kalerkantho


অদ্ভুত নিরাপত্তাপ্রাচীর!

বগুড়া রেলওয়ে স্টেশন

লিমন বাসার, বগুড়া   

১৮ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



অদ্ভুত নিরাপত্তাপ্রাচীর!

বগুড়া রেলওয়ে স্টেশনে হঠাৎ করেই নিরাপত্তার অজুহাতে সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ করা হচ্ছে। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হলো রেলের জমির একাংশ বাদ দিয়েই প্রাচীর তুলছে কর্তৃপক্ষ। ছবিটি গতকাল তোলা। ছবি : কালের কণ্ঠ

বগুড়া রেলওয়ে স্টেশনের উত্তর প্রান্তে হঠাৎ করেই দেওয়া হচ্ছে অদ্ভুত এক নিরাপত্তাপ্রাচীর। রেললাইনের ভেতর দিয়ে তৈরি করা এই প্রাচীর নির্মাণ করছে খোদ রেল বিভাগ।

তবে নিরাপত্তার ছুতায় প্রাচীর তৈরির নামে রেলের দামি জায়গা দখলদারদের হাতে ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ইতিমধ্যে প্রায় দেড় কিলোমিটার এলাকাজুড়ে শত কোটি টাকার রেলের জায়গা দখলবাজির প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে। সরেজমিন অনুসন্ধান করে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

স্থানীয় লোকজন জানায়, স্টেশনের সীমানার মধ্যে কয়েকটি রেললাইন ছেড়ে দিয়ে যে প্রাচীর তোলা হচ্ছে তা দেখে সহজেই অনুমান করা যায় কোনো প্রভাবশালীর স্বার্থে এই কাজ করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে বগুড়া রেলস্টেশনের আশপাশের অনেকটা জায়গা দখল হয়ে গেছে। রেলের পুকুর ভরাট করেও চলছে দখলবাজি। এত কিছু জানার পরও কেন এভাবে প্রাচীর তোলা হচ্ছে তার কোনো সদুত্তর নেই। রেল কর্তৃপক্ষ অবশ্য বলছে, বিনা টিকিটে রেলভ্রমণ রোধ এবং স্টেশন নিরাপত্তায় এই প্রাচীর দেওয়া হয়েছে।

রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, বগুড়া রেলস্টেশনের সামনে হাড্ডিপট্টি বাস টার্মিনাল, কামারগাড়ী পুকুরপাড় তিনমাথা থেকে হকার্স মার্কেট-সংলগ্ন কড়ইতলা পর্যন্ত এক হাজার ৯০০ ফুট এবং আবাসিক এলাকার সেউজগাড়ী পানির ট্যাংক-সংলগ্ন এলাকায় এক হাজার ৫৮২ ফুট দৈর্ঘ্যের সীমানপ্রাচীর নির্মাণের কাজ চলছে।

এতে ব্যয় হচ্ছে ৬৯ লাখ টাকা। মাসখানেক ধরে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের লোকজন এই দুটি সীমানাপ্রাচীর নির্মাণের কাজ করছে। ইতিমধ্যেই সীমানাপ্রাচীর নির্মাণের কাজ শেষ পর্যায়ে। স্টেশনের নিরাপত্তায় এই সীমানাপ্রাচীর নির্মাণের কথা বলা হলেও শুরু থেকেই রেলওয়ের এই উদ্যোগ প্রশ্নের মুখে পড়েছে। কেউ কেউ এই প্রাচীর নির্মাণের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।

