kalerkantho

পায়ে পায়ে অনিয়ম

নাসরুল আনোয়ার, হাওরাঞ্চল   

১৭ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



পায়ে পায়ে অনিয়ম

কিশোরগঞ্জে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগের (এলজিইডি) সড়ক উন্নয়ন কাজে ব্যাপক দুর্নীতি-অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। কাজের তদারকির দায়িত্বে থাকা উপসহকারী প্রকৌশলী যথাযথ দায়িত্ব পালন করছেন না বলে অভিযোগ রয়েছে।

আর এ সুযোগ নিচ্ছে ঠিকাদাররা।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে বাজিতপুর চৌকি আদালত মোড় থেকে কুলিয়ারচরের আগরপুর বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত ১১ কিলোমিটার সড়ক পুনর্নির্মাণ কাজের মান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ১১ কিলোমিটারের মধ্যে ৫ দশমিক ৯৫ কিলোমিটার বাজিতপুর অংশে পড়েছে। বাকিটা পড়েছে কুলিয়ারচরে। বাজিতপুর অংশে চার কোটি ১০ লাখ ও কুলিয়ারচর অংশে প্রায় সাড়ে তিন কোটি মিলিয়ে মোট সাড়ে সাত কোটির বেশি টাকার কাজের মধ্যে দশমিক ৭২৮ কিলোমিটার আরসিসি ও বাকিটা হচ্ছে কার্পেটিং।

এলজিইডি সূত্র মতে, বাজিতপুর পৌরসভার সামনে থেকে বাজার হয়ে পাউবো অফিস পর্যন্ত আরসিসি রাস্তাটির পুরুত্ব আট ইঞ্চি হওয়ার কথা। সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, অনেক জায়গায় আট ইঞ্চির স্থলে ছয়-সাত ইঞ্চি ঢালাই করা হচ্ছে। গত ২২ ফেব্রুয়ারি এ সড়কের কলেজ রোড মোড় থেকে পশু হাসপাতালের রাস্তা ঢালাইয়ের সময় নিম্নমানের কাজের অভিযোগ পেয়ে উপজেলা প্রকৌশলী মাজেদুল হক সজীব ঘটনাস্থলে আসেন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, তিনি ঢালাই করা রাস্তার পুরুত্ব কম পেয়ে তার ওপর আবার ঢালাই দিয়ে পুরুত্ব নিশ্চিত করেন।

প্রকৌশল অফিস সূত্র মতে, নিয়ম অনুযায়ী কাজ চলাকালীন সাইটে এলজিইডির একজন উপসহকারী প্রকৌশলীর সার্বক্ষণিক কাজের মান তদারক করার কথা। কিন্তু এ ক্ষেত্রে তা না হওয়ায় কাজের মান নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।

এলাকাবাসী জানায়, কাজ তদারকির দায়িত্বে থাকা উপসহকারী প্রকৌশলী মফিজউদ্দিন আহমেদ নিয়মিত সাইটে যান না। মাঝেমধ্যে গেলেও ঢালাইয়ের কাছ থেকে দূরে থাকেন। কাজের মান নিয়ে কখনো কোনো কথা বলেন না। যে কারণে তাঁর সততা ও কর্তব্যনিষ্ঠা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এ ক্ষেত্রে মফিজউদ্দিনকে সরিয়ে অন্য কাউকে এ দায়িত্বে দেওয়ারও দাবি উঠেছে। উল্লেখ্য, এর আগে ঢাকা জেলা পরিষদে কর্মরত থাকাকালীন তাঁর বিরুদ্ধে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। পরে তাঁকে বাজিতপুরে বদলি করা হয়। এক প্রশ্নের উত্তরে মফিজউদ্দিন দাবি করেন, তিনি কোনো অনিয়ম করছেন না। গত ২২ ফেব্রুয়ারি তাঁর বিরুদ্ধে অনিয়মের প্রমাণ পাওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করলে তিনি নিরুত্তর থাকেন।

