খাল ভরে মার্কেট কারখানা বাড়ি-332721 | প্রিয় দেশ | কালের কণ্ঠ | kalerkantho

kalerkantho

রবিবার । ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৬। ১০ আশ্বিন ১৪২৩ । ২২ জিলহজ ১৪৩৭


খাল ভরে মার্কেট কারখানা বাড়ি

সোনারগাঁ

আসাদুজ্জামান নূর, সোনারগাঁ (নারায়ণগঞ্জ)   

৬ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



খাল ভরে মার্কেট কারখানা বাড়ি

সোনারগাঁর ট্রিপরদী এলাকায় খাল দখল করে ভরাট করছেন প্রভাবশালীরা। ছবি : কালের কণ্ঠ

‘এই খাল দিয়া বড় বড় নাও (নৌকা) চলত। খালে কত মাছ ধরতাম, গোসল করতাম! এহন এই খাল দহল (দখল) কইরা বড় বড় বাড়ি বানাইয়া ফালাইছে।’ নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ উপজেলার পঙ্খিরাজ খালের দিকে তাকিয়ে ক্ষোভের সঙ্গে এসব কথা বলেন পানাম গ্রামের বৃদ্ধ কাবিলউদ্দিন মিয়া।

পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো জানায়, দখল-দূষণে হারিয়ে যাচ্ছে সোনারগাঁর খালগুলোর অস্তিত্ব। খালগুলো রক্ষা করতে না পারলে জীববৈচিত্র্যও সংরক্ষণ করা যাবে না। জলাবদ্ধতায় দুর্ভোগ পোহাতে হবে এলাকাবাসীকে।

সরেজমিনে গিয়ে জানা যায়, উপজেলার বিভিন্ন স্থানে খালগুলো দখল ও বালুভরাট করে গড়ে তোলা হয়েছে পাকা বাড়ি, মার্কেট ও শিল্প-কারখানা। খাল পরিণত হয়েছে নালায়। ফলে একটু বৃষ্টি হলেই সোনারগাঁ পৌরসভা, কাঁচপুর শিল্পাঞ্চল ও মোগড়াপাড়া চৌরাস্তা এলাকায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। দুর্ভোগ পোহাতে হয় স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী ও এলাকাবাসীকে। তা ছাড়া বিভিন্ন কম্পানির বিষাক্ত তরল পদার্থ ফেলায় খালের পানি গোসল ও কৃষিজমিতে ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছে ছোট শিশুসহ অনেকে।

সোনারগাঁ পৌরসভার মেয়র সাদেকুর রহমান পৌরসভা এলাকায় মুসীরাইল খাল ভরাট করে পৌর মার্কেট নির্মাণ করেছেন। তবে জেলা প্রশাসনের অনুমতি নিয়েই মার্কেট গড়া হয়েছে বলে দাবি মেয়রের। পানাম এলাকায় পঙ্খিরাজ খাল দখল করে সোনারগাঁ যুবসংঘ ক্লাব, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও বহুতল ভবন তুলেছেন স্থানীয় প্রভাবশালীরা। শাহাপুর এলাকায় মেঘনা নদীর সংযোগ খালে সাবেক কাউন্সিলর হারুন-অর-রশিদ ফালান ও আজিজুল্লাহ নামে এক ব্যক্তি বাড়ি বানিয়েছেন। চৌদানা মৌজায় শত বছরের পুরনো খাল ভরাট করে ব্যক্তিগত পাকা রাস্তা নির্মাণ করেছেন যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা দেলোয়ার হোসেন। নজরুল ইসলাম হাতখোপা এলাকায় মিরিখালী খালে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, উদ্ভবগঞ্জ এলাকায় মেনিখালী খালে আলাউদ্দিন করাতকল (স মিল) ও মার্কেট তুলেছেন। কাঁঠালিয়াপাড়া খাল দখল করে ঝাউচর ও হাড়িয়া এলাকায় মেঘনা গ্রুপ, সাদীপুর এলাকায় কনফিডেন্স কম্পানি সীমানাপ্রাচীর তুলেছে। তবে জমি লিজ নিয়েই সীমানাপ্রাচীর তোলা হয়েছে বলে দাবি করেন এসব শিল্প-কারখানার মালিকরা। উদ্ভবগঞ্জ এলাকায় জয়রামপুর খালে মহিলা সমিতির নামে ভবন তুলেছেন সাবেক মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান কোহিনুর ইসলাম রুমা ও সোনারগাঁ পৌরসভার কাউন্সিলর জায়েদা আক্তার মণি। একই এলাকায় খাল ভরাট করে মার্কেট বানিয়েছেন জসীমউদ্দীন ভূইয়া দুলাল।