স্থানীয় লোকজনসহ রেল বিভাগের একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী বলেন, পাশাপাশি দুটি রেললাইন মালামাল খালাসের জন্য ব্যবহৃত ওয়াগন টানার কাজে ব্যবহার করা হতো। এই লাইন দুটি ছাড়াও রেলস্টেশনের সামনেই মিনিবাস টার্মিনাল। অনেকেই বিভিন্ন উপজেলা থেকে বাসে এসে স্টেশনে ট্রেন ধরে। ট্রেনযাত্রীদের বড় একটি অংশ চামড়া গুদাম-বাদুরতলা সড়ক, থানা মোড়-কামারগাড়ী সরকারি আযিযুল হক কলেজ সড়ক, নূরানী মোড়-কামারগাড়ী সড়ক হয়ে স্টেশনে যাতায়াত করে। সরকারি আযিযুল হক কলেজের শিক্ষার্থীরাও সামনের এই সড়ক হয়ে স্টেশনে আসা-যাওয়া করে। অথচ বাস টার্মিনাল ও সড়কে যাতায়াত পথ বন্ধ করে স্টেশনের সামনে সীমানাপ্রাচীর তোলা হচ্ছে। এই প্রাচীরের ফলে এখন উত্তর পাশজুড়ে শত কোটি টাকার জায়গা বেহাত হয়ে দোকান নির্মাণ করা হবে। কারণ এর আগেই একই রকমের ঘটনা ঘটেছে শহরের রেলগেট ও হকার্স মাকেট এলাকায়। সেখানকার সব জায়গা এখন প্রভাবশালীদের দখলে।

বগুড়া রেল বিভাগের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, স্টেশনের সুরক্ষার কথা বলে সীমানাপ্রাচীর তোলা হলেও প্রাচীরের বাইরে অরক্ষিত রাখা হয়েছে স্টেশনে ট্রেন ভেড়ানোর জন্য নির্মিত দুটি সচল রেললাইন। ১ নম্বর রেলগেট-কামারগাড়ী পর্যন্ত প্রশস্ত সড়ক থাকলেও সড়ক ঘেঁষে সীমানাপ্রাচীর না তুলে বেশ কিছু জায়গা প্রাচীরের বাইরে ফেলে রাখা হয়েছে। তাঁর আশঙ্কা, পুরো প্রাচীর নির্মাণ করা হলে সচল এই দুটি লাইন কার্যত অচল হবে। কারণ প্রাচীর টপকে ট্রেন ভিড়তে পারবে না লাইনে। আবার আড়ালে পড়ার কারণে চুরি হয়ে যাবে রেললাইন।

বগুড়া রেলস্টেশন থেকে পূর্ব দিকে রেললাইন ধরে তাকালে দেখা যাবে করতোয়া রেল ব্রিজ পর্যন্ত রেললাইনের দুই ধারে দখল হয়ে গেছে। সামান্য ভূমি লিজ নেওয়া হয়। লিজের একটি কাগজ দেখিয়ে দখলের উৎসব চলে। দুর্ঘটনা এড়াতে, নিরাপত্তা রক্ষায় এবং নিরবচ্ছিন্ন রেলগাড়ি চলাচলে রেললাইনের দুই ধারে অন্তত ৪০ ফুট করে ফাঁকা জায়গা রাখার সরকারি নিয়ম থাকলেও তা মানা হয়নি।

রেল বিভাগের নথিপত্র পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, গত তিন বছরে শহরের একাধিক স্থানে রেলের এমন শত কোটি টাকার জমি দখলের পাশাপাশি হাতবদলও হয়েছে। দখল হয়ে যাওয়া জমির কোনোটাই রেল বিভাগ পরবর্তী সময়ে উদ্ধার করতে পারেনি। উদ্ধারপ্রক্রিয়া চালাতে গেলেই রেলের কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি দেখানো হয় বলে অভিযোগ করেন তাঁরা।

