kalerkantho


ভোট ‘নিয়ন্ত্রক’ মহাজন

স্বপন চৌধুরী, রংপুর   

১৮ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



ভোট ‘নিয়ন্ত্রক’ মহাজন

ভোট এলে মহাজনের কথায় ওঠাবসা শুরু। তিনি যাঁকে ভোট দিতে বলবেন, তাঁকেই দিতে হবে।

প্রার্থীরা ভোটের অঙ্ক কষতে ভোটারের চেয়ে মহাজনের পেছনে সময় ব্যয় করেন বেশি। বিড়ির কারখানার এই মহাজনদের সমর্থনের ওপর নির্ভর করছে রংপুরের কাউনিয়া উপজেলার হারাগাছ পৌর নির্বাচনের জয়-পরাজয়।

এখানে আগামী ২০ মার্চ দলীয় প্রতীকে প্রথমবারের মতো পৌর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। গত ৫ মার্চ প্রতীক বরাদ্দের পরপর প্রার্থীরা মাঠে প্রচারণা চালাচ্ছেন। রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা অতীতের মনোমালিন্য ভুলে প্রার্থীদের সঙ্গে কাজ করছেন। সব মিলে বিড়ি কারখানার জন্য পরিচিত এ পৌরসভার নির্বাচন শেষ সময়ে জমে উঠেছে।

মেয়র পদে চারজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তাঁরা হলেন আওয়ামী লীগের হাকিবুর রহমান মাস্টার, বিএনপির মোনায়েম হোসেন ফারুক, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের জাহিদ হোসেন এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী সাদাকাত হোসেন ঝন্টু।

নির্বাচনী এলাকা ঘুরে স্থানীয় ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আগে থেকে এখানে বিড়ি মহাজনকেন্দ্রিক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে।

বিড়ি কারখানার মালিকদের সমর্থনের ওপর সাধারণ ভোটাররা অনেকটা নির্ভর করে। এ ছাড়া টাকার ছড়াছড়ি তো আছেই।

জেলা নির্বাচন কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, হারাগাছ পৌরসভায় মোট ভোটার ৪৬ হাজার ২০৫ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ২২ হাজার ২৮৭ এবং নারী ভোটার রয়েছেন ২৩ হাজার ৯১৮ জন। এসব ভোটারের বেশির ভাগ বিড়ি শ্রমিক। যারা নারী-পুরুষ নির্বিশেষে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কোনো না কোনো বিড়ি কারখানার সঙ্গে জড়িত। ভোটের সময় সেই সুযোগটিই কাজে লাগায় মালিকপক্ষ।

বর্তমানে ভোটারদের মাঝে তিন প্রার্থীকে নিয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে। বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য (এমপি) রহিম উদ্দিন ভরসা এবং জাপার সাবেক এমপি করিম উদ্দিন ভরসার ভাগিনা মোনায়েম হোসেন ফারুক ধানের শীষ নিয়ে শক্ত অবস্থানে রয়েছেন। পাশাপাশি বর্তমান এমপি টিপু মুনশির সমর্থনপ্রাপ্ত আওয়ামী লীগের হাকিবুর রহমান মাস্টার নৌকা প্রতীক নিয়ে আলোচনায় রয়েছেন। দীর্ঘদিন শিক্ষকতা পেশায় নিয়োজিত থাকায় তাঁরও জনপ্রিয়তা রয়েছে। অন্যদিকে বর্তমান মেয়র সাদাকাত হোসেন ঝন্টু মোবাইল প্রতীক নিয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। গত মেয়াদে এলাকার সার্বিক উন্নয়নের বার্তা নিয়ে তিনি ছুটছেন ভোটারের দ্বারে দ্বারে। মূলত এই তিন হেভিওয়েট প্রার্থীর মধ্যে লড়াই হবে বলে মনে করছে সাধারণ ভোটাররা।

পৌর এলাকার বাসিন্দা জুবায়ের আলম বলেন, ‘ভোটের সমীকরণে ঝন্টুর একটা রিজার্ভ ভোট আছে। দীর্ঘদিন মেয়র থাকায় তিনি অনেক উন্নয়ন করেছেন। কিন্তু দলীয় প্রতীকে ভোট হওয়ায় তিনি শেষ পর্যন্ত বেকায়দায় পড়তে পারেন। ’

