kalerkantho


৪৫ বছর পর দৃষ্টি জয় বাংলা সড়কে

কুদ্দুস বিশ্বাস, রৌমারী (কুড়িগ্রাম)   

১৫ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



৪৫ বছর পর দৃষ্টি জয় বাংলা সড়কে

কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলার তুড়া রোড সংস্কার করা হচ্ছে। প্রশাসনের নির্দেশে সাধারণ মানুষ অবৈধ স্থাপনা সরিয়ে নিয়েছে। কিন্তু আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের স্থাপনা এখনো সরানো হয়নি। ছবি : কালের কণ্ঠ

ব্রিটিশ আমলে এ সড়ক দিয়ে ভারত-বাংলাদেশ ব্যবসা-বাণিজ্য চলত। আসাম থেকে পণ্যসামগ্রী পরিবহন হতো।

আগে নাম ছিল তুড়া রোড। একাত্তরে ভারতে প্রশিক্ষণ নিয়ে মুক্তিযোদ্ধারা ওই সড়ক দিয়ে ‘জয় বাংলা স্লোগান’ দিতে দিতে আসতেন। এর পর থেকে স্থানীয় লোকজন একে জয় বাংলা সড়ক নামে চেনে। ৪৫ বছর পর সেই সড়ক সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।

কুড়িগ্রাম সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর (সওজ) সূত্রে জানা গেছে, রৌমারীর ভোলা মোড় থেকে চরনতুন স্থলবন্দর পর্যন্ত সাড়ে চার কিলোমটার সড়ক ‘রৌমারী তুড়া সড়ক উন্নয়ন প্রকল্প’ নামে সংস্কার করা হচ্ছে। এ জন্য ৩৫ কোটি সাত লাখ টাকা ব্যয়ে দুটি প্যাকেজে দরপত্র আহ্বানসহ কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে। দুই লেনবিশিষ্ট সড়ক উন্নয়নের পাশাপাশি তিনটি সেতু নির্মাণ করা হবে। তখন স্থলবন্দর থেকে যাতায়াতে সময় লাগবে মাত্র ৩০ মিনিট। কাজ শেষ করতে ১৮ মাস সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে।

চরনতুন বন্দর সীমান্তের বাসিন্দা মুক্তিযোদ্ধা আফছার আলী (৭০) বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের সময় ওই সীমান্ত এলাকার নো ম্যান্স ল্যান্ডে অসংখ্য মানুষ আশ্রয় নিয়েছিল। শরণার্থীদের অনেকে না খেয়ে মারা গেছে। ওই স্থানে গেলে আমি এখনো শরণার্থীদের কান্নার শব্দ শুনি। মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক স্মৃতি বহন করে সড়কটি। একই সড়কের ভারতীয় অংশের নাম জয় বাংলা সড়ক। কিন্তু বাংলাদেশ অংশে তা নেই। নতুন প্রজন্মের মানুষ এ ইতিহাস জানে না। আমার মতে, সড়কটির নামকরণ জয় বাংলা সড়ক হওয়া উচিত। এ ছাড়া শরণার্থীদের সমাধিস্থলে স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করা দরকার। ’

স্থানীয় সূত্র জানায়, সড়কটির উন্নয়নকাজ শেষ হলে সীমান্তঘেঁষা ৩০ গ্রামের মানুষের সহজ যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে উঠবে। এতে প্রায় ৫০ হাজার মানুষ অবরুদ্ধ জীবন থেকে মুক্তি পাবে। একই সঙ্গে সীমান্ত এলাকাগুলোতে অর্থনৈতিকভাবে বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটবে। সীমান্তের চরনতুন স্থলবন্দরে আমদানি-রপ্তানি বৃদ্ধি পাবে। বর্তমানে ওই স্থলবন্দর দিয়ে ভারত থেকে ব্যাপক হারে পাথর ও কয়লা আসছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ থেকে মেলামাইন সামগ্রী ও সিমেন্ট রপ্তানি হচ্ছে।

কুড়িগ্রাম সওজের নির্বাহী প্রকৌশলী সাদেকুর রহমান বলেন, ‘এরই মধ্যে সড়কের অবৈধ দখলদারদের স্থাপনা সরিয়ে নিতে কড়া নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ জন্য উপজেলা প্রশাসনের কাছে লিখিতভাবে আবেদন জানানো হয়েছে। ’

