জমিদারবাড়ি ‘লুট’-333743 | প্রিয় দেশ | কালের কণ্ঠ | kalerkantho

kalerkantho

সোমবার । ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৬। ১১ আশ্বিন ১৪২৩ । ২৩ জিলহজ ১৪৩৭


জমিদারবাড়ি ‘লুট’

করটিয়া

অরণ্য ইমতিয়াজ, টাঙ্গাইল   

৯ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



জমিদারবাড়ি ‘লুট’

টাঙ্গাইলের করটিয়া জমিদারবাড়ির এই স্থানে ছিল জমিদারের লিচুবাগান। এখন সেখানে গড়ে উঠেছে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। ছবি : কালের কণ্ঠ

টাঙ্গাইলের করটিয়ায় ঐতিহাসিক স্থাপনা জমিদার ওয়াজেদ আলী খান পন্নীর বাড়ি ‘লুট’ হয়ে যাচ্ছে। এরই মধ্যে স্থাপনাটির বড় অংশ বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে। আরো জায়গা দখল ও বিক্রি করার প্রক্রিয়া চলছে। এ জন্য বাড়ির ব্রিটিশ আমলে তৈরি স্থাপনার অংশ সীমানা প্রাচীর ভাঙা হয়েছে। ২০১৩ সালের ওয়াকফ (সম্পত্তি হস্তান্তর ও উন্নয়ন) বিশেষ বিধান আইন এবং ১৯৬৮ সালের পুরাকীর্তি আইন অনুযায়ী এটা শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

গত শনিবার সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, করটিয়া জমিদারবাড়ির দক্ষিণ পাশে বাইরের প্রবেশপথে জমিদার আমলের দুটো পিলার এখনো রয়েছে। কিন্তু তার দুই পাশে সে আমলের দেয়ালের কোনো অংশ নেই। সেখানে গড়ে উঠেছে দোকান ও মার্কেট। বাইরের প্রবেশপথ থেকে ভেতরের প্রধান প্রবেশপথের মাঝখানের প্রায় সবটুকু জায়গায়জুড়ে কয়েকটি ভবনসহ বাড়িঘর, দোকান নির্মাণ করা হয়েছে। পশ্চিম পাশে বিপুল পরিমাণ জায়গায় বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানসহ বসতবাড়ি গড়ে উঠেছে। এর উত্তরে জমিদার আমলের লম্বা একটি দেয়াল রয়েছে (সীমানা প্রাচীর)। সেই দেয়ালের মাঝামাঝি অংশ ২০০৯ সালের মে মাসে দখলদাররা ভেঙে ফেলে। স্থানীয়দের আন্দোলনের পর সেখানে ফের দেয়াল তৈরি করা হয়। কিন্তু গত ২৬ ফেব্রুয়ারি রাতে ভেকু নিয়ে প্রভাবশালী মহল আবার সেই দেয়ালের তিনটি স্থানে ভেঙে ফেলে।

অভিযোগ রয়েছে, ওই দেয়ালের ভেতরে পূর্ব পাশে দখলদাররা উত্তর-দক্ষিণে একটি দেয়াল নির্মাণ করেছে। সেই জায়গা দখলের উদ্দেশ্যে গভীর রাতে জমিদারবাড়ির সীমানা প্রাচীর ভাঙা হয়েছে। পুরো জায়গার চারপাশ প্রায় ১২ ফুট উচ্চতাবিশিষ্ট সীমানা প্রাচীর দ্বারা বেষ্টিত ছিল। এর ভেতরে রয়েছে মোগল স্থাপত্যশৈলীর নিদর্শন রোকেয়া মহল। রয়েছে লোহার ঘর।

জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক শাহজাহান আনসারী জানান, স্বাধীনতার আগে থেকে জমিদারবাড়ির জায়গা কিছু কিছু করে দখল শুরু হয়। স্বাধীনতার পর থেকে দখলপ্রক্রিয়া ব্যাপকহারে বেড়ে যায়। প্রথমে টিনের ঘর তুলে ভাড়া দেওয়া হয়। পর্যায়ক্রমে সেখানে পাকা ঘর নির্মাণ করা হয় এবং সে জায়গা গোপনে বিক্রি করা হয়। স্থানীয় অন্তত বারোজন প্রভাবশালীর সঙ্গে যোগসাজশ করে মোতোয়ালি ওয়াজেদ আলী খান পন্নী দ্বিতীয় ওরফে বান্টিং পন্নী এসব অবৈধ কাজ করেন। এ কাজে সহযোগী হলেন তাঁর ব্যবস্থাপক সৈয়দ আবুল আজাদ। জমিদারবাড়ির দক্ষিণ ও পশ্চিম পাশের প্রায় পাঁচ একর জায়গা ইতিমধ্যে দখল হয়ে গেছে। জমিদারবাড়ির ভেতরে পশ্চিম পাশে প্রায় ৫০০ ফুট জায়গা দখলের উদ্দেশ্যে নতুন করে দেয়াল নির্মাণ করা হয়েছে।

