদ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। পরে ২০০৮ সালে বাড়িটি হস্তান্তর করা হয় প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের কাছে। বর্তমানে এটি ওই বিভাগের আওতায় সুরক্ষিত ও সংরক্ষিত। সামনের চারটি ভবনের মধ্যে পশ্চিম দিক থেকে দ্বিতীয় ভবনের দোতলা জাদুঘর হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। এখানে সংগৃহীত বিভিন্ন প্রাচীন নিদর্শন প্রদর্শন করা হয়। বর্তমানে টিকিটের বিনিময়ে দর্শনার্থীদের জন্য বাড়িটি খুলে দেওয়া হয়েছে।

জমিদারবাড়ির তত্ত্বাবধায়ক সঞ্জয় বড়ুয়া সূত্রে জানা গেছে, ২০১২-১৩ অর্থবছরে ১০ লাখ টাকা ব্যয়ে দর্শনার্থীদের সুবিধার জন্য হাঁটাপথ ও টয়লেট নির্মাণ করা হয়। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে এক কোটি ১৫ লাখ টাকা ব্যয়ে আরো সংস্কারকাজ হয়। এর মধ্যে ২৫ লাখ টাকা ব্যয় হয় পুকুরের পাড় বাঁধাই ও সৌন্দর্যবর্ধনে। বাকি ৮৫ লাখ টাকা ব্যয় হয় ভবন সংস্কারে। এ বছর আরো ৮৫ লাখ টাকার সংস্কারকাজ চলছে বলে তিনি জানান। এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘সংস্কারকাজের দেখভাল করা আমার দায়িত্বে পড়ে না। বিষয়টি প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের প্রকৌশলী বিভাগের আওতায়। কাজ ভালোমন্দের বিষয়ে কিছু বলতে পারব না। ’

২০১৩-১৪ সালে এক কোটি ১৫ লাখ টাকা ব্যয়ে সংস্কারের সময় কালের কণ্ঠে সংস্কারকাজে ফাঁকিবাজি নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল। সে সময় ‘বালিয়াটির যত কথা’ নামে গবেষণাধর্মী বইয়ের লেখক অধ্যাপক সমরেন্দু সাহা অভিযোগ করেন, ‘প্রত্নসম্পদ যেভাবে সংস্কার করার নিয়ম সেভাবে কাজ হয়নি। ’ বালিয়াটি ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) সাবেক সদস্য মুক্তার আলী বলেন, ‘জমিদারবাড়িটি নির্মাণ করা হয়েছে ইট, চুন, সুরকি দিয়ে। অথচ এখন সংস্কার করা হচ্ছে বালু ও চুন দিয়ে। এর ওপরে আলগা রং দিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করা হচ্ছে আগের নির্মাণসামগ্রী দিয়েই সংস্কার করা হচ্ছে। ’ সাটুরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) হাসান মর্তুজা মামুন বলেন, ‘বিষয়টি প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের। উপজেলা প্রশাসনকে এ বিষয়ে কিছু জানানো হয় না। আমরা আগ বাড়িয়ে সেখানে যাই না। ’

সম্প্রতি বালিয়াটি জমিদারবাড়ির সংস্কারকাজ দেখার সময় প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের প্রকৌশলীকে পাওয়া যায়নি। কথা হয় প্রধান মিস্ত্রি আবদুস সাত্তারের সঙ্গে। তিনি জানান, প্রকৌশলী গোলাম সারোয়ারের নির্দেশে বালু ও চুন দিয়ে আস্তর করা হচ্ছে। এক ভাগ চুনের সঙ্গে এক ভাগ বালু মেশানো হচ্ছে। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শ্রমিক জানান, বালু বেশি দিয়ে চুন কম দেওয়া হচ্ছে। তাঁর কথার সত্যতাও পাওয়া গেল। দেখা গেল, বিশেষ এক ধরনের পাত্রে বালু ও চুন মেশানো হচ্ছে। চোখের দেখাতে বোঝা গেল, চুনের চেয়ে বালুর পরিমাণ অনেক বেশি।

প্রধান মিস্ত্রি আবদুস সাত্তারকে প্রশ্ন করা হলো, নিয়ম হচ্ছে চুন, সুরকি দিয়ে আস্তর করা। চুন, বালু দিয়ে কেন করা হচ্ছে? তিনি বলেন, ‘আমিও জাানি চুন, সুরকি দিয়ে আস্তর করতে হয়। কিন্তু প্রকৌশলী আমাকে যে নির্দেশ দিয়েছেন, সেভাবে কাজ করছি। ’ তিনি জানান, চুন-বালুর আস্তর দেওয়ার পর হাতে বানানো রং দেওয়া হয়। রং বানানো হয় এলামাটি, সুরকি ও সিমেন্ট দিয়ে। চুন, বালুর আস্তরের ওপর এই রং লাগালে ভবনের রং হয়ে উঠবে আগের মতো।

প্রকৌশলী গোলাম সারোয়ার বলেন, ‘কোনো ঠিকাদারের মাধ্যমে না, প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের প্রকৌশল শাখা সংস্কারের কাজ করছে। মিস্ত্রিদের মাস্টাররোলে মজুরি দেওয়া হয়। এর পরিমাণ প্রতিদিন ৪০০ থেকে ৬০০ টাকা। আগে চুন, সুরকি দিয়ে আস্তর করা হতো। বর্তমানে চুন, বালু দিয়ে আস্তরের নিয়ম হয়েছে। সংস্কারকাজে কোনো অনিয়ম হচ্ছে না। ’

প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের আঞ্চলিক পরিচালক (ঢাকা বিভাগ) রাখী রায় বলেন, ‘পরীক্ষা করে দেখা গেছে, ভবনটি নির্মাণে চুন, বালু ব্যবহার করা হয়েছে। কালের পরিক্রমায় ভবনটি লালচে আকার ধারণ করেছে। তাই মানুষের মধ্যে চুন, সুরকির ভ্রান্ত ধারণা ছিল। পরীক্ষার পর নিশ্চিত হয়েই এখন চুন, বালু ব্যবহার করা হচ্ছে। ’

 


মন্তব্য