kalerkantho

26th march banner

আ. লীগের প্রার্থী বাছাইয়ে অর্থ ও স্বজনপ্রীতি

নীলফামারী প্রতিনিধি   

১৬ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



আ. লীগের প্রার্থী বাছাইয়ে অর্থ ও স্বজনপ্রীতি

নীলফামারীর ডোমার উপজেলায় চতুর্থ দফায় ১০টি ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনে তৃণমূলে আওয়ামী লীগের চেয়ারম্যান প্রার্থী মনোনয়নে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। তৃণমূলের মতামত গ্রহণ না করে অর্থ ও স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে কয়েকটি ইউনিয়নে প্রার্থী বাছাই করা হয়েছে। গত সোমবার সরেজমিনে চেয়ারম্যান প্রার্থী, দলীয় নেতাকর্মী ও স্থানীয় লোকদের সঙ্গে কথা বলে এসব অনিয়মের সত্যতা মিলেছে।

বোড়াগাড়ি ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সদস্য নওদাবস গ্রামের হরিহর রায় অভিযোগ করে বলেন, দলীয় চেয়ারম্যান প্রার্থী নির্বাচনের জন্য গত ৪ মার্চ ইউনিয়নের শিয়ালডাঙ্গি মাঠে বর্ধিত সভা ডাকা হয়। ওই সভায় আমি একজন কাউন্সিলর হিসেবে উপস্থিত ছিলাম। সেখানে সভা শুরুর পর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তোফায়েল আহমেদ এবং উপজেলা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক আমিনুল ইসলামের প্রার্থিতার প্রস্তাব আসে। এ সময় আমিনুল ইসলাম বক্তব্য শুরু করলে এক মিনিটের মাথায় তোফায়েল আহমেদের অনুসারীরা হট্টগোল শুরু করে। এ সময় তারা হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রতি কটূক্তি করে। এ অবস্থায় উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি খায়রুল আলম সভা মুলতবি ঘোষণা করে বলেন, ‘আমরা প্রস্তাবিত দুজনের নাম জেলা নেতাদের মাধ্যমে কেন্দ্রে পাঠাব। ’

ওই ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শাহিনুর রহমান বলেন, ‘গত ৪ মার্চ প্রার্থী নির্বাচনের জন্য শিয়ালডাঙ্গি মাঠে বর্ধিত সভা অনুষ্ঠিত হয়। এর আগে দুপুরে ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মঞ্জুর আহমেদ ও তাঁর বড় ভাই উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তোফায়েল আহমেদের বাড়িতে ৬৫ জন কাউন্সিলরের দাওয়াত ছিল। আমরা প্রায় ৫০ জন অংশ নেই। সেখানে খাওয়ার পর তোফায়েল আহমেদ আমাদের যাতায়াত খরচ বাবদ দেড় হাজার করে টাকা দিয়ে তাঁর চাতালে আমাদের মোটরসাইকেল রেখে সবাইকে হেঁটে নিয়ে যান সভাস্থলে। সেখানে দুই প্রার্থীর মধ্যে আমিনুল ইসলাম বক্তব্যের শুরুতে কাউন্সিলরদের দাওয়াত খাওয়ার বিষয়টি তুলে ধরলে হট্টগোলের মধ্যে সভা ভণ্ডুল হয়। ’

একই ধরনের অভিযোগ করে ওই ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের কাউন্সিলর ঈশ্বর চন্দ্র বর্মণ বলেন, ‘ষড়যন্ত্র করে কেউ প্রার্থী হলে আমরা মানব না। আমরা চাই দুজনের নাম কেন্দ্রে পাঠানো হোক। যার গ্রহণযোগ্যতা বেশি, তাকে নৌকা প্রতীক দেয়া হোক। ’

অন্যদিকে ডোমার ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের মুক্তিযোদ্ধাবিষয়ক সম্পাদক মানিক চক্রবর্তী বলেন, ‘গত ৩ মার্চ ডোমার হাফিজিয়া মাদ্রাসায় বর্ধিত সভায় ৪৩ ভোটে উপজেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মাসুম আহমেদকে একক প্রার্থী চূড়ান্ত করা হয়েছে। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী বর্তমান ইউপি চেয়ারম্যান হাফিজুর ইসলাম পেয়েছেন ২২ ভোট। এখন শোনা যাচ্ছে মাসুমের নামের সঙ্গে হাফিজুরের নাম পাঠানোর ষড়যন্ত্র চলছে। ’

