মিটার চোরা সাদ্দাম!-335224 | প্রিয় দেশ | কালের কণ্ঠ | kalerkantho

kalerkantho

বুধবার । ২৮ সেপ্টেম্বর ২০১৬। ১৩ আশ্বিন ১৪২৩ । ২৫ জিলহজ ১৪৩৭


মিটার চোরা সাদ্দাম!

আলমগীর চৌধূরী, জয়পুরহাট   

১৩ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



মিটার চোরা সাদ্দাম!

মিটার চুরির সঙ্গে জড়িত সাদ্দাম হোসেন

নাম তার সাদ্দাম। জয়পুরহাটের কালাই ও ক্ষেতলালে বৈদ্যুতিক মিটার মালিকদের কাছে এক আতঙ্কের নাম। সেচ মৌসুমে মিটার চুরি করা তার পেশা। তবে তার চুরির ধরনটা একটু আলাদা। সেচ মৌসুমের শুরুতে বৈদ্যুতিক মিটার মালিকদের মোবাইল ফোনে এসএমএস করে বিকাশ নম্বর পাঠিয়ে দেয় ‘মিটার চোর’ সাদ্দাম। ওই বিকাশ নম্বরেই পাঠিয়ে দিতে হয় বৈদ্যুতিক মিটারের ‘খরচা’। ‘খরচা’ না দিলে নিমেষেই সে হাতিয়ে নেয় বৈদ্যুতিক মিটার। মিটার চুরি গেলে নতুন মিটার সংগ্রহ করতে মালিকদের গুনতে হয় প্রায় ২১ হাজার টাকা। এ কারণে মিটার বাঁচাতে তিন থেকে ১০ হাজার টাকা সাদ্দামকে ‘খরচা’ দেওয়াই নিরাপদ মনে করে এলাকাবাসী। ওই সব এলাকা ঘুরে সেচ মালিকদের সঙ্গে কথা বলে সাদ্দামের এমন কীর্তিই উঠে এসেছে।

ক্ষেতলাল ও কালাইয়ের সেচ মালিকদের অভিযোগ, রোপা আমন, আলু, বোরো—তিন মৌসুমেই দুই বছর ধরে এলাকার বিভিন্ন মাঠের সেচযন্ত্রের বৈদ্যুতিক মিটার চুরির ঘটনা ঘটছে। পরে চোরদের মোবাইল ফোনে এসএমএস পেয়ে তাদের দাবি করা তিন থেকে ১০ হাজার টাকা বিকাশ নম্বরে পাঠিয়ে দিলে সেগুলো ফেরত পাওয়া যাচ্ছে। এভাবে বছরে তিনবার চাঁদা দিয়ে সেচকাজ সচল রাখতে হচ্ছে তাদের। অনেকের অভিযোগ, বিকাশ ও ফোন নম্বর জানিয়ে পুলিশের কাছে অভিযোগ করেও কোনো লাভ হয়নি। তারা জানায়, মাঠে সেচযন্ত্র স্থাপন করে ফসলে সেচ দিতে হয়। এ ক্ষেত্রে সেচ মালিকদের সব সময় নিরাপত্তাহীনতায় থাকতে হয়। চুরির পর চোরদের কথামতো চাঁদা না দিলে মিটার ফেরত পাওয়া যায় না। সে ক্ষেত্রে মিটার কিনতে তাদের ২০ হাজার ৩০০ টাকাসহ সংযোগের জন্য আরো ৮০০ টাকা বিদ্যুৎ অফিসে জমা দিতে হয়। নিরুপায় হয়ে চাঁদা দিয়েই তারা সেচকাজ চালিয়ে আসছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ক্ষেতলাল উপজেলার ইটাখোলা, ভাশিলা, উত্তর বস্তা, শাখারুঞ্জ ও গোলাহার এলাকার অন্তত ৬০-৭০টি সেচযন্ত্রের মিটার চুরি করে চাঁদা নিয়ে আবার ফেরত দেওয়া হয়েছে। শুধু সেচযন্ত্র নয়, চাঁদা নেওয়া হয়েছে চালকল থেকেও। আর কালাই উপজেলার পশ্চিম কুজাইল, করিমপুর, ইমামপুরসহ বেশ কিছু মাঠে মিটার চুরির হুমকিতে নীরব চাঁদাবাজির অভিযোগ পাওয়া গেছে। কালাই থানায় এ নিয়ে একটি মামলাও হয়েছে। অভিযোগ করার পরও পুলিশ প্রশাসনের সহযোগিতা না পেয়ে মিটার চুরির বিষয়ে মুখ খুলতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে ক্ষতিগ্রস্তরা। বাধ্য হয়ে তারা চোরের সঙ্গে সন্ধি করে সেচকাজ অব্যাহত রেখেছে।