জাতীয় পার্টির নেতা ও স্থানীয় সংসদ সদস্য রুহুল আমিন বলেন, ‘জয় বাংলা সড়কের উন্নয়নকাজ শেষ হলে চরনতুন বন্দর সীমান্তে অবস্থিত স্থলবন্দরটি পূর্ণাঙ্গ রূপ পাবে। এতে অবহেলিত রৌমারীর অর্থনৈতিক দিক থেকে পরিবর্তন ঘটবে। ’

আওয়ামী লীগ নেতাদের অবৈধ স্থাপনা সরেনি

এদিকে ভোলা মোড় থেকে চরনতুন বন্দর সীমান্তে স্থলবন্দর পর্যন্ত সড়কের অবৈধ স্থাপনা সরিয়ে নেওয়ার জন্য গত ১০ ফেব্রুয়ারি কড়া নির্দেশ দেওয়া হয়। সাত দিনের সময়সীমা বেঁধে দিলে অসহায় দরিদ্ররা ঘরবাড়ি সরিয়ে নেয়। কিন্তু ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতার স্থাপনা সরানো হয়নি। প্রভাবশালীদের দখলে ওই সব স্থাপনার বিষয়ে উপজেলা প্রশাসন নীরব ভূমিকা পালন করছে। এ নিয়ে জনমনে চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে।

গত সোমবার সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, ভোলা মোড়-সংলগ্ন ওই সড়কের উত্তর পাশে অবৈধ আটটি স্থাপনা রয়েছে। এসব স্থাপনার মালিক উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি আজিজুল হক, সহসভাপতি শহীদুল ইসলাম সালু ও জাতীয় পার্টির সাবেক সভাপতি লাল মিয়া ওরফে লাল মিয়া ঠিকাদার।

প্রশাসনের নির্দেশ পেয়ে সড়ক থেকে ঘর সরিয়ে নিয়েছেন আবুল কালাম নামের এক ভ্যানচালক। ক্ষিপ্ত হয়ে তিনি বলেন, ‘রাস্তার কাজ হবো, এই জন্য আমরা ঘরবাড়ি ভাইঙ্গা নিয়া গেছি। কিন্তুক আরো ঘর আছে সেগুলো তো ভাঙ্গছে না। তারা সরকারি দল করে হেই জন্য তাকরে কিছু হয় না। মরণ খালি আমগর মতো গরিব মাইনষের। ’

বদিউজ্জামান নামের এক ক্ষুদ্র দোকানি বলেন, ‘সড়কের পাশে আমার একটা দোকান ছিল। প্রশাসনের লোকজন আইসা কয়, ঘর সরানো লাগবে। না অইলে আমরা ভাইঙ্গা দিব এবং ঘর ভাঙ্গার যে খরচ হয় সেটাও আপনার কাছ থেকে আদায় করা হবে। শেষে আমি দোকান ভাইঙ্গা নিছি। এহন দেখছি আওয়ামী লীগ নেতাগরে ঘর ভাঙ্গে না। ’

অবৈধ স্থাপনা কেন সরানো হচ্ছে না জানতে চাইলে উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি আজিজুল হকের ছেলে অ্যাডভোকেট মাসুম ইকবাল, আওয়ামী লীগ নেতা শহীদুল ইসলাম ও তাঁর বড় ভাই লাল মিয়া বলেন, ‘আমাদের ঘর ঠিক স্থানেই রয়েছে। সড়কের জায়গা দক্ষিণ পাশে। দক্ষিণ পাশে না গিয়ে উত্তর পাশের আমাদের ঘর পেছানো হয়েছে। আমরা এটা মানি না। ’

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) শংকর কুমার বিশ্বাস বলেন, ‘শুনেছি, সরকারি দলের কয়েকজন নেতা তাঁদের ঘর সরাচ্ছেন না। তাঁদের আলাদাভাবে স্থাপনা সরানোর জন্য নোটিশ দেওয়া হয়েছে। নির্দেশ না মানলে আইনগত ব্যবস্থাসহ সব উদ্যোগ নেওয়া হবে। কেননা আইন সবার জন্য সমান। এখানে ধনী, প্রভাবশালী আর দরিদ্র বলতে কিছু নেই। ’


মন্তব্য