kalerkantho

শনিবার । ১০ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৯ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


সরকারি বিদ্যালয়ে কোচিং ব্যবসা

ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি   

৫ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



ঠাকুরগাঁওয়ে সরকারি বিদ্যালয়ে ভর্তির নিশ্চয়তা দিয়ে শিক্ষার্থীদের নিজ কোচিংয়ে পড়তে উৎসাহিত করছেন সরকারি বিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষক। নিজ বিদ্যালয়েই তাঁরা খুলে বসেছেন কোচিং বাণিজ্য! বাইরে দরজায় তালা মেরে ভেতরে চলে কোচিং।

এমন চিত্র দেখা গেল ঠাকুরগাঁও সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে। তবে এ বিষয়ে জানেন না বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক।

প্রতিযোগিতার যুগে সন্তানদের যোগ্য করে তুলতে ঠাকুরগাঁও জেলার প্রাথমিক বিদ্যালয় পর্যায়ের শিশুর অভিভাবকরা বছরের প্রতিটি দিনই ব্যস্ত থাকেন কোচিং ও প্রাইভেট টিউশন নিয়ে। প্রত্যাশা সন্তানকে সরকারি বিদ্যালয়ে ভর্তি করানো। এ সুযোগে অনেক শিক্ষক সরকারি বিদ্যালয়েই অবৈধভাবে কোচিং বাণিজ্য খুলে বসেছেন।

নীতিমালা না থাকায় ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে উঠেছে শতাধিক কোচিং সেন্টার। এর প্রভাব পড়েছে প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে। সরকারি বিদ্যালয়ে ভর্তি প্রতিযোগিতায় টিকতে অভিভাবকরা সন্তানদের বিভিন্ন কোচিংয়ে ভর্তি করছেন। ফলে বিদ্যালয়গুলো শিক্ষার্থীশূন্য হয়ে পড়ছে।

সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের কোচিংয়ে পড়তে আসা দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্র ফারহান তারেক সিজান জানায়, সে জেলার পিটিআই স্কুলে পড়ে। কিন্তু স্কুলে যেতে পারে না। কারণ সকাল, দুপুর ও বিকেলে তার কোচিং থাকে। একই স্কুলের আরেক ছাত্রী আর্থিয়া সামিহা হৃদি বলে, সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য কোচিং করতে হয়। এ কারণে সে নিয়মিত বিদ্যালয়ে যেতে পারে না। সোনালী শৈশব বিদ্যালয়ের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্র ফাদ জানায়, আগামী বছর ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিতে সে কোচিংয়ে পড়তে আসে। কোচিং করতে আসা সাব্বির মাহমুদ জানায়, বালক উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য সে এখন কোনো স্কুলেই পড়ে না। শুধু কোচিং করে।

জেলা শহরে সরকারি বালক ও বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ছাড়া মানসম্মত উচ্চ বিদ্যালয় তেমন নেই। তাই এ দুটিই অভিভাবকদের ভরসা। সন্তানদের এ দুই বিদ্যালয়ে ভর্তি করাতে পারলে তাদের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল হবে—এ বিশ্বাসে অভিভাবকরাও ওই বিদ্যালয়ে ভর্তির যোগ্য করে তুলতে কোচিংয়ে পাঠাচ্ছেন। এসব কোচিংয়ে লেখাপড়ার জন্য গ্রাম থেকে শহরেও বাসা ভাড়া নিয়ে বসবাস করছে অনেকে।

শিবগঞ্জ এলাকার হাফিজুল ইসলাম জানান, তাঁর ছেলে গত বছর বালক উচ্চ বিদ্যালয়ে দ্বিতীয় শ্রেণিতে ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারেনি। এবার যেন উত্তীর্ণ হতে পারে, এ জন্য এবার তিনি শহরে এসে ছেলেকে কোচিংয়ে পড়াচ্ছেন। নিশ্চিন্তপুর এলাকার শাম্মি আক্তার দুলালী বলেন, ‘ছেলেকে ভর্তি পরীক্ষায় টেকানোর জন্য কোচিংয়ে দিয়েছি। ’ হাজীপাড়ার বাসিন্দা শিরীন ফারহানা বলেন, ‘ভর্তি পরীক্ষায় দুই-তিন হাজার বাচ্চা অংশ নেয়। কিন্তু উত্তীর্ণ হয় মাত্র ৬০ থেকে ৭০ জন। এত প্রতিযোগিতায় নিজের সন্তানকে যোগ্য করে তুলতেই সারা দিন প্রাইভেট ও কোচিংয়ে পড়াচ্ছি। ’

হাজীপাড়া এলাকার আনিসুর রহমান বলেন, শহরে মাত্র দুটি ভালো মানের সরকারি স্কুল রয়েছে। সবাই সন্তানকে সেখানে ভর্তি করাতে চায়। শহরের পাশাপাশি উপজেলা পর্যায়ে যদি এ ধরনের ভালো মানের সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় চালু করা হয় তাহলে জেলার অনেক শিশুই ভালো শিক্ষার সুযোগ পাবে। মুন্সীপাড়া এলাকার মনিরা বেগম বলেন, সরকারের উচিত জেলায় মানসম্মত আরো স্কুল স্থাপন করা। যাতে সব শিশু ভালো শিক্ষার সুযোগ পায়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক অভিভাবক জানান, সরকারি বিদ্যালয়ে ভর্তি করিয়ে দিতে অনেক শিক্ষক মোটা অঙ্কের টাকার চুক্তি করেন।

বহিরাগত শিক্ষার্থীদের সরকারি বিদ্যালয়ে পড়ানোর বিধান না থাকলেও ভর্তির আশ্বাস দিয়ে শতাধিক শিক্ষার্থী নিয়ে ঠাকুরগাঁও সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে চালানো হচ্ছে কোচিং বাণিজ্য। তবে এ বিষয়ে কিছুই জানেন না বলে দাবি করেন সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবু হোসেন। তিনি জানান, কোনো শিক্ষক যদি এসব করে থাকেন, তবে তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

নিজ বিদ্যালয়ে অবৈধ কোচিং শিক্ষার বিষয়ে সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক দীলিপ চন্দ্র সেন দাবি করেন, তিনি এখানে বিদ্যালয় চলাকালে পড়ান না। স্কুল ছুটির পর সময় দেন। তা ছাড়া কোচিংটিও নাকি তাঁর নয়। তিনি শুধুই ক্লাস নেন। আরো অনেকেই নাকি এর সঙ্গে জড়িত।

এ ব্যাপারে জেলা প্রশাসক সরকারি বালক ও বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের সভাপতি মুকেশ চন্দ্র বিশ্বাস জানান, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জারি করা পরিপত্র অনুযায়ী নির্ধারিত ফি আদায় সাপেক্ষে বিদ্যালয়ের অপেক্ষাকৃত দুর্বল শিক্ষার্থীদের প্রাইভেট (অতিরিক্ত পাঠদান) পড়ানোর বিধান রয়েছে। তবে ওই নিয়মের ব্যত্যয় ঘটিয়ে কোনো শিক্ষক প্রতিষ্ঠানে কোচিং বাণিজ্য খুলে বসলে তদন্ত সাপেক্ষে তাঁদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


মন্তব্য