উপজেলার পশ্চিম কুজাইল গ্রামের আজিজুল ইসলাম জানান, তাঁর গভীর নলকূপের বৈদ্যুতিক মিটার চুরির পর চোরদের পাঠানো এসএমএস অনুযায়ী টাকা বিকাশ করেও তিনি মিটার ফেরত পাননি। বাধ্য হয়ে তিনি গত ১ মার্চ কালাই থানায় মামলা করেছেন।

ক্ষেতলাল পৌরসভার কাউন্সিলর জুলফিকার আলী চৌধুরী অভিযোগ করেন, তাঁর এলাকার পূর্ব শাখারুঞ্জ গ্রামের মোতারফ হোসেনের বৈদ্যুতিক মিটার চুরির পর মোবাইলে এসএমএস পেয়ে সাত হাজার টাকা বিকাশ করা হয়। পরে আরো তিন হাজার টাকা বিকাশ করার পর ওই মিটার ফেরত পাওয়া গেছে। একইভাবে ওই গ্রামের রফিকুল ইসলাম চৌধুরী, সুমন চৌধুরী, গাজীউল হক চৌধুরীসহ এলাকার অন্তত ৩০-৩৫টি গভীর ও অগভীর নলকূপে চাঁদাবাজির ঘটনা ঘটেছে। তিনি বলেন, মাঝে বেগুন গ্রামের কুখ্যাত সাদ্দাম মিটার চুরির সঙ্গে জড়িত বলে পুলিশ নিশ্চিত হয়। অথচ তার বরাত দিয়ে এখনো মিটার চুরির ঘটনা ঘটেই চলেছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ইটাখোলা বাজারের একজন ব্যবসায়ী জানান, মিটার চুরির পর ইটাখোলা বাজারে তিনি চোরের দেওয়া বিকাশ নম্বরে বিকাশ করেন। সেই টাকা কিছুক্ষণ পরই ক্ষেতলাল বাজার থেকে ওঠানো হয়। চোররা সব সময় এলাকায় ঘোরাফেরা করছে।

কালাই উপজেলার বেগুন গ্রামের কৃষক আহসান চৌধুরী অভিযোগ করেন, এলাকায় মিটার চোরের প্রধান কুখ্যাত সাদ্দাম। থানায় তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলাও রয়েছে। তাদের গোটা পরিবার অপরাধ জগতের সঙ্গে জড়িত। তিনি বলেন, সাদ্দামের বাবা আব্দুস সামাদ অপহরণের পর শিশু হত্যার অভিযোগে বর্তমানে জয়পুরহাট কারাগারে যাবজ্জীবন সাজা ভোগ করছে। তার ভাই ও ভগ্নিপতিও অপরাধের সঙ্গে জড়িত।

জয়পুরহাট জেলা গভীর নলকূপ মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক অফির উদ্দিন জানান, কালাই ও ক্ষেতলাল উপজেলার পূর্ব সীমান্তবর্তী এলাকায় মিটার চুরির মাধ্যমে সেচ মালিকদের জিম্মি করে চাঁদাবাজির ব্যাপক ঘটনা ঘটছে। এসব বন্ধে পুলিশের তৎপরতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি। কালাই থানার ওসি সিরাজুল ইসলাম জানান, দুই থানায় যে মিটার চুরির ঘটনা ঘটছে, তার মূল হোতা বেগুন গ্রামের সাদ্দাম একজন পেশাদার চোর, ছিনতাইকারী ও দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী। পুলিশ তাকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা করছে। তার বিরুদ্ধে কালাই থানায় চারটি মামলা রয়েছে। মিটার চুরি বন্ধ করতে তিনি নিজেই মাঠে কাজ করছেন। ক্ষেতলাল থানার ওসি মুনিরুল ইসলাম বলেন, ‘মিটার চুরির বিষয়ে থানায় লিখিত কোনো অভিযোগ না এলেও বিভিন্ন মাধ্যমে সেচযন্ত্রে চাঁদাবাজির বিষয়টি জানতে পেরেছি। এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।’

জয়পুরহাটের পুলিশ সুপার মোল্যা নজরুল ইসলাম বলেন, ‘মিটার চুরির ঘটনায় মামলা হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট থানাগুলোর ওসিদের এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’

মন্তব্য