করটিয়া ইউনিয়ন মুক্তিযোদ্ধা সংসদের ডেপুটি কমান্ডার হাবিবুর রহমান তালুকদার ও করটিয়া বাজার এলাকার মুক্তিযোদ্ধা সোলায়মান মিয়া জানান, জমিদারবাড়ির প্রায় ৩০০ শতাংশ জায়গায় লিচুবাগান ছিল। ১৯৭২-৭৩ সালের দিকে লিচুবাগানে দখল প্রক্রিয়া শুরু হয়। ক্রমে দোকান উঠতে থাকে। ৩০ বছরের মধ্যে সেই বাগানজুড়ে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। এখন সেখানে কোনো লিচুগাছ নেই। একটু জায়গাও দখল বাকি নেই। আওয়ামী লীগ নেতা শাহজাহান আনসারী সোহেল মাহমুদ মাসুদ বলেন, বান্টিং পন্নী জমিদারবাড়ির জায়গা পতিত দেখিয়ে লিজ নেন। অথচ জমিদারবাড়ির সীমানা প্রাচীরের জায়গা কী করে পতিত থাকে? তিনি এলাকার প্রভাবশালীদের নিয়ে সে জায়গা বিক্রি করেন। এ ছাড়া জমিদারবাড়ির রোকেয়া মহল একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে ভাড়া দেওয়া হয়েছে। এতে জমিদারবাড়ির ঐতিহ্য নষ্ট হচ্ছে।

ওই জমিদারবাড়ির জায়গা দখলের প্রতিবাদ ও দখলকৃত জায়গা পুনরুদ্ধারের দাবিতে ২০০৯ সালে করটিয়ায় গঠন করা হয় ইতিহাস ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ কমিটি। এই কমিটির আহ্বায়ক শামচুল আলম চৌধুরী কায়েস জানান, জমিদারবাড়ির জায়গা দখলের প্রতিবাদে আন্দোলন শুরু করলে অভিযুক্তরা ২০১২ সালের ১৭ জানুয়ারি তাঁদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা করে। পরে কমিটি এবং এলাকাবাসী সমবেতভাবে ২০১৪ সালের ১০ আগস্ট সংস্কৃতিমন্ত্রী বরাবর আবেদন করে। বিষয়টি বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সচিবকে নির্দেশ দেন মন্ত্রী। ওই নির্দেশের ভিত্তিতে জমিদারবাড়ি সংরক্ষণের ব্যাপারে টাঙ্গাইলের জেলা প্রশাসককে নির্দেশ দেওয়া হয়। ঐতিহাসিক স্থাপনা অক্ষুণ্ন রাখার বিষয়ে জেলা প্রশাসন জমিদারবাড়ির দেয়ালে নোটিশ টাঙায়। সেই নোটিশসহ গত ২৬ ফেব্রুয়ারি গভীর রাতে কিছু লোক যন্ত্র (ভেকু) দিয়ে জমিদারবাড়ির সীমানা প্রাচীরের তিনটি স্থান ভেঙে ফেলে।

এ বিষয়ে বান্টিং পন্নীর ছোট ভাই করটিয়া ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান মোর্শেদ আলী খান পন্নী বলেন, ‘জমিদারবাড়ির জায়গা পতিত দেখিয়ে ২৫টি দোকান করার অনুমতি আনা হয়েছে ওয়াকফ বোর্ড থেকে। অথচ সে জায়গা পতিত নয়। এর আগেও জমিদারবাড়ির বিপুল পরিমাণ জায়গা দখল করে বিক্রি করা হয়েছে।’

এ বিষয়ে কথা বলার জন্য মোতোয়ালি ওয়াজেদ আলী খান পন্নী (দ্বিতীয়) ওরফে বান্টিং পন্নীর সঙ্গে মুঠোফোনে একাধিকবার চেষ্টা করেও তাঁকে পাওয়া যায়নি। তাঁর সাবেক ব্যবস্থাপক ও আইন উপদেষ্টা সৈয়দ আবুল আজাদ বলেন, ‘করটিয়া জমিদারবাড়িটির উন্নয়নের জন্য সংস্কার করা দরকার। এ জন্য তহবিল নেই। তাই বাড়ির পাশে মার্কেট করা হবে। এ জন্য ওয়াকফ বোর্ড থেকে ২৫টি দোকান ও তিনটি গেট করার জন্য অনুমতি নেওয়া হয়েছে। উন্নয়নকে ব্যাহত করার জন্য কিছু লোক এ কাজে বাধা দিচ্ছে।’ গভীর রাতে দেয়াল ভেঙে গেট করা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘দিনে করলে ব্যস্ত রাস্তায় মানুষ ও যানবাহন চলাচলে সমস্যা হতো। এলাকার লোকজন বাধা দিতে এলে সংঘর্ষ বাধতে পারত। অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে রাতে এটি করা হয়েছিল।’ জমিদারবাড়ির জায়গা বিক্রি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এক ইঞ্চি জায়গাও বিক্রি করা হয়নি। বাইরের গেট থেকে ভেতরের গেটসহ আশপাশের দোকান ও বাড়ি ওয়াকফ এস্টেটের অধীনেই রয়েছে। সেখান থেকে ভাড়া নেওয়া হয়। যা করা হয়েছে সব আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই করা হয়েছে।’

এ বিষয়ে টাঙ্গাইলের জেলা প্রশাসক (ডিসি) মাহবুব হোসেন বলেন, ‘জমিদারবাড়ি রক্ষার জন্য সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় ও প্রত্নতত্ত্ব বিভাগে চিঠি দেওয়া হয়েছে।’

মন্তব্য