kalerkantho

শনিবার । ৩ ডিসেম্বর ২০১৬। ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ২ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


আন্তর্জাতিক নারী দিবস আজ

বাল্যবিয়ের ‘যম’ মাহামুদা

৮ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



বাল্যবিয়ের ‘যম’ মাহামুদা

রাত তখন ১১টা। রাতের খাবার খাচ্ছি।

ঠিক তখন মোবাইল ফোন বেজে উঠল। এত রাতে কে ফোন করল? অনেকটা বিরক্ত হয়ে ফোনটা ধরলাম।

ওপাশ থেকে পরিচিত কণ্ঠ মাহামুদা আক্তার কণার, ‘তাড়াতাড়ি থানায় চলে এসো। একটি বাল্যবিয়ে বন্ধের জন্য চেষ্টা চলছে। ’ কোনো রকম খেয়ে থানায় গেলাম। দেখি বর, বরের বাবাসহ স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি বসে আছেন। বাল্যবিয়ে যাতে বন্ধ না হয়, সে জন্য ওই প্রভাবশালীরা বারবার অনুরোধ করছেন। একপর্যায় প্রভাবশালীরা উত্তেজিত হয়ে গেলেন।

মাহামুদা তাঁর অবস্থান থেকে একটুও নড়লেন না। একজন নারী ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে বর ও বরের বাবাকে তিন মাসের কারাদণ্ড দিলেন। এটা গত বছরের ঘটনা। এর কিছুদিন পর ১ নম্বর শকুনী এলাকায় একটি বাল্যবিয়ের খবর পেয়ে সেই বিয়েও বন্ধ করে জরিমানা করলেন। মাহামুদা বর্তমানে মাদারীপুর জেলা মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তরের অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা। এর আগে তিনি পটুয়াখালী, ফরিদপুরের ভাঙ্গা, মাদারীপুরের শিবচর, রাজৈর উপজেলাসহ বিভিন্ন জায়গায় কর্মরত ছিলেন। চাকরিজীবনে তিনি প্রায় ৬০০ বাল্যবিয়ে বন্ধ করেছেন।

মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তর সূত্র জানায়, চেনা নেই, জানা নেই যে কেউ ফোন করে বা অফিসে গিয়ে বাল্যবিয়ের তথ্য দিলে তাঁর কোনো ক্লান্তি নেই। সরাসরি কিংবা অফিসের লোক পাঠিয়ে বন্ধ করে দেন সেই বিয়ে। অনেক সময় নানা ধরনের হুমকি, ভয়ভীতি দেখানো হলেও দমে যাননি। প্রভাবশালীদের চাপের মুখেও তিনি বন্ধ করেন বাল্যবিয়ে। সমাজ থেকে বাল্যবিয়ে বন্ধ করাই তাঁর একমাত্র লক্ষ্য।

মাদারীপুর সদর উপজেলার শিরখাড়ার ইলিয়াস হোসেন বাদলের সঙ্গে প্রায় ২৬ বছর আগে বিয়ে হয় মাহামুদার। বাবার বাড়ি রাজৈরের ইশিবপুর সাতবাড়িয়ায়। বাবা সিরাজুল হক মিয়া। বাবা ছিলেন মাদারীপুরের এ আর হাওলাদার জুট মিলের ব্যবস্থাপক। শহরের আচমত আলী খান সড়কের একটি ভাড়া বাসায় থাকেন মাহামুদা। বড় মেয়ে নাজিয়া সুলতানা পানী বর্তমানে নর্থসাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্কিটেকচারে তৃতীয় বর্ষে আছেন। পড়াশোনার পাশাপাশি পানী একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেলে সংবাদ উপস্থাপক হিসেবে কাজ করছেন। মেজ ছেলে নুরুস সাবা রাবিক কলেজে পড়ে ও ছোট ছেলে নুরস সাব্বির দশম শ্রেণিতে পড়ে।

স্বামী ব্যবসার কাজে সারা দিন ব্যস্ত থাকেন। কাজের সুবাদে মাহামুদাও সারা দিন ব্যস্ত থাকেন। ছেলেমেয়েদের তেমন সময় দিতে পারেন না। স্বামীকেও না। তাই তাদের অভিযোগের শেষ নেই। তবুও তিনি সংসার জীবনের সুখ-শান্তি-অভিযোগকে উপেক্ষা করে দীর্ঘদিন ধরে সমাজের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন। বিশেষ করে সমাজের অবহেলিত ও নির্যাতিত নারীদের নিয়ে। তবে তিনি সবচেয়ে বেশি কাজ করেছেন বাল্যবিয়ে বন্ধে।

মাহামুদার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ‘প্রায় ৬০০ বাল্যবিয়ে বন্ধ ছাড়াও বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে প্রায় ৫০০ নারীকে সালিস-মীমাংসার মাধ্যমে সুস্থ জীবন দিয়েছেন। অর্ধশতাধিক নিপীড়নকারীকে পুলিশের মাধ্যমে শাস্তির ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। তাঁর এই পথচলায় মাদারীপুরের অনেক নারী আজ উদ্বুদ্ধ। তাঁকে দেখে অনেকে নারী নির্যাতন বন্ধের ব্যাপারে এগিয়ে এসেছেন। স্বেচ্ছায় কাজ করছেন বাল্যবিয়ে বন্ধের জন্য।

এ বিষয়ে মাহামুদা আক্তার কণা বলেন, ‘চাকরির সুবাদে মাদারীপুর জেলায় কাজ করছি। তাই বর্তমানে মাদারীপুর জেলার বাল্যবিয়ে বন্ধের জন্য কাজ করে যাচ্ছি। বাল্যবিয়ে বন্ধের জন্য এ জেলাকে দেশের মধ্যে শ্রেষ্ঠ স্থানে নিতে চাই। বাল্যবিয়ে বন্ধে অন্য নারীদেরও এগিয়ে আসা উচিত। দেশ থেকে পুরাপুরিভাবে বাল্যবিয়ে বন্ধ করতে হবে। ’


মন্তব্য