kalerkantho

রবিবার। ৪ ডিসেম্বর ২০১৬। ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৩ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।

১ টাকায় ইলিশ!

এমরান হাসান সোহেল, পটুয়াখালী   

১১ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



১ টাকায় ইলিশ!

পটুয়াখালীর প্রায় সব হাটবাজারে এভাবে ভাগা দিয়ে বিক্রি করা হচ্ছে ইলিশের পোনা। ছবিটি নিউ মার্কেট বাজার থেকে তোলা। ছবি : কালের কণ্ঠ

একটি ইলিশের ওজন ১৫ থেকে ১৬ গ্রাম। লম্বা দু-তিন ইঞ্চি।

কোনোটি আরো ছোট। প্রায় ৩০টি ওই আকারের ইলিশ একত্রে বিক্রি হচ্ছে ৩০ টাকায়। পটুয়াখালী শহরে এ দৃশ্য এক সপ্তাহ ধরে যত্রতত্র দেখা যাচ্ছে। অথচ গত ১ মার্চ থেকে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত তেঁতুলিয়া নদীর ভোলার ভেদুরিয়া থেকে পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালীর চর রুস্তম পর্যন্ত ১০০ কিলোমিটার এলাকাকে মাছের অভয়াশ্রম ঘোষণা করা হয়েছে। সরেজমিনে গিয়ে গত ৩ থেকে ৬ মার্চ অভয়াশ্রম হিসেবে ঘোষিত তেঁতুলিয়া নদী ঘুরে ইলিশের রেণুসহ জাটকা ও অন্যান্য ছোট মাছ শিকারের মহোৎসব দেখা গেছে। এ ছাড়া নদীর আগুনমুখা, রামনাবাদ ও বুড়াগৌরাঙ্গ এলাকায়ও মাছ নিধন করতে দেখা গেছে।

গত ৩ মার্চ : সকাল ৯টা। পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলার পানপট্টি লঞ্চঘাট হয়ে রাঙ্গাবালী উপজেলার কোড়ালিয়া লঞ্চঘাট। প্রায় এক ঘণ্টার নৌপথ। পুরো নদীর নাম আগুনমুখা। এ নদীর সর্বত্র ছড়িয়ে আছে জাল। গুনে গুনে দেখা গেল, ওই জলসীমায় ২৩টি জাল ফেলে রাখা। এর মধ্যে কেউ টেনে তোলার অপেক্ষায়, কেউ বা আবার তুলছে। অধিকাংশ কারেন্ট জাল। ধরা পড়ছে ছোট ছোট ইলিশের পোনা। ওই দিন দুপুরে রাঙ্গাবালী উপজেলার গহিনখালী লঞ্চঘাট থেকে চর মোন্তাজ লঞ্চঘাট পৌঁছতে পাড়ি দিতে হলো বুড়াগৌরাঙ্গ নদী। সেখানে এক ঘণ্টার নদীপথে দেখা গেছে, অসংখ্য কারেন্ট জাল দিয়ে ইলিশের বাচ্চা শিকারে ব্যস্ত সময় পার করছে জেলেরা।

গত ৬ মার্চ : সকাল ৭টা। বাউফল উপজেলার কালাইয়া লঞ্চঘাটের খাল পেড়িয়ে তেঁতুলিয়া নদী। নদীতে যাওয়ার পথে খালের মধ্যে নজরে আসে ছোট ছোট নৌকা নিয়ে মাছ শিকার করে জেলেরা ফিরছে কালাইয়া বাজার এবং আড়তদারের উদ্দেশে। প্রায় ২৫ মিনিট বহনকারী ট্রলার তেঁতুলিয়া নদীতে প্রবেশমুখে নজরে আসে চর ওয়াডেল-সংলগ্ন এলাকায় ‘পাই জাল’ টানছে জেলেরা। দক্ষিণে তেঁতুলিয়া নদীতে প্রায় তিন ঘণ্টা ট্রলার চালিয়ে দেখা গেল, জাল বাইছে জেলেরা। আবার কোনো কোনো জেলে নদীতে জাল নিয়ে যাওয়ার অপেক্ষায় তীরে অবস্থান করছে। বাউফলের চন্দ্রদ্বীপ ইউনিয়নের পূর্বে বহমান তেঁতুলিয়া নদীতে অসংখ্য বাঁধাজাল পাতা রয়েছে। দশমিনার উত্তর বাঁশবাড়িয়া এলাকায় বাঁধাজালের ছড়াছড়ি। ওই জালে মাছের ছোট রেণু পোনা শিকার করে তা বাজারে কাচকি মাছ হিসেবে বিক্রি করা হয়। এ জালে বিনষ্ট হয় কোটি কোটি বিভিন্ন প্রজাতির মাছের রেণুসহ ডিম। কালাইয়া থেকে দক্ষিণ দিকে তিন ঘণ্টা ট্রলার চালিয়ে দেখা গেছে বাউফল, দশমিনা ও গলাচিপা উপজেলা এবং ভোলার জেলেরা কারেন্ট, বেড়াজাল, বেন্দিজাল, টোংজাল, বাঁধাজাল ও পাইজাল দিয়ে মাছ শিকার করছে। তবে জেলেদের মধ্যে আতঙ্ক রয়েছে কোস্ট গার্ড নিয়ে। কিন্তু নদীতে তাদের তৎপরতা নেই বললেই চলে। ফলে নির্বিঘ্নে জেলেরা শিকার করছে ইলিশের পোনা। ইলিশের ওই বাচ্চাগুলো স্থানীয়ভাবে চাপলি নামে পরিচিত। উত্তর বাঁশবাড়িয়ার জেলে রহমত আলী খাঁ বলেন, ‘অ্যাহন খালি চাপলি। অন্য কোনো মাছ পাই না। এই চাপলি বড় অইলে জাটকা অয়, হেইয়ার পর ইলিশ অয়। অ্যাহন বড় ইলিশ পাওন যায় না। প্যাডের টানে ছোড মাছ ধরি। ’ কেন জাল বাইছেন, কেনই বা ইলিশের বাচ্চা শিকার করেন—এমন প্রশ্নের জবাবে বলেন, ‘করমু কী? খামু কী?’

