kalerkantho

সোমবার । ৫ ডিসেম্বর ২০১৬। ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৪ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


শর্ষের মধ্যে ভূত মন্ত্র বিফল

বগুড়ায় উচ্ছেদ অভিযান ব্যর্থ

লিমন বাসার, বগুড়া   

১২ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



শর্ষের মধ্যে ভূত মন্ত্র বিফল

বগুড়া শহরের সাতমাথায় বীরশ্রেষ্ঠ স্কয়ারের পাশে সাংবাদিক ছাউনির নামে ঘিরে রাখা হয়েছে এ জায়গা। প্রশাসন উচ্ছেদ অভিযান চালালেও এ স্থাপনা এখনো বহাল রয়েছে। ছবি : কালের কণ্ঠ

পুলিশ ও পৌর প্রশাসনের পক্ষ থেকে বগুড়া সাতমাথার অবৈধ স্থাপনাযুক্ত এলাকাকে লাল দাগ দিয়ে চিহ্নিত করা হয়। উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করলেও এক সপ্তাহের মধ্যে দখলদাররা ফিরে আসে।

অভিযোগ ওঠে, ফুটপাত, সড়কের বিভাজক, বিপণিকেন্দ্রের বারান্দাসহ অবৈধ পার্কিং থেকে প্রতিদিন চাঁদা পায় ফাঁড়ি, পৌরসভা ও পৌর পুলিশ। এ কারণে বারবার উচ্ছেদ অভিযান চালালেও সুফল মিলছে না।

স্থানীয় সূত্র জানায়, বগুড়া শহরের সাতমাথা পরিষ্কার ও যানজটমুক্ত করার লক্ষ্য নিয়ে গত ১২ ফেব্রুয়ারি জিরো পয়েন্ট ও এর আশপাশের এলাকা রেড জোন ঘোষণা করা হয়। জেলা প্রশাসক (ডিসি) আশরাফ উদ্দিন, পৌরসভার মেয়র অ্যাডভোকেট এ কে এম মাহবুবুর রহমান, জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মমতাজ উদ্দিন, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক খোরশেদ আলম, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আরিফুর রহমান মণ্ডলের উপস্থিতিতে রাস্তায় লাল চিহ্ন দিয়ে সীমানা নির্ধারণ করা হয়। ঘোষণা দেওয়া হয়, রেড জোনের মধ্যে কোনো ভ্রাম্যমাণ দোকান থাকবে না। গাড়ি পার্কিং চলবে না। ফুটপাত দখল করে কোনো দোকান বসবে না। কবি নজরুল ইসলাম সড়কে কোনো যানবাহন পার্কিং, ফুটপাত দখল করে কোনো দোকান বসতে দেওয়া হবে না। এই রেড জোনের মধ্যে আবর্জনা ফেলা যাবে না।

শুরুতে সফলতা এলেও মাত্র তিন সপ্তাহের মধ্যে এখন সাতমাথা ফিরেছে আগের রূপে। আবারও যেখানে সেখানে ভ্রাম্যমাণ দোকান, অবৈধ পার্কিং, ফুটপাত দখল করে দোকান দেওয়া হয়েছে। একইভাবে বিলবোর্ড দিয়ে চলছে অবৈধ বাণিজ্য। এ এলাকায় সাংবাদিক ছাউনির নামে একটি জায়গা বেড়া দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছে। সেই ঘিরে রাখা জায়গার মধ্যে একটি পানের দোকান ও মাঝেমধ্যে বহিরাগতদের দেখা যায়।

