দুরন্ত সাহসী মনিকা-333349 | প্রিয় দেশ | কালের কণ্ঠ | kalerkantho

kalerkantho

বুধবার । ২৮ সেপ্টেম্বর ২০১৬। ১৩ আশ্বিন ১৪২৩ । ২৫ জিলহজ ১৪৩৭


আন্তর্জাতিক নারী দিবস আজ

দুরন্ত সাহসী মনিকা

৮ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



দুরন্ত সাহসী মনিকা

বাবা চাইতেন মেয়ে যেন কখনো নিজেকে শুধু নারী না ভাবে। মানুষের মতো মানুষ হবে। মাথা উঁচু করে সমাজে বাঁচবে। বাবার মুখে এসব কথা শুনে শৈশবেই সাহস লালন করতেন।

তিনি যখন বাগেরহাট মনমোহিনী বালিকা বিদ্যালয়ে ভর্তি হন, তখন বিদ্যালয়ে ছাত্রী নিবাসে মেয়েরা থাকার সাহস পেত না। তিনি প্রথম ছাত্রী নিবাসে ওঠার সময় এটি ছিল খালি। তার সাহস ও প্রেরণায় সে বছর নিবাসে একে একে ৩২ জন ছাত্রী এসে ওঠে। পরে সেই নিবাস আর কোন দিন শূন্য ছিল না।

সেদিনের সেই সাহসী মেয়েটি আজকের মনিকা মণ্ডল (৭০)। বর্তমানে তিনি পিরোজপুর জেলা মহিলা পরিষদের সভানেত্রী। গতকাল সোমবার এ প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা হয় তাঁর।

তিনি জানান, তাঁর জন্ম ১৯৪৬ সালে বাগেরহাটের রামপালে। ১৯৬২ সালে মেট্রিক পাস করেন। পরে খুলনা মহিলা কলেজ থেকে ১৯৬৪ সালে স্নাতক ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৬৮ সালে স্নাতকোত্তর করেন। খুলনা মহিলা কলেজে পড়া অবস্থায় তিনি ছাত্র ইউনিয়নে যোগ দেন। পরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মুন্নুজান ছাত্রী নিবাসে থাকা অবস্থায় ছাত্র ইউনিয়নের সক্রিয় কর্মী হন।

বাবা জনার্ধন মণ্ডল ছিলেন ইউপি চেয়ারম্যান। আর মা শেফালিকা মণ্ডল ছিলেন একজন গৃহিণী। পাঁচ ভাই-বোনদের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার ছোট। চার ভাই ও মা-বাবার আদরে শৈশবটা কেটেছে আনন্দে। স্নাতকোত্তর পাস করার পর ১৯৬৯ সালে পিরোজপুরের শিকারপুর উত্তরপাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয় সড়কের বাসিন্দা ডা. খিতিশ চন্দ্র মণ্ডলের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। পেশায় চিকিৎসক হলেও খিতিশ ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক। ১৯৭০ সালে তাঁদের প্রথম সন্তান সুব্রতর জন্ম হয়। ১৯৭১ সালে পিরোজপুরে পাকিস্তানি সেনা প্রবেশ করলে তিনি ভারতে চলে যান। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ফিরে আসেন পিরোজপুরে। তত দিনে খোয়া গেছে অনেক কিছু। কিন্তু ধৈর্যের সঙ্গে পরিস্থিতি সামলে নেন তাঁরা। ১৯৭২ সালে সমাজসেবা অধিদপ্তরে কর্মকর্তা হিসেবে যোগ দেন। ১৯৭০ সালে তাঁর স্বামী ডা. খিতিশ এমপি নির্বাচিত হন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মন্ত্রিসভার ত্রাণ ও পুনর্বাসন মন্ত্রণালয়ে প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান।

তিনি সক্রিয় রাজনীতিও করতেন। জেলা মহিলা আওয়ামী লীগের সহসভানেত্রী ছিলেন। জনগণ চাইলেও কোনো নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেননি। তাঁর কথা, ‘মানুষের কল্যাণে সব অবস্থায় থেকেই কাজ করা যায়।’ তিনি এ বছর মহিলা পরিষদ থেকে অবসর নিতে চেয়েছিলেন; কিন্তু পিরোজপুরের নারীসমাজ ও সংগঠনের সদস্যদের দাবির মুখে গত ২৭ ফেব্রুয়ারি জেলার সপ্তম সম্মেলনে তাঁকে পুনরায় সভানেত্রী ঘোষণা করা হয়।

এলাকার নারী নেত্রী হালিমা খাতুনের (সাবেক প্রধান শিক্ষিকা, করিমন্নেছা মাধ্যমিক বিদ্যালয়) হাত ধরে যুক্ত হন সমাজ সেবামূলক কাজে। অন্যায়, অত্যাচার, নারীর ওপর সহিংসতায় রাখেন ভূমিকা। যেসব মেয়েরা বিদ্যালয়ে টাকার অভাবে যেতে পারত না, তাদের আর্থিক সহযোগিতা দিতেন। স্বামীর সংসারে যে নারীরা নির্যাতিত হতো তাদের সমস্যার কথা জেনে সহযোগিতা করতেন। দুই ছেলে আমেরিকা ও মেয়ে ভারতে বাস করছেন। মনিকা মণ্ডল বলেন, ‘ঘর-সংসার আর এই জনপদের মানুষকে আপন করে নিয়েছি। এদের ছেড়ে আমরা কোথায় যাব?’

তাঁর সম্পর্কে পিরোজপুর পৌরসভার প্যানেল মেয়র মিনারা বেগম বলেন, ‘মনিকা মণ্ডল আমাদের আদর্শ। তাঁর কাছ থেকে হাজারও নারী সোজা হয়ে দাঁড়ানোর শিক্ষা পেয়েছে।’

জেলা মহিলা পরিষদের সহসভানেত্রী মাতোয়ারা বেগম টুলি বলেন, ‘আজ সংগঠনের নারী সদস্যসংখ্যা প্রায় ছয় হাজার। তাঁরা সবাই নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠায় কাজ করে যাচ্ছে। বৌদির (মনিকা) কারণেই এটা সম্ভব হয়েছে।’

মন্তব্য