বাজারে নজরদারি নেই : প্রতিদিন সকালে বাউফল উপজেলার কালাইয়া বাজারে প্রায় দুই থেকে তিন টন ইলিশের বাচ্চা বিক্রি হয়। পুলিশসহ সংশ্লিষ্টদের ম্যানেজ করে কতিপয় প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতার আশ্রয়ে এ অবৈধ ব্যবসা চলে। ওই বাজারে পাইকারি বিক্রির পর নিয়ে যাওয়া হয় বিভিন্ন বাজারে খুচরা বিক্রির জন্য। এ ছাড়া অভিযোগ রয়েছে, দশমিনা উপজেলার হাজীরহাট, বাঁশবাড়িয়া, গছানি, আউলিয়াপুর; বাউফল উপজেলার পৌর বাজার, কনকদিয়া, কালিশুরী, নুরাইনপুর, ধূলিয়া, বগা, বিলবিলাস, নগরেরহাট; গলাচিপা উপজেলার পানপট্টি, বদনাতলী, পৌর শহরের পূর্ব মাছবাজার, সিনেমা হল-সংলগ্ন মাছবাজার, থানা-সংলগ্ন মাছবাজার; রাঙ্গাবালী উপজেলার চর মোন্তাজ স্লুইস বাজার, কোড়ালিয়া বাজার, বড় বাইশদিয়ার মধুখালী বাজার ও বাহের চর বাজারে প্রতিদিন অবাধে ইলিশের বাচ্চা বিক্রি হয়। বাঁশবাড়িয়া বাজারের মাছ বিক্রেতা মো. নয়ন সিকদার বলেন, ‘জাইল্লারা চাপলি ধরে, আমরা বেচি। আমাগো দোষ কী?’ এসব বাজারে কোথাও কোনো নজরদারির খবর পাওয়া যায়নি।

ভিজিএফ পায়নি জেলেরা : মার্চ ও এপ্রিলে জেলেদের জন্য ত্রাণ ও পুনর্বাসন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ভালনারাবল গ্রুপ ফিড (ভিজিএফ) বিতরণের বিধান রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এটা মানা হচ্ছে না। গত বছর পুনর্বাসনের জন্য দুই মাসের চাল জেলেরা পেয়েছে জুন মাসে। এ কারণে নিরুপায় হয়ে সংসার বাঁচাতে তারা শিকার করছে ইলিশের ছোট ছোট বাচ্চা। কালাইয়া বগি গ্রামের জেলে মো. হোসেন মৃধা বলেন, ‘দুই মাস মাছ ধরতে সরকার মানা করছে। কোনো সাহায্য করে না, আমরা বউ, পোলাপান লইয়া খামু কী?’

সংশ্লিষ্টরা কী বলেন? : এ বিষয়ে পটুয়াখালী জোনের কোস্ট গার্ড স্টাফ কর্মকর্তা (অভিযান) লে. সাজ্জাদ বলেন, ‘প্রতিদিন অভিযান চলছে। জেলে আটক হচ্ছে, জাল ও মাছ জব্দ হচ্ছে। জেল জরিমানা হচ্ছে। আমরা সাধ্যানুযায়ী চেষ্টা চালাচ্ছি জাটকা বা চাপলি সংরক্ষণের জন্য। তবে নৌযান ও জনবল বাড়ানো গেলে আরো নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। ’ জেলা মৎস্য কর্মকর্তা ড. মো. আবুল হাসানাত বলেন, ‘জনবল স্বল্পতা এবং নদীতে অভিযানের জন্য পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দের অভাবে সমস্যা হচ্ছে। এর পরও চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। জেলেদের পুনর্বাসনের ক্ষেত্রে ফেব্রুয়ারির শেষ অথবা মার্চের শুরুতে ভিজিএফ চাল বিতরণ করা গেলে নদীতে তাদের তৎপরতা অনেকটা কমানো সম্ভব। ’

পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের মাৎস্যবিজ্ঞান অনুষদের অ্যাকুয়াকালচার বিভাগের অধ্যাপক ড. সুলতান মাহমুদ বলেন, ‘সামাজিক সচেতনতা খুব জরুরি। সব পেশাজীবী মানুষকে এ ব্যাপারে এগিয়ে আসতে হবে। নদী, বাজার, ঘাট সর্বত্র এ ব্যাপারে নজরদারি থাকতে হবে। পাশাপাশি একটি পরিকল্পনা তৈরি করে মাছের প্রজনন এবং রেণু বেড়ে ওঠার সময় নির্ধারণ করে নিরাপত্তা বিধান করতে হবে। তা না হলে শুধু ইলিশই না, হারিয়ে যাবে আমাদের মিঠা পানির অনেক মাছ। ’


মন্তব্য