সোনারগাঁ পৌরসভার সাবেক কমিশনার শহিদ মিয়া জানান, উপজেলার প্রতিটি এলাকায় খাল সুরক্ষিত ছিল। নৌকাযোগে খালগুলো দিয়ে যাতায়াত করা যেত। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে খালগুলোতে ঘরবাড়ি, মার্কেট ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান তুলেছেন প্রভাবশালী ব্যক্তিরা। কোথায় খাল ছিল তার অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায় না। খালগুলো উদ্ধারে উদ্যোগ নিতে প্রশাসনের কাছে দাবি জানান তিনি।

কাঁচপুর এলাকার ব্যবসায়ী আবুল খায়ের জানান, উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় প্রায় ১৫০ কিলোমিটার খাল দখলে নিয়েছে প্রভাবশালীরা। এগুলো উদ্ধার করা না গেলে জলাবদ্ধতাসহ বিভিন্ন দুর্ভোগ পোহাতে হবে সাধারণ মানুষকে।

খালে যাচ্ছে বর্জ্য : ট্রিপরদী এলাকায় চৈতি কম্পোজিট ও সাদীপুর এলাকায় কনফিডেন্স কারখানার বর্জ্য ট্রিপরদী খালে ফেলায় পানি নষ্ট হয়ে গেছে। দুর্গন্ধযুক্ত এ পানিতে রোগাক্রান্ত হয়েছে অনেকে। কারখানার আশপাশের ২০ গ্রামের প্রায় ১৫ হাজার মানুষকে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। অনাবাদি হওয়ার উপক্রম হয়েছে কয়েক শ বিঘা জমি। সোনারগাঁ পৌরসভার বাসিন্দা ইমাম হোসেন ও আক্কাস আলীর অভিযোগ, কারখানার বিষাক্ত পদার্থ ও বর্জ্যের কারণে পৌর এলাকা ও মোগড়াপাড়া ইউনিয়নের কয়েক শ বিঘা জমিতে ভালো ফসল হয় না। কৃষকরা প্রতিবাদ করলে তাদের মামলা দিয়ে হয়রানি করা হয়।

পিরোজপুর এলাকার তাজুল ইসলাম মোল্লা জানান, মিরিখালী খালের পানি একসময় গোসল, রান্নাসহ সব কাজে ব্যবহার হতো। বর্জ্যের কারণে এখন পানি নষ্ট হয়ে গেছে। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আশেক আলী জানান, শিল্প-কারখানার বর্জ্যে ফসলি জমির মারাত্মক ক্ষতি হয়; বিভিন্ন কঠিন রোগে আক্রান্ত হতে পারে মানুষ। সোনারগাঁ নাগরিক কমিটির সভাপতি ও পরিবেশ আন্দোলনের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য এ টি এম কামাল বলেন, শিল্প-কারখানার মালিক ও প্রভাবশালী ব্যক্তিরা খালগুলো গিলে খাচ্ছে। ফলে সামান্য বৃষ্টি হলেই রাস্তাঘাট, ঘরবাড়ি পানিতে তলিয়ে যায়। খালগুলো দখলমুক্ত করতে এলাকাবাসীকে নিয়ে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়ে তোলা হবে। কাঁচপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ফজলুল হক বলেন, প্রতিযোগিতার মাধ্যমে খালগুলো দখল হচ্ছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে আগামী কয়েক বছরে খালের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যাবে না। তাই খালগুলো দখলমুক্ত করতে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেন তিনি।

সোনারগাঁ উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) এস এম জাকারিয়া বলেন, খাল দখল ও দূষণকারীদের তালিকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে। সিদ্ধান্ত হলেই তাদের উচ্ছেদ করা হবে। জেলা প্রশাসক আনিছুর রহমান মিঞা বলেন, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে স্থানীয় প্রশাসনকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সোনারগাঁর ইউএনও আবু নাছের ভূঞা জানান, দীর্ঘদিনে খালগুলো দখল হয়েছে। দখলদারদের উচ্ছেদে শিগগিরই অভিযান চালানো হবে। বর্জ্য ফেলার ব্যাপারে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মালিকদের নিয়মনীতি মেনে চলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

নারায়ণগঞ্জ-৩ সোনারগাঁ আসনের সংসদ সদস্য লিয়াকত হোসেন খোকা কালের কণ্ঠকে বলেন, খাল দখলের যেন প্রতিযোগিতা চলছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে কয়েক বছর পর কোনো খালের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যাবে না। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে প্রশাসনকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

মন্তব্য