kalerkantho

রবিবার । ১১ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ১০ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


পাহাড়ি পথে ভয়ংকর স্কুলযাত্রা

আবু দাউদ, খাগড়াছড়ি   

৭ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



পাহাড়ি পথে ভয়ংকর স্কুলযাত্রা

ছাত্রীদের বাসের দরজায় আর ছাত্রদের ছাদে উঠতে প্রতিদিন চলে অন্য রকম প্রতিযোগিতা। ছবি : কালের কণ্ঠ

নয়নবালা ত্রিপুরা (১৫) : খাগড়াছড়ি আদর্শ হাই স্কুলের অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী। বিদ্যালয় থেকে প্রায় আট কিলোমিটার দূরে তার বাড়ি।

এই সড়কপথ পার হওয়ার পর প্রায় এক ঘণ্টা পাহাড়ি টিলা পেরিয়ে বাড়িতে পৌঁছাতে হয়। তার জুমিয়া বাবা কল্পরঞ্জন ত্রিপুরা প্রতিদিন গাড়ি ভাড়া দিতে পারেন না। এ কারণে মাঝেমধ্যে তার বিদ্যালয়ে আসা হয় না। নয়নবালা বলে, ‘প্রতিদিন ভোরে ঘুম থেকে উঠি। ক্লাস শুরু হয় সকাল ১০টায়। যেদিন গাড়ি ভাড়ার টাকা থাকে, সকাল ৭টার আগেই প্রস্তুতি নিয়ে সড়কে এসে দাঁড়িয়ে থাকি। কিন্তু গাড়িতে অনেক সময় দাঁড়ানোর জায়গাও থাকে না। ’

রবিরাম ত্রিপুরা (১৪) : একই বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির ছাত্র। তার বাড়ি গুলছড়ি। সেখান থেকে পাহাড়ি পথে হেঁটে প্রধান সড়কের সাত মাইল নামক এলাকায় পৌঁছাতে সময় লাগে প্রায় সোয়া ঘণ্টা। রবিরাম বলে, ‘সকাল ৭টার আগেই রওনা দিতে হয়। সময়মতো গাড়ি না পেলে দুর্ভোগের সীমা থাকে না। সাত-আট টাকা ভাড়ায় বাস ও ১০-১৫ টাকায় জিপ পেলেও ঝুঁকি থেকেই যায়। বাসে বা জিপে ভেতরে বসার সুযোগ নেই। বাসের ছাদে বা জিপে ঝুলে আসতে হয় স্কুলে। ’

মঞ্জুলিকা ত্রিপুরা (১৫) : খাগড়াছড়ি আদর্শ হাই স্কুলের অষ্টম শ্রেণির মেধাবী ছাত্রী সে। খাগড়াছড়ি-দীঘিনালা সড়কের আট মাইল নামক এলাকার আরো ভেতরের দুর্গম পাহাড়ি গ্রাম থেকে আসতে হয় তাকে। মঞ্জুলিকা বলে, ‘সকাল ৭টার মধ্যেই ঘর ছাড়তে হয়। এমনও দিন যায়, গাড়িতে উঠতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়। বাস, না হয় খোলা জিপে (চাঁদের গাড়ি) অত্যন্ত ঝুঁকি নিয়ে উঠতে হয়। অধিকাংশ সময় বাদুড় ঝোলা করেই আসা-যাওয়া করি। ’

শুধু এই তিনজন না, এ গল্প খাগড়াছড়ির পাহাড়ি এলাকার অধিকাংশ শিশু শিক্ষার্থীর। গত শনিবার দুপুরের পর শহরতলির ওই বিদ্যালয়ে গেলে কথা হয় তাদের সঙ্গে। বিকেল ঠিক ৪টা ১০ মিনিটে বিদ্যালয় ছুটির পর দেখা যায়, শিক্ষার্থীরা বাস বা জিপের জন্য সড়কে অপেক্ষা করছে। ৪০ মিনিট পর একটা বাস এলে হুড়োহুড়ি করে তাতে ওঠার চেষ্টা করছে। বাসে আগে থেকেই আসন ভর্তি ছিল। তাই ছেলেরা বাসের ছাদে এবং মেয়েরা বাসের ভেতর গাদাগাদি করে ঝুলে বাড়ির পথে রওনা হয়।

