জুয়ায় বুঁদ শ্রীপুর-333113 | প্রিয় দেশ | কালের কণ্ঠ | kalerkantho

kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২৯ সেপ্টেম্বর ২০১৬। ১৪ আশ্বিন ১৪২৩ । ২৬ জিলহজ ১৪৩৭


জুয়ায় বুঁদ শ্রীপুর

শাহীন আকন্দ, গাজীপুর   

৭ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



গাজীপুরের শ্রীপুর পৌর শহরের কেওয়ায় চলছে কোটি টাকার অবৈধ জুয়া বাণিজ্য। এ ছাড়া র‌্যাফেল ড্রর নামে চলছে প্রতারণা ও রগড় নৃত্যসহ নানা অনৈতিক কর্মকাণ্ড। অভিযোগ পাওয়া গেছে, পুলিশ ও স্থানীয় সরকারদলীয় নেতাদের টাকা দিয়ে রাতভর চলে ওই সব কর্মকাণ্ড।

একাধিক সূত্রে জানা গেছে, পৌর এলাকার ৬ নম্বর ওয়ার্ডের কেওয়া গ্রামে প্রায় সাত বিঘা জমি ভাড়া নিয়ে জুয়া মেলার আয়োজন করা হয়েছে। জমির মালিক ওই গ্রামের আবুল কালাম, আবদুস শাহিদ, আসাদুল ইসলাম, আনোয়ার হোসেনসহ ৯ জন। প্রত্যেক মালিককে প্রতি রাতে ভাড়া দেওয়া হয় তিন হাজার টাকা করে। জুয়া মেলার পরিচালক সেলিম হোসেন বলেন, ‘পুলিশসহ বিভিন্নজনকে প্রতিরাতে পাঁচ লাখ টাকা দিয়ে জুয়া মেলা চালাচ্ছি। মেলার আয়োজক স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা আবদুর রশিদ ও সাইফুল ইসলাম।’

গ্রামবাসী জানায়, পৌর এলাকাজুড়ে মাইকিং করে দিনভর র‌্যাফেল ড্রর টিকিট বিক্রি করা হয়। শ্রীপুর রেলওয়ে স্টেশন, স্টেশন রোড এলাকার নূরুল ইসলাম খান মার্কেট, সাবরেজিস্ট্রি অফিস, লোহাগাছ ফালু মার্কেট, কেওয়াবাজার, ভাংনাহাটি, বৈরাগীরচালা, আনসার রোড মোড় ও ২ নম্বর সিঅ্যান্ডবি এলাকাসহ ২৫ থেকে ৩০টি স্পটে টিকিট বিক্রি করা হয়। টিকিট বিক্রির সময় মাইকের শব্দে অতিষ্ঠ হয়ে পড়ে মানুষজন। আশপাশের বিদ্যালয়গুলোতেও পাঠদানে বিঘ্ন ঘটে।

গত শনিবার রাত ৯টায় গিয়ে দেখা যায়, কেওয়াবাজারের দক্ষিণ পাশে মুক্তিযোদ্ধা সিরাজুল ইসলাম সড়কের পূর্ব পাশে বিশাল প্যান্ডেল। সড়কের পশ্চিম পাশে নিক্কি থাই অ্যালুমিনিয়াম কারখানা। প্যান্ডেল থেকে প্রায় ২০০ গজ দূরে গ্রামের মসজিদ। প্যান্ডেলের ভেতর ঢুকতেই চোখে পড়ে র‌্যাফেল ড্রর ঘোষণা মঞ্চ। বাঁ পাশে ওয়ানটেন, ডাব্বো ও জামাই-বউসহ হরেক জুয়ার ১৩টি স্টল। সব স্টলে উপচে পড়া ভিড়। ডান পাশে রঙিন কাপড় দিয়ে ঘেরা হাউজি খেলার ঘর। মেলায় আসা কয়েকজন জানান, হাউজির পর এ ঘরে শুরু হয় নগ্ন নৃত্য।

জুয়ার স্টল ঘুরে দেখা গেল, খেলায় অংশ নেওয়া বেশির ভাগই তরুণ। টাকা দ্বিগুণ করার প্রলোভনে পড়ে তারা জুয়ার বোর্ডে টাকা রেখে সর্বস্বান্ত হচ্ছে। পাশের ভাংনাহাটি (কাইচ্চাগড়) এলাকার তরুণ কবির হোসেন জানান, মেলা শুরু হওয়ার পর থেকে প্রতিদিনই তিনি জুয়া খেলায় অংশ নিচ্ছেন। প্রথম দিন দুই হাজার ৩০০ টাকা লাভ হয়েছে। পরের ছয় দিনে প্রায় ৪১ হাজার টাকা খুইয়েছেন। ওই ছয় দিনে প্রতিদিন তিনি সর্বস্ব খুইয়ে জুয়া মেলায় আসবেন না বলে পণ করলেও ‘ভাগ্য খুলতে’ পারে ভেবে ফের এসেছেন।

