২৮ বছরের চেয়ারম্যান এবার তৃণমূলেই-334514 | প্রিয় দেশ | কালের কণ্ঠ | kalerkantho

kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২৯ সেপ্টেম্বর ২০১৬। ১৪ আশ্বিন ১৪২৩ । ২৬ জিলহজ ১৪৩৭


২৮ বছরের চেয়ারম্যান এবার তৃণমূলেই বাদ!

চাঁদপুর প্রতিনিধি   

১১ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



২৮ বছরের চেয়ারম্যান এবার তৃণমূলেই বাদ!

জয়নাল আবেদীন ভূঁইয়া। ছিলেন ২৮ বছর ধরে ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান। চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জের গুপ্টি পূর্ব ইউনিয়নে তাঁর জনপ্রিয়তা তুঙ্গে। রয়েছে ভোটের বৈতরণী পাড়ি দেওয়ার মতো বিশাল অভিজ্ঞতার ভাণ্ডার। তার পরও কেন্দ্রে পাঠানো তৃণমূলের তালিকায় নেই আওয়ামী লীগের এই বর্ষীয়ান নেতার নাম।

ফরিদগঞ্জে ইউপি নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে আওয়ামী লীগ দলীয় প্রার্থী বাছাই নিয়ে চলছে এ রকমই হ-য-ব-র-ল অবস্থা। যোগ্য প্রার্থী খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না—এমন অজুহাতে একাধিক ব্যক্তির নাম কেন্দ্রে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে দলের উপজেলা কমিটি। ফলে কে পাচ্ছেন দলের মনোনয়ন, এ নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন সম্ভাব্য চেয়ারম্যান প্রার্থীরা। এক জনপ্রিয় নেতা অভিযোগ করেছেন, ষড়যন্ত্র করে প্রার্থী তালিকা থেকে তাঁর নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। এদিকে, দলের মনোনয়নপত্র হাতে তুলে দেওয়া হবে, এমন প্রতিশ্রুতি দিয়ে কতিপয় নেতা সম্ভাব্য প্রার্থীদের কাছে টাকা দাবি করেছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে। অন্যদিকে সব কটি ইউনিয়নে বিদ্রোহী প্রার্থী দাঁড় করানোর ঘোষণা দিয়েছেন আওয়ামী লীগের বহিষ্কৃত এক নেতা। সবকিছু মিলিয়ে অসন্তোষ বিরাজ করছে দলের তৃণমূলে।

নির্বাচন কমিশন ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী আগামী ২৩ এপ্রিল ফরিদগঞ্জের ১৫টি ইউপির নির্বাচন। দুই সপ্তাহ ধরে চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী বাছাইয়ে বিভিন্ন ইউনিয়নে নেতাকর্মীদের নিয়ে বর্ধিত সভার আয়োজন করে সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন কমিটি। কিন্তু কমিটির বাইরের আওয়ামী লীগের ‘সুবিধাবঞ্চিতদের’ বাধার কারণে সভাগুলো ভণ্ডুল হয়ে যায়। শেষে সিদ্ধান্ত হয়, ফরিদগঞ্জের সংসদ সদস্য (এমপি) ড. শামছুল হক ভূঁইয়ার মতামত নিয়ে প্রতিটি ইউনিয়ন থেকে প্রার্থী হিসেবে একাধিক ব্যক্তির নাম জেলা কমিটির মাধ্যমে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রে পাঠানো হবে। এ নিয়ে গত শনিবার রাতে চাঁদপুর শহরে শামছুল হক ভূঁইয়ার বাসভবনে উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আবুল খায়ের পাটোয়ারী ও সাধারণ সম্পাদক আবু সাহেদ সরকারকে নিয়ে রুদ্ধদ্বার বৈঠক হয়। বৈঠক সূত্র জানায়, ১৫টি ইউনিয়নে চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আগ্রহী দলের ত্যাগী নেতাদের নাম কেন্দ্রে পাঠানো হবে।

গত সোমবার বিকেলে এ কথা নিশ্চিত করে আবুল খায়ের পাটোয়ারী বলেন, ‘দু-এক দিনের মধ্যে ঢাকায় নীতিনির্ধারণী নেতাদের হাতে আমরা প্রার্থীদের তালিকা তুলে দেব।’ মনোনয়ন বাণিজ্য সম্পর্কে তিনি দৃঢ় কণ্ঠে বলেন, ‘কতিপয় ব্যক্তি এমন অপচেষ্টায় লিপ্ত, এমন তথ্যের ভিত্তিতে আমরা এমপি সাহেবের পরামর্শে ত্যাগী নেতাদের নিয়ে একাধিক নামের তালিকা প্রস্তুত করেছি। যাঁরা যোগ্য এবং দলের জন্য নিবেদিত তাঁদের নামই তালিকায় রয়েছে। এ নিয়ে বিভ্রান্ত হওয়ার কোনো কারণ নেই।’

