kalerkantho

সোমবার। ২৩ জানুয়ারি ২০১৭ । ১০ মাঘ ১৪২৩। ২৪ রবিউস সানি ১৪৩৮।


টেকনাফে ভোটের মাঠে ইয়াবা পাচারকারীরা

নারীকে নাকফুল উপহার পুরুষকে চালের বস্তা

নিজস্ব প্রতিবেদক, কক্সবাজার   

১৬ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



কক্সবাজারের টেকনাফ সীমান্তে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে এবার ইয়াবা ব্যবসায়ীরাও প্রার্থী হয়েছেন। এত দিন যাঁরা ইয়াবা ব্যবসা করে কোটি কোটি টাকা কামিয়েছেন, সেই টাকা দিয়ে তাঁরা এবার মানুষের মন জয় করার চেষ্টায় নেমেছেন। এ ক্ষেত্রে ভোটারদের টাকা দেওয়ার পাশাপাশি পুরুষ ভোটারকে চালের বস্তা ও নারীকে সোনার নাকফুল বা নথ উপহার দেওয়া হচ্ছে বলে খবর পাওয়া গেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, আগামী ২২ মার্চ কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার ছয়টি, মহেশখালী দ্বীপের সাতটি ও কুতুবদিয়া দ্বীপের ছয়টি ইউনিয়ন পরিষদে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। জেলার এ ১৯টি ইউনিয়নের মধ্যে বেশি আলোচনা হচ্ছে টেকনাফ সীমান্তের ইউনিয়নগুলোর নির্বাচন নিয়ে। অভিযোগ উঠেছে, সীমান্তের এসব ইউনিয়নে নির্বাচনে যেকোনো উপায়ে জেতার জন্য মরিয়া হয়ে পড়েছেন তালিকাভুক্ত ইয়াবা ব্যবসায়ী, চোরাচালানি, চিহ্নিত মানবপাচারকারী ও কালো টাকার মালিকরা।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, নাফ নদীর তীরবর্তী হ্নীলা ইউনিয়নের কেবল দুটি ওয়ার্ডেই ১০ জন ‘টাকাপতি’ মেম্বার পদে নির্বাচন করছেন। এর মধ্যে অন্তত পাঁচজন কোটিপতি। তাঁদের সবার বিরুদ্ধে ইয়াবা পাচারের অভিযোগ রয়েছে। অপর পাঁচজন কোটিপতি না হলেও কাছাকাছি বলে আলোচনা রয়েছে। এ ইউনিয়নের ৭ ও ৮ নম্বর ওয়ার্ডের নির্বাচনের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন রকম। ৮ নম্বর ওয়ার্ডের মেম্বার পদপ্রার্থী লেদা গ্রামের বাসিন্দা নুরুল হুদা হচ্ছেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকাভুক্ত শীর্ষস্থানীয় ইয়াবা ব্যবসায়ী।

টেকনাফ থানার ওসি আবদুল মজিদ বলেন, ১২টি ইয়াবা পাচারের মামলা মাথায় নিয়ে নির্বাচনী প্রচারণায় রয়েছেন মেম্বার প্রার্থী নুরুল হুদা। গত ১১ মার্চ মধ্যরাতে নিজ ঘরে বসে নির্বাচনী সভা করার সময় টেকনাফ থানা পুলিশ তাঁকে আটক করে। পরক্ষণেই তাঁর ইয়াবা সিন্ডিকেট সদস্যরা পুলিশের একজন উপপরিদর্শকসহ ছয়জনকে মারধর করে হাতকড়াসহ মেম্বার প্রার্থী ইয়াবা ব্যবসায়ী নুরুল হুদাকে ছিনিয়ে নেয়। তাঁর বিরুদ্ধে মামলা হওয়ায় তিনি এখন গা ঢাকা দিয়েছেন। তবে এলাকার লোকজনের দাবি, তিনি গা ঢাকা দিলেও ইয়াবা সিন্ডিকেট সদস্যরা চালের বস্তা ভোটারদের কাছে পৌঁছে দিচ্ছেন। আবার নির্বাচনে জয়লাভ নিশ্চিত করতে একই পদে তিনি তাঁর সহধর্মিণী কামরুন নাহারকে ডামি প্রার্থী করেছেন।