সরারচর বাজার থেকে বাংলাবাজার পর্যন্ত পৌনে এক কিলোমিটার রাস্তার কাজও হচ্ছে নিম্নমানের। এ রাস্তায় বরাদ্দ টাকা প্রায় ৩৮ লাখ। এলাকায় গিয়ে জানা গেছে, প্রথম শ্রেণির খোয়া (সুরকি) দিয়ে রাস্তার ভিত্তি করার কথা থাকলেও ঠিকাদার নিম্নমানের খোয়া দিয়ে ওই কাজ করছেন। স্থানীয়রা জানায়, কয়েকজন গ্রাম্য মাস্তান ঠিকাদারকে সাহস জোগাচ্ছে। তাই এ কাজের তদারকির দায়িত্বে থাকা এলজিইডির সার্ভেয়ার মোখলেছুর রহমান বাধা দিয়েও নিম্নমানের খোয়া ঠেকাতে পারেননি। ঘটনাটি এলাকাবাসী নির্বাহী প্রকৌশলীকে জানানোর পর তাঁর নির্দেশে ঠিকাদার নিম্নমানের খোয়া সরাতে বাধ্য হন।

সূত্র মতে, গাজিরচর ইউনিয়ন সদর থেকে আখড়া হয়ে বলিয়ারদী পর্যন্ত প্রায় চার কিলোমিটার রাস্তার কাজেও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। এ রাস্তার জন্য বিশ্বব্যাংক প্রায় তিন কোটি ৩৯ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়। বর্তমানে রাস্তার মাটি ভরাটের কাজ শেষে বালি ফেলা হচ্ছে। এলজিইডি সূত্র জানায়, মাটি ভরাটের জন্য আগেই দুই পাশের গাছপালা ও খুঁটিতে লাল দাগ দিয়ে উচ্চতা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়। কিন্তু এক-দেড় ফুট বাকি থাকতেই মাটির কাজ শেষ করে ফেলা হয়। প্রয়োজনীয় উচ্চতা নিশ্চিত না করে রাস্তার দুই পাশ থেকে কিছু মাটি তুলে ঢালে দেওয়া হয়। এ ছাড়া আগের রাস্তা খোদাই করে ওই মাটিই রাস্তার দুই ধারে ফেলা হয়েছে। প্রসঙ্গত, এ কাজের তদারকির দায়িত্বেও রয়েছেন উপসহকারী প্রকৌশলী মফিজউদ্দিন।

ঘাগটিয়া গ্রামের গৃহবধূ রোকেয়া আক্তার জানান, ‘রাস্তার মাডি কুইদ্যাঅই (খোদাই করে) কিনারো ফালছে। ’ একই তথ্য মেলে দিনমজুর ফরিদ মিয়াসহ স্থানীয়দের কথায়। এলাকার প্রবীণ মো. ইউসুফ মিয়া বলেন, ‘মাটি ফেলার শুরুতেই এত অনিয়ম, মূল কাজে কতটা দুর্নীতি হবে তা তো বোঝাই যায়। ’ ঘাগটিয়া গ্রামের বাসিন্দা উপজেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি শাহজাহান কবির বলেন, ‘কত যুগ পর গ্রামের ভেতর দিয়ে রাস্তা যাচ্ছে। এমন নিম্নমানের কাজে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হবে। ’

বাজিতপুর উপজেলা প্রকৌশলী মাজেদুল হক সজীব জানান, সড়ক দুর্ঘটনায় পা ভেঙে তিন মাস ধরে তিনি বিছানায়। এ কারণে ঠিকমতো কাজের তদারকি করতে না পারলেও কাজের মান বজায় রাখার চেষ্টা করছেন। উপসহকারী প্রকৌশলীর উপস্থিতিতেই অনিয়মের ঘটনার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি জানান, আরসিসি কাজে অনিয়মের খবর পেয়ে তিনি সাইটে গিয়ে এর প্রমাণ পান। পরে দাঁড়িয়ে থেকে নতুন করে ঢালাই করিয়ে রাস্তার পুরুত্ব ঠিক করেন। নির্বাহী প্রকৌশলীর সঙ্গে কথা বলে দায়িত্বে অবহেলার বিষয়ে উপসহকারী প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে জানিয়ে তিনি বলেন, কাজের মান অবশ্যই নিশ্চিত করা হবে।

এলজিইডি কিশোরগঞ্জের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. গোলাম মওলা জানান, এলজিইডির সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীরা দায়িত্ব পালন করছেন। এ ছাড়া বিশেষ করে ১১ কিলোমিটার রাস্তার কাজে বিশ্বব্যাংকের কনসালট্যান্টরাও নিয়মিত তদারক করছেন। তাই কাজের মান খারাপ হওয়ার সুযোগ নেই। এর পরও কাজ খারাপ হচ্ছে কিভাবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীর সঙ্গে কথা বলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


মন্তব্য