শিক্ষা অফিসের তথ্য মতে, জেলায় সব মিলিয়ে শতাধিক বিদ্যালয় রয়েছে। এর মধ্যে ২০টির মতো জেলা শহর বা সদর উপজেলার মধ্যে। কিন্তু দীঘিনালা থেকে খাগড়াছড়ি সদর পর্যন্ত ১৮ কিলোমিটারের মধ্যে উচ্চ বিদ্যালয় নেই একটিও। এই বিস্তীর্ণ এলাকার ছাত্রছাত্রীরা দীঘিনালা বা খাগড়াছড়ি সদরের বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে। অপেক্ষাকৃত দরিদ্র পরিবারের এসব শিশু নির্দিষ্ট যানবাহনের অভাবে নিয়মিত সংকটে পড়ে। প্রতিদিন গাড়ি ভাড়ায় বিদ্যালয়ে যাওয়া জুমিয়া পরিবারের বহু শিক্ষার্থীর পক্ষে সম্ভব হয় না। কম টাকায় শিক্ষার্থীদের গাড়িতেও তুলতে চায় না পরিবহন শ্রমিকরা। ফলে তারা বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত থাকে। অনেক সময় বিলম্বে বিদ্যালয়ে পৌঁছানোর কারণে পড়াশোনা ব্যাহত হয়। এ ছাড়া যানবাহনগুলো ছাত্রছাত্রীদের গাড়িতে তুললেও ছাদে অথবা জিপে বাদুড় ঝোলা অবস্থায় ঝুঁকিতে আসতে বাধ্য করে। দীঘিনালার নয় মাইল থেকে চার মাইল পর্যন্ত গোটা এলাকা হতে এমন প্রায় ২০০ শিক্ষার্থী প্রতিদিন পড়তে আসে খাগড়াছড়ি আদর্শ হাই স্কুলে। কেবল দীঘিনালা নয়, পানছড়ি ও মহালছড়ি সড়কের বিস্তীর্ণ এলাকার ছাত্রছাত্রীদের একই সংকট। ফলে ওই তিন সড়কে পৃথক তিনটি স্কুল বাস চালুর দাবি উঠেছে। মুনিগ্রাম হাই স্কুলের অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী শিউলি চাকমা ও ছাত্র অভিচরণ ত্রিপুরা বলে, ‘অনেক সময় আমাদের গাড়িতে তুলতে চায় না। তুললেও ছাদে বা জিপের বাম্পারে ঝুলে আসতে বাধ্য করে। ’ একই স্কুলের এসএসসি পরীক্ষার্থী চয়ন বিকাশ ত্রিপুরা বলে, ‘খুবই ভয় লাগে। কখনো কখনো পা পিছলে দুর্ঘটনায় পড়েছি। ’

মুনিগ্রাম স্কুলের সহকারী শিক্ষক শ্যামল মিত্র চাকমা বলেন, ‘আসা-যাওয়ার ক্ষেত্রে শিশু শিক্ষার্থীদের চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়। তাদের দুঃখ ঘোচাতে অনেক কর্তৃপক্ষ থাকলেও কেউ এগিয়ে আসে না। ’

আদর্শ হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক অংপ্রু মারমা বলেন, ‘প্রায় ৩০০ শিক্ষার্থীকে এভাবে ঝুঁকি নিয়ে প্রতিদিন যাতায়াত করতে হয়। এ ছাড়া সেই ভোরে খেয়ে আসার পর সারা দিন খালি পেটেই কাটায় এসব শিশু। যেখানে মাসিক ন্যূনতম বেতন দিতেই এসব দরিদ্র পরিবারের খুব কষ্ট, সেখানে টিফিনের টাকা নিয়ে তার ব্যবস্থা করাও কঠিন। তবে স্কুল ফিডিংয়ের ব্যবস্থা করা গেলে ভালো হতো। ’ তিনি আরো বলেন, ‘ছেলেমেয়েরা প্রতিদিন বিভিন্ন যানবাহনে খুবই ঝুঁকি নিয়ে স্কুলে আসে। বাদুড় ঝোলা হয়ে বা ছাদে যাতায়াত করায় আমরাও চিন্তিত থাকি; কোনো দুর্ঘটনা ঘটে কি না। সম্প্রতি দীঘিনালা সড়কে অবরোধকারীদের ধাওয়ায় ট্রাক থেকে দ্রুত নামার সময় এক ছাত্র নিহত হয়েছে। এ ছাড়া প্রতিনিয়ত দু-একটা দুর্ঘটনা ঘটেছে। ’

মুনিগ্রাম হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক উজ্জ্বল চাকমা বলেন, ‘এই স্কুলের ৪০০ শিক্ষার্থীর মধ্যে শতাধিক অন্তত ১২-১৪ কিলোমিটার দূর থেকে আসে। এমন বিপজ্জনকভাবে আসে যে সব সময় ভয়ে তটস্থ থাকি। তাদের জন্য বাসের ব্যবস্থা করা দরকার। ’

এ বিষয়ে জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা নির্মল কুমার চাকমা বলেন, ‘দূরের শিক্ষার্থীদের পরিবহন সমস্যার কথা আমরা জানি। তবে স্কুল বাস চালুর বিষয়ে কোনো অগ্রগতি জানা নেই। ’

সম্প্রতি পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি অনুযায়ী মাধ্যমিক শিক্ষা বিভাগ পার্বত্য জেলা পরিষদের কাছে হস্তান্তরিত হয়েছে। স্বশাসিত এই প্রতিষ্ঠানটির প্রধান কর্তাব্যক্তি পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান কংজরী চৌধুরী। তিনি বিদ্যালয়ে যাতায়াতে শিশুদের দুর্ভোগের কথা স্বীকার করে বলেন, ‘প্রাথমিক পর্যায়ে দীঘিনালা ও পানছড়ি সড়কে দুটি স্কুল বাস চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। বিষয়টি সরকারের উচ্চ পর্যায়ে প্রস্তাবনা আকারে পাঠানো হয়েছে। ’


মন্তব্য