সেই সঙ্গে সীমান্ত এলাকার নারীদের কাছে ইয়াবা পাচারকারী নুরুল হুদাসহ অন্যদের নারী কর্মীরা গোপনে সোনার নাকফুল পৌঁছে দিচ্ছেন। নুরুল হুদা পলাতক থাকায় এ ব্যাপারে তাঁর বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি। এ প্রসঙ্গে হ্নীলা ইউনিয়নের সংরক্ষিত নারী সদস্য পদপ্রার্থী মর্জিনা আকতার মদীনা বলেন, ‘চালের বস্তা ও নাকফুল নিয়ে ভোটের জন্য নেমেছেন ইয়াবা পাচারকারীরা। তবে তাঁদের নাম বলতে চাই না। ’ তিনি আরো বলেন, ‘আমরা এসব বাজে কাজে নেই। ভোটের জন্য আমার পুঁজি কেবল দুই ফোঁটা চোখের জল আর একটু মিষ্টি হাসি। ’

এদিকে হ্নীলা ৭ নম্বর ওয়ার্ডে জামাল হোসেন প্রকাশ ইয়াবা জামাল নামের একজন তালিকাভুক্ত ইয়াবা পাচারকারী মেম্বার পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। গত রবিবার ইয়াবা জামাল তাঁর সাঙ্গপাঙ্গ নিয়ে তাঁরই প্রতিদ্বন্দ্বী দিদারুল ইসলাম জিন্নাহকে বেধড়ক পিটুনি দেয়। দিদারুল ইসলাম জিন্নাহ জানান, ইয়াবা জামাল মেম্বার পদে তাঁর স্ত্রী খুরশিদা বেগম ও সন্তান শাহনেওয়াজকে ডামি প্রার্থী করেছেন। তিনি অভিযোগ করেন, ভোটারদের প্রলুব্ধ করে ভোট আদায়ের জন্য এরাই চালের বস্তা, নাকফুল ও কাপড়চোপড় নিয়ে ঘরে ঘরে যাচ্ছেন। তবে জামাল হোসেন পলাতক থাকায় এ বিষয়ে তাঁর বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।

এ প্রসঙ্গে টেকনাফ উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সাবেক দলীয় এমপি অধ্যাপক মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘এখানে বর্তমানে নির্বাচনী আচরণবিধি বলতে কিছু নেই। ইয়াবা ও মানবপাচারকারীর দল নির্বাচনে প্রার্থী হয়ে কে কার চেয়ে বেশি টাকা খরচ করতে পারে, সেই প্রতিযোগিতায় নেমেছে। এসব দেখলে ও শুনলে লজ্জা পাই। ’ তিনি আরো বলেন, ভোটের জন্য কালো টাকা নিয়ে সাংঘাতিক খারাপ অবস্থা চলছে। এমনকি ইয়াবা ব্যবসায়ীরা ভোট নিতে চালের বস্তা ও নারীদের জন্য নাকফুল নিয়েও নেমেছে। আল্লাহই জানেন আগামী ২২ মার্চ নির্বাচনের দিন কী হয়। ’

এ ব্যাপারে জেলা নির্বাচন কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাঁকে পাওয়া যায়নি। তবে টেকনাফ উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা (ভারপ্রাপ্ত) কর্মকর্তা এবং টেকনাফের হ্নীলা ও হোয়াইক্যং ইউনিয়নে নির্বাচনের রিটার্নিং অফিসার নুরুল আবছার বলেন, ‘নির্বাচনী আচরণবিধি ভঙ্গের কোনো লিখিত অভিযোগ নিয়ে আমার কাছে কেউ আসেনি। এ রকম অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ’


মন্তব্য