রবিবার দ্বিতীয় দফা অভিযানে সাতমাথার আশপাশে ভ্রাম্যমাণ কিছু দোকানপাট উচ্ছেদ করা হয়। বীরশ্রেষ্ঠ স্কয়ারের পাশে বেড়া ও গ্রিল দিয়ে অবৈধভাবে ঘিরে রাখা একটি স্থানসহ আশপাশের আরো অনেক দোকান উচ্ছেদ করা হয়নি। অথচ এই অভিযানে নেতৃত্ব দেন বগুড়ার জেলা প্রশাসক ও পৌর মেয়র।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পুরো সাতমাথা এলাকায় প্রতি ফুট জায়গা ১০০ থেকে ২০০ টাকা দিন হিসেবে ভাড়া দেওয়া হয়। অর্থাৎ একটি দোকান বসাতে পাঁচ ফুট জায়গার প্রয়োজন হলে তার দিন ভাড়া ৫০০ থেকে এক হাজার টাকা। এ টাকার অর্ধেক পায় পুলিশ, বাকিটা পৌরসভা। স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা নামধারী ও সন্ত্রাসীরা ম্যানেজ করে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে শহরের সাতমাথা এলাকার একজন চা দোকানদার বলেন, ‘যে পুলিশ উচ্ছেদ করে কিছুক্ষণ পর সেই পুলিশই এসে আবার দোকান বসানোর অনুমতি দেয়। বিনিময়ে তাকে চাঁদা দিতে হয়। ’

একই অবস্থা শহরের সাতমাথা এলাকায় অবস্থিত সপ্তপদী মার্কেট ও এর আশপাশের এলাকায়। এ মার্কেটের বারান্দা এখন অবৈধ ব্যবসায়ীদের দখলে। বিভিন্ন দোকানের সামনে বসা ব্যবসায়ীরা প্রতিদিন দোকান মালিককে ২০০ থেকে ৩০০ টাকা করে দেন।

শহরের খোকন পার্ক থেকে জজকোর্ট এলাকা পর্যন্ত রেড জোনের আওতাভুক্ত। কিন্তু বাস্তবচিত্র এখন উল্টো। ফুটপাতে শার্ট ও গেঞ্জি বিক্রেতা সবুজ, মনির ও খাদেমুল বলেন, ‘টাকা দিয়ে ভ্যান লাগাই। অভিযান শুরু হলে কিছুক্ষণ সরে থাকার জন্য পুলিশ এসেই বলে যায়। আবার অভিযান শেষ হলে আমরা আগের স্থানে ফিরে আসি। ’

সাতমাথার চারপাশে কাজী নজরুল ইসলাম সড়ক, থানা মোড়, টেম্পল রোড, নবাববাড়ি সড়ক, শেরপুর রোড, স্টেশন রোড, গোহাইল রোডকে ঘিরে গড়ে উঠেছে কয়েক হাজার অস্থায়ী দোকান। তবে অস্থায়ী হলেও কোনো কোনো এলাকায় দোকানের মালামাল রাতে সরানো হয় না। ক্রেতাদের স্বার্থে হকাররা তাদের নিজস্ব এলাকাও ভাগ করে নিয়েছে।

এর আগে সাতমাথা চত্বরে স্থাপিত বীরশ্রেষ্ঠ স্কয়ার ও আশপাশ এলাকা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার উদ্যোগ নিয়ে সবার প্রশংসা অর্জন করেন বগুড়া ফটো জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের সদস্যরা। এখনো এটি অবৈধ দখলমুক্ত এবং পরিচ্ছন্ন একটি স্কয়ার হিসেবে রয়েছে। তবে এই অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শফিকুল ইসলাম শফিক সাতমাথা ঘিরে রাখা সাংবাদিক ছাউনি সম্পর্কে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

বগুড়া পৌরসভার চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘সাতমাথা রেড জোনে অবস্থানের জন্য কাউকে বৈধতা দেওয়া হয়নি। এমনকি সাংবাদিকদেরও না। এ ক্ষেত্রে সেখানে যাঁরাই অবস্থান করছেন, তাঁরা অবৈধভাবে করছেন। ’

বগুড়ার পুলিশ সুপার (এসপি) আসাদুজ্জামান বলেন, ‘সাতমাথায় অনেক কিছুই অবৈধভাবে আছে। বিষয়টি দেখার দায়িত্ব আসলে পৌরসভার। তবে যেহেতু এটি আইনশৃঙ্খলা কমিটির সিদ্ধান্ত, সে কারণে পুলিশ এ ব্যাপারে উদ্যোগী হবে। ’

বগুড়ার জেলা প্রশাসক আশরাফ উদ্দিন বলেন, ‘ঘোষণার পরও সাতমাথা অবৈধ দখলমুক্ত করা যায়নি। শিগগিরই আবারও অভিযান চালানো হবে। আমরা মুখ চিনে কোনো অভিযান চালাব না। যা হবে, আইন মেনেই করা হবে। ’


মন্তব্য