ডাব্বো স্টলের সামনে এক বিষণ্ন তরুণের দেখা মেলে। প্রায় ২০ মিনিট ধরে তাঁর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাঁর বাড়ি পাশের উজিলাব গ্রামে। স্থানীয় একটি কলেজের স্নাতক (সম্মান) প্রথম বর্ষের ছাত্র তিনি। পরিচয় গোপন রাখার শর্তে তিনি জানান, নতুন প্যান্ট কেনার কথা বলে তাঁর বাবার কাছ থেকে দুই হাজার ৫০০ টাকা নিয়ে গত বুধবার জুয়া খেলে সব টাকা খোয়ান। পরদিন মিথ্যা বলে তাঁর মায়ের কাছ থেকে ৭০০ টাকা নিয়ে জুয়া খেলে হারান। পরে গত শুক্রবার আলমারি থেকে মায়ের রাখা তিন হাজার ৫০০ টাকা চুরি করে জুয়া খেলে হেরে গিয়ে আর বাড়ি ফেরেননি। রাত কাটিয়েছেন সহপাঠীর বাসায়। ওই তরুণ আরো জানান, সহপাঠীর কাছ থেকে ১০০ টাকা ধার করে তা খুইয়ে হতাশ হয়ে খেলা দেখছিলেন। তিনি আশঙ্কা করছেন, বাড়ি ফিরলে মা তাঁকে মারধর করবেন। এর পরও তিনি রাতে বাড়ি ফিরবেন। তবে সহপাঠীদের সহযোগিতায় একটি নাটক সাজিয়ে মা-বাবার কাছে ‘নির্দোষ’ থাকার উপায় খুঁজছেন।

ওই তরুণের সঙ্গে কথা বলার একপর্যায়ে দেখা গেল, মাত্র ১০ থেকে ১২ বছর বয়সের কয়েকজন শিশু বিভিন্ন স্টলে জুয়া খেলছে। শিশুদের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টাকালে টের পেয়ে মেলা পরিচালক সেলিম হোসেনসহ স্থানীয় ছাত্রলীগ ও যুবলীগ কর্মীরা তাদের সরিয়ে দেয়। ছবি তুলতে গেলে মেলার পরিচালক সেলিম হোসেনের নেতৃত্বে সাত থেকে আটজন অজ্ঞাতপরিচয় তরুণ এ প্রতিবেদকের ক্যামেরা কেড়ে নেয়। প্রতিবেদকের সামনে সেলিম ছবি মুছে ক্যামেরা ফেরত দিয়ে বলেন, ‘মেলার কোনো ছবি তুলবেন না।’ এ সময় এগিয়ে এসে ৬ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মোমতাজুল ইসলাম বলেন, ‘ভাই, আমি এসব জুয়া খেলার পক্ষে না। অনেক চেষ্টা করেছি, আমার সঙ্গে কাউকে পাইনি। ছবি তুলে কী হবে?’ এরপর প্রায় দেড় ঘণ্টা সেখানে অবস্থানকালে পুরো সময়ই পিছু লেগে থাকে অজ্ঞাতপরিচয় তরুণরা। ফেরার পথে ওই গ্রামের কলেজ ছাত্র জুয়েল রানা অভিযোগ করেন, ‘যারা এই জুয়ার আয়োজন করেছে, তারা সবাই অনেক প্রভাবশালী। গ্রামের কেউ প্রতিবাদ করলে তাকে গ্রাম ছেড়ে চলে যেতে হবে।’

৬ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ও ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি কামরুজ্জামান কামাল বলেন, ‘আমি ওই মেলায় জড়িত না। এর পরও নিজের দলের যারা মেলার আয়োজন করেছে, তাদের নিষেধ করেছিলাম। তারা মানেনি।’ শ্রীপুর মডেল থানার দ্বিতীয় শীর্ষ কর্মকর্তা উপপরিদর্শক (এসআই) হেলাল উদ্দিন বলেন, ‘কেওয়া গ্রামে কিভাবে ওই মেলা চলছে আমার জানা নেই। মেলার আয়োজকদেরও আমি চিনি না।’

শ্রীপুর মডেল থানার ওসি আসাদুজ্জামান বলেন, ‘গত শনিবার গভীর রাতে পুলিশ গিয়ে ওই মেলা বন্ধ করে দিয়েছে। এর পরও মেলা চালালে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

মন্তব্য