ডোমার ইউনিয়নের এক নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগের সভাপতি কর্ণদেব রায় বলেন, ‘হাফিজুর রহমান আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে উপনির্বাচনে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ার পর জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন। এ কারণে আমরা এবার তাঁকে প্রার্থী করিনি। এখন তাঁর নাম প্রার্থিতার তালিকায় পাঠানো হলে তৃণমূলের রায়কে উপেক্ষা করা হবে। ’

স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা জানায়, এসব অনিয়মের কারণে জোড়াবাড়ী, ভোগডাবুড়ী, বোড়াগাড়ী, পাঙ্গামটকপুর ইউনিয়নে বর্ধিত সভা আহ্বান করার পরও তা স্থগিত করতে হয়েছে।

এ বিষয়ে ডোমার উপজেলা যুবলীগের সভাপতি (বোড়াগাড়ী ইউপির চেয়ারম্যান পদে মনোনয়ন প্রত্যাশী) আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘তৃণমূলে ষড়যন্ত্র করে আমাকে বাদ দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। আমার নাম কেন্দ্রে পাঠানো হোক, কেন্দ্র যে সিদ্ধান্ত দেবে আমি মেনে নিব। ’

ডোমার ইউপি নির্বাচনের মনোনয়নপ্রত্যাশী উপজেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদ মাসুম আহমেদ বলেন, ‘তৃণমুলের নেতাকর্মীরা আমাকে মনোনীত করেছে। সে হিসেবে একক প্রার্থীর নাম কেন্দ্রে পাঠানোর কথা। দুজনের নাম পাঠানো হলে তৃণমূলের রায়কে উপেক্ষা করা হবে। ’

ডোমার উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক (বোড়াগাড়ী ইউনিয়নের মনোনয়নপ্রত্যাশী) তোফায়েল আহমেদ বলেন, ‘ডোমারের ১০ ইউনিয়নে বর্ধিত সভা হয়েছে। প্রার্থী নির্বাচনে ভোট করতে হবে এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। কে টাকা দিল, কে খাওয়াইল এর কোনো ভিত্তি নেই। এখানে কোনো অনিয়ম হয়নি। আগের সভার দুই দিন পর ইউনিয়ন কমিটি এক সভা ডেকে রেজুলেশনের মাধ্যমে আমাকে একক প্রার্থী হিসেবে চূড়ান্ত করেছে। ’ এটিই এখন তৃণমূলের চূড়ান্ত বলে দাবি করেন তিনি।

এ বিষয়ে কথা বললে ডোমার উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি খায়রুল আলম বলেন, ‘ডোমারের ১০ ইউনিয়নের মধ্যে ছয়টির প্রার্থী বাছাই সম্পন্ন হয়েছে। চারটি ইউনিয়নে প্রার্থী চূড়ান্ত করা সম্ভব হয়নি। ওই চারটির বিষয়ে জেলা কমিটিকে জানানো হয়েছে। জেলা কমিটির হস্তক্ষেপে ওই চারটির বিষয়ে সিদ্ধান্ত হবে। ইউনিয়ন চারটি হলো—জোড়াবাড়ী, ভোগডাবুড়ী, পাঙ্গামটকপুর ও বোড়াগাড়ী। ’ তিনি আরো বলেন, ‘টাকা লেনদেনের অভিযোগ সব ইউনিয়নে শোনা যায়। কিন্তু এর কোনো প্রমাণ নেই। আমি নিজে স্বচ্ছতার সঙ্গে কাজ করছি, এটা বলতে পারি। ’

স্থানীয় নেতাকর্মীরা জানায়, ছয়টি ইউনিয়নে ভোটের মাধ্যমে একক প্রার্থী চূড়ান্ত করা হয়েছে। এগুলো হলো সোনারায় ইউনিয়নে (জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য) মঞ্জুরুল হক চৌধুরী, হরিণচড়া ইউনিয়নে (ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সহসভাপতি) তৈয়বুর রহমান, ডোমার সদর ইউনিয়নে (উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক) মাসুম আহমেদ, বামুনিয়া ইউনিয়নে (ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সহসভাপতি) মনোরঞ্জন রায়, কেতকিবাড়ী ইউনিয়নে (ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক) আজিজুল হক এবং গোমনাতি ইউনিয়নে (ইউনিয়ন যুবলীগের আহ্বায়ক) আবদুল হামিদ।


মন্তব্য