জানা যায়, ১৯৯৭ সাল থেকে রেলে বাণিজ্যিক লিজপ্রক্রিয়া বন্ধ রয়েছে। এখন ব্যক্তিগত প্রয়োজনে লিজপ্রক্রিয়া চালু থাকলেও যথাযথ দরপত্রের মাধ্যমে প্রক্রিয়াটিতে অংশ নিতে হয়। কিন্তু ব্যক্তিগত পর্যায়ে চালুর সময় কী করে বাণিজ্যিক ব্যবহারের জন্য একের পর এক জমি লিজ দেওয়া হচ্ছে, এর কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি বগুড়ার রেলের কানুনগো মোকাররম হোসেন।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বর্তমানে বগুড়া শহরে রেলের প্রায় ২০ একর জমি দখলদারদের কবজায়। বর্তমান বাজারমূল্যে এসব জমির দাম ১০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে। রেলের লালমনিরহাট জোন এস্টেট অফিস সূত্রে জানা গেছে, তাদের যেসব জমি এখন বেদখলে রয়েছে এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো শহরের জামিলনগর এলাকায় ৭ দশমিক ৪৮ একর, নূরানী মোড় এলাকায় ৬ দশমিক ২৫ একর, চেলোপাড়া এলাকায় ২ দশমিক ২৩ একর এবং পুরনো বাস টার্মিনাল এলাকায় প্রায় এক একর জমি। এ ছাড়া সেউজগাড়ী এলাকার চারপাশে রেললাইন ঘেঁষে এবং রেলস্টেশন থেকে চেলোপাড়া ব্রিজ পর্যন্ত রেললাইনের দুই পাশের আরো অনেক জমি দখল করে সেখানে স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে। সর্বশেষ শহরের বাদুরতলা হকার্স মার্কেট এলাকায় রেললাইনের বিপজ্জনক জোনে জায়গা লিজ নিয়ে ৭০টি দোকান নির্মাণ করা হয়েছে। এই স্থানের ২০ ফুট দূরত্বে রেলের ডেঞ্জার জোন নির্ধারণ করা থাকলেও সেটা সরিয়ে ফেলে দোকান নির্মাণের কারণে রেল চলাচলও পড়েছে ঝুঁকির মধ্যে।

রেলের লালমনিরহাট জোনের বিভাগীয় আইন পরিদর্শক শফিকুল ইসলামের কাছে প্রশ্ন করা হয়েছিল কেন রেললাইন ও জায়গা বাদ রেখে নিরাপত্তাপ্রাচীর দেওয়া হচ্ছে। তিনি এ ব্যাপারে কোনো কথা বলতে চাননি।

শহরের সাতমাথা এলাকার ব্যবসায়ী আব্দুর রাজ্জাক বলেন, স্টেশনের নিরাপত্তা একটা অজুহাত মাত্র। প্রাচীর নির্মাণের নেপথ্যে চলছে রেলের কোটি টাকার সম্পত্তি প্রভাবশালীদের হাতে তুলে দেওয়ার চক্রান্ত। প্রাচীর নির্মাণের প্রয়োজন হলে সব কটি রেললাইন ভেতরে রেখে এবং সড়ক ঘেঁষে তা নির্মাণ করা যেত। রেললাইন বা জায়গা সীমানার বাইরে রাখার প্রয়োজন হতো না। এই জায়গার পরিণতিও অন্যান্য জায়াগার মতোই হবে।

বগুড়া রেলওয়ের স্টেশনমাস্টার নজরুল ইসলাম বলেন, প্রাচীরের বাইরে রাখা রেললাইনে মালবাহী ট্রেন এসে ভিড়বে। রেললাইন ভেতরে রাখা হলে পণ্য খালাসের ট্রাক ভিড়তে পারত না। তবে কিছু জায়গা কেন প্রাচীরের বাইরে রাখা হলো, তা প্রকৌশল শাখার বিষয়।

রেলওয়ে প্রকৌশল বিভাগের বগুড়ার সহকারী প্রকৌশলী আবদুস সোবহান বলেন, বিনা টিকিটে রেলভ্রমণ ঠেকাতে এবং স্টেশনের নিরাপত্তায় সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ করা হচ্ছে। কারিগরি দিক বিবেচনা করেই রেললাইন ও কিছু জায়গা প্রাচীরের বাইরে রাখা হয়েছে। এখানে দখল কিংবা কাউকে সহযোগিতার বিষয়টি ঠিক নয়।


মন্তব্য