ভোটার আবদুল হক বলেন, ‘হারাগাছে ভরসা পরিবারের একটা ঐতিহ্য রয়েছে। বিএনপির রিজার্ভ ভোটও আছে। তা ছাড়া জাপার কোনো প্রার্থী নেই। এ কারণে মোনায়েম হোসেন ফারুক এগিয়ে আছেন। ’

স্থানীয় ভোটাররা জানায়, হারাগাছে ভোটের হাওয়া বদলে যায় ভোটের আগের দিন ও ভোটের রাতে। শেষ পর্যন্ত কার গলায় বিজয়ের মালা উঠবে তা নিশ্চিত করে বলা না গেলেও তিন প্রার্থীর মধ্যে লড়াইটা হবে বলে মনে করেন তারা।

জাতীয় পার্টি ফ্যাক্টর সমঝোতা না হওয়ায় এ নির্বাচনে জাতীয় পার্টি প্রার্থী দিতে পারেনি। তবে জাতীয় পার্টি যাঁকে সমর্থন দেবে তিনিই হবেন মেয়র, এমনটি ভাবছে বেশির ভাগ ভোটার। তবে তারা আলোচিত তিন প্রার্থীর কাকে সমর্থন দেবে সেটা এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র।

জাপার স্থানীয় একটি সূত্র জানায়, উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে কয়েক দফা বৈঠক হয়েছে। নেতাকর্মীরা কোন প্রার্থীর পক্ষে কাজ করবেন, তা নিয়ে এখনো মতবিরোধ রয়েছে। কেউ মহাজোটের শরিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগের প্রার্থীর সঙ্গে কাজ করার কথা ভাবছেন। আবার কেউ কেউ এর বিরোধিতা করছেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে জাপার স্থানীয় এক নেতা বলেন, ‘আওয়ামী লীগ ও বিএনপি দুই দলই সমর্থন চাইছে। সেই সঙ্গে স্বতন্ত্র প্রার্থী বর্তমান মেয়রের পক্ষেও মতামত আসছে। তবে কোনো প্রার্থীর পক্ষে দলীয়ভাবে সমর্থন ঘোষণা দেওয়া হলে দলের মধ্যে বিরোধ আরো চাঙা হয়ে ওঠার আশঙ্কা রয়েছে। ’

হারাগাছ পৌর জাতীয় পার্টির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সেরেকুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা দলীয়ভাবে বারবার বৈঠক করছি। কিন্তু কোনো সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারিনি। ’ পৌর জাতীয় পার্টির সভাপতি নাজির হোসেন বলেন, ‘কোনো মন্তব্য করা সম্ভব নয়। ’

আওয়ামী লীগের প্রার্থী হাকিবুর রহমান মাস্টার বলেন, ‘মহাজোটের শরিক দল হিসেবে আশা করি জাতীয় পার্টি আমার পক্ষে থাকবে। ’

বিএনপির প্রার্থী মোনায়েম হোসেন ফারুক বলেন, ‘ভরসা পরিবারের ভাগিনা হিসেবে দলমত নির্বিশেষে সবার ভোট পাব। ’

স্বতন্ত্র প্রার্থী ও বর্তমান মেয়র সাদাকাত হোসেন ঝন্টু বলেন, ‘আমি একসময় জাতীয় পার্টি করতাম। তাই হাল ছাড়িনি। আশা করি জাপার সমর্থন আমার পক্ষে থাকবে। মেয়র থাকাকালে এলাকার ব্যাপক উন্নয়ন করেছি। এবারই প্রথম দলীয়ভাবে নির্বাচন হলেও আমি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করছি। পিছিয়ে পড়া এই এলাকার মানুষ দল নয়, কাজে বিশ্বাস করে। ’

জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা জি এম মাহাতাব উদ্দিন বলেন, ‘মোট ২০টি  কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ হবে। হারাগাছে বিগত নির্বাচনে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি, এবারও হবে না। সুষ্ঠু ও অবাধ হবে। ’


মন্তব্য