সূত্র জানায়, উপজেলা আওয়ামী লীগের মধ্যম সারির একজন নেতা তাঁর ঘনিষ্ঠজনের মাধ্যমে বেশ কয়েকজনকে চেয়ারম্যান পদে প্রার্থিতা নিশ্চিত করে দিতে তিন থেকে পাঁচ লাখ টাকা দাবি করেন। বিষয়টি জানার পর স্থানীয় এমপি ও উপজেলা সভাপতি রুদ্ধদ্বার বৈঠক করে ‘সতর্কতার সঙ্গে’ তালিকা তৈরি করে ঢাকায় আওয়ামী লীগের কেন্দ্রে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেন। তবে ওই নেতার নাম কেউ প্রকাশ করতে চাননি।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ফরিদগঞ্জের ১৫ নম্বর রূপসা উত্তর ইউনিয়নে ওমর ফারুক ফারুকী, ১৬ নম্বর রূপসা দক্ষিণে মো. তসলিমউদ্দিন ও ১৪ নম্বর ফরিদগঞ্জ দক্ষিণে সোহেল খান চেয়ারম্যান পদে দলের মনোনয়ন পাবেন, এ রকম নিশ্চিত হয়ে আওয়ামী লীগের এসব নেতা দীর্ঘদিন ধরে মাঠে আগাম প্রচার চালিয়েছেন। তাঁদের কোনো বিকল্প ছিল না। কিন্তু কেন্দ্রে তালিকা পাঠানোর সময় তাঁদের নামের সঙ্গে আরেকজন করে ব্যক্তির নাম পাঠানো হয়। এতে তাঁদের মধ্যে এক ধরনের হতাশা দেখা দেয়। এ প্রসঙ্গে সাবেক ছাত্রলীগ নেতা মো. তসলিমউদ্দিন বলেন, ‘মনোনয়ন পাওয়াটা এখন ভাগ্যের ব্যাপার। তাই আমি নিয়তির ওপর ছেড়ে দিয়েছি।’

অন্যদিকে, উপজেলার ৫ নম্বর গুপ্টি পূর্ব ইউনিয়নে চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী হিসেবে তালিকায় দেওয়া হয়েছে আবদুল গনি বাবুল পাটোয়ারী ও মোস্তাফিজুর রহমানের নাম। তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয় ওই ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান, প্রবীণ আওয়ামী লীগ নেতা জয়নাল আবেদীন ভূঁইয়ার নাম। জয়নাল আবেদীন ভূঁইয়া অভিযোগ করেন, ‘গত নির্বাচনেও আমি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলাম। কিন্তু ষড়যন্ত্র করে আমার বিজয় ছিনিয়ে নেওয়া হয়। সেখানে আমাদের দলের এক নেতা (আবদুল গনি বাবুল পাটোয়ারী) তাঁর ভাই বিএনপি নেতা শাহজাহান পাটোয়ারীকে চেয়ারম্যান নির্বাচিত করতে সহায়তা করেন। এবার সেই ব্যক্তি নিজেই প্রার্থী হতে গিয়ে সুকৌশলে তালিকা থেকে আমার নাম বাদ দিয়েছেন। এ বিষয় আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় মনোনয়ন বোর্ডের সভাপতি বরাবর লিখিত অভিযোগ দিয়েছি।’ তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, ‘দলের জন্য ত্যাগ স্বীকার করেছি এবং জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর আদর্শে লড়ে যাব। তাই আমার আবেদন অবশ্যই বিবেচনায় নেওয়া হবে।’

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রায় ২৮ বছর ধরে ইউপি চেয়ারম্যান ছিলেন জয়নাল আবেদীন ভূঁইয়া। দলমত নির্বিশেষে তাঁর বিশাল জনপ্রিয়তা রয়েছে। গুপ্টি পূর্ব ইউনিয়নের বৈচাতরী গ্রামের সমাজসেবী আবদুল ওয়াদুদ বলেন, ‘এমন পরিস্থিতিতে তাঁকে (জয়নাল আবেদীন) বাদ দিয়ে নতুন কাউকে নৌকা প্রতীকের মনোনয়ন দিলে দলটি যোগ্য নেতৃত্ব হারাবে এবং উন্নয়ন সুবিধা থেকে বঞ্চিত হবে এলাকাবাসী।’

এদিকে, নৌকা প্রতীক নিয়ে গত পৌর নির্বাচনে মাহফুজুল হক মেয়র নির্বাচিত হলেও নানা কারণে তিনি স্থানীয় সংসদ সদস্য ও উপজেলা আওয়ামী লীগের কমিটির ‘অপছন্দের ব্যক্তি’। পৌর আওয়ামী লীগের বহিষ্কৃত সাধারণ সম্পাদক মাহফুজুল হক তাই এবার দলের ‘সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিতদের’ নিয়ে ১৫টি ইউনিয়নেই চেয়ারম্যান প্রার্থী দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। তাঁর সঙ্গে আছেন, উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক কমিটির জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি আমির আজম রেজা ও জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি জাহিদুল ইসলাম রোমান। এতে ফরিদগঞ্জের ১৫টি ইউনিয়নেই আওয়ামী লীগের ‘বিদ্রোহী’ চেয়ারম্যান প্রার্থী থাকার মতো পরিস্থিতি দেখা দিয়েছে।

মন্তব্য