kalerkantho

শনিবার । ১০ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৯ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


অবৈধ গ্যাসের গ্রাম

শ্রীপুরের নগরহাওলা

শাহীন আকন্দ, গাজীপুর   

৪ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



অবৈধ গ্যাসের গ্রাম

গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার নগরহাওলা গ্রামে অবৈধ গ্যাস সংযোগ দেওয়ার কাজ চলছে। ছবি : কালের কণ্ঠ

গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার নগরহাওলা গ্রাম। এই গ্রামে মোট পরিবার প্রায় এক হাজার ৯০০।

এর মধ্যে এক হাজার ২০০ পরিবারে গ্যাসের সংযোগ আছে। এর সব সংযোগ অবৈধ। এমনকি ওই গ্রামের স্থানীয় সরকারের অংশ ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) সদস্যের বাড়ির সংযোগটিও অবৈধ।

প্রভাবশালী একটি অসাধু চক্র গত সাত-আট মাসের ব্যবধানে গ্রামজুড়ে এ অবৈধ সংযোগ দিয়েছে। সংযোগপ্রতি ৫০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা পর্যন্ত নিয়েছে চক্রটি। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, শুধু নগরহাওলা নয়, শ্রীপুর পৌর এলাকা, মাওনা, গাজীপুর ও রাজাবাড়ী ইউনিয়নের বেশির ভাগ এলাকাজুড়ে গ্যাসের অবৈধ সংযোগ রয়েছে। গত প্রায় দুমাস ধরে অবৈধ সংযোগের কারবার পুরোদমে চলছে।

তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন ও ডিস্ট্রিবিউশন কম্পানির কর্মকর্তারা জানান, কলকারখানায় চাহিদামাফিক পাইপলাইনে চাপ থাকে সর্বনিম্ন ৫০ থেকে ১৫০ পিএসআইজি (পারস্কয়ার ইঞ্চি)। আবাসিক সংযোগে সর্বোচ্চ চাপ ৫০ পিএসআইজি। অসাধু চক্রের সদস্যরা টাকার লোভে ২ ইঞ্চি ব্যাসার্ধের কলকারখানায় সংযোগ দেওয়া পাইপলাইন থেকে আবাসিকে অবৈধ সংযোগ দিয়ে থাকে। ওই সংযোগগুলো ঝুঁকিপূর্ণ। এর আগে গাজীপুরের পোড়াবাড়ী, গড়গড়িয়া মাস্টারবাড়ী ও নয়নপুর এলাকায় ওই অবৈধ সংযোগ থেকে ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটেছে। গত প্রায় এক বছর আগে পাশের কালিয়াকৈর উপজেলায় এক পরিবারের শিশু-নারীসহ চারজন দগ্ধ হয়ে মারা যান। তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন ও ডিস্ট্রিবিউশন কম্পানির গাজীপুর আঞ্চলিক কার্যালয়ের ব্যবস্থাপক এ এম সাইফুল ইসলাম দাবি করেন, শ্রীপুর উপজেলায় গ্যাসের ৯ হাজার অবৈধ সংযোগ রয়েছে। তবে নির্ভরশীল সূত্রের দাবি, অবৈধ সংযোগের পরিমাণ প্রায় ৪০ হাজার।

গত বুধবার দুপুরে সরেজমিন নগরহাওলা গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, পাকা সড়ক কেটে গ্যাসের অবৈধ পাইপলাইন বসানো হয়েছে। গ্রামের প্রায় ঘরে-ঘরে গ্যাসের সংযোগ। বাঁ পাশে সিরাজ মাতবর বাড়ির গলি দিয়ে ঢুকলে সুরুজ মিয়ার বাড়ি। সুরুজকে খুঁজে পাওয়া গেল না। বাড়ির ভাড়াটিয়া রাবেয়া খাতুন জানান, ছয়টি পরিবার ভাড়ায় থাকেন। প্রায় দুই মাস আগে গ্যাসের সংযোগ পেয়েছেন তাঁরা। গ্যাসের সংযোগ দিয়ে বাড়ির মালিক ৭০০ টাকা ভাড়া বাড়িয়েছেন। পাশে সুরত আলীর বাড়ি। সেখানে দুই বছর আগে সংযোগ দেওয়া হয়েছে। সুরত আলী বলেন, ‘জসীম উদ্দিন নামে একজনকে আড়াই লাখ টাকা দিয়ে সংযোগ নিয়েছি। ’

গ্রামবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সপ্তাহখানেক আগে শৈলাট রোড কেটে গ্যাসের ২ ইঞ্চি ব্যাসার্ধের পাইপ বসিয়ে দুলাল মেম্বার বাড়ির গলির ১৪ থেকে ১৫টি বাড়িতে সংযোগ দেওয়া হয়েছে। এতে গ্রামটি দুর্ঘটনাপ্রবণ হয়ে ওঠায় স্থানীয় কয়েকজন গাজীপুরের জেলা প্রশাসককে (ডিসি) অবহিত করেন। পরে ডিসির নির্দেশে গত বুধবার অনেকটা দায়সারা অভিযান চালায় তিতাস কর্মকর্তারা। তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন ও ডিস্ট্রিবিউশন কম্পানির ভালুকা আঞ্চলিক কার্যালয়ের ব্যবস্থাপক মশিউর রহমান বলেন, ‘ওই অভিযানকালে আট কিলোমিটার গ্যাসের পাইপলাইন বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। ওই পাইপলাইনে অবৈধ সংযোগ ছিল প্রায় ৮০০। গ্রামে আরো প্রায় ৪০০ অবৈধ সংযোগ রয়েছে। ’ গড়গড়িয়া মাস্টারবাড়ী-শ্রীপুর সড়কের ছাপিলাপাড়ায় সড়ক কেটে পাইপলাইন বসানো হয়েছে। দু-এক দিনের মধ্যে পাশের ১২টি বাড়িতে সংযোগ দেওয়ার জন্য চলছে প্রস্তুতি। এরই মধ্যে প্রতি সংযোগে ৫০ হাজার করে (ছয় লাখ) টাকা নিয়েছে ওই এলাকার দুই যুবলীগ নেতা। সরেজমিনে বৈরাগীরচালা, গড়গড়িয়া মাস্টারবাড়ী, নতুনবাজার, বেলতলী, নয়নপুর, জৈনাবাজার, সলিংমোড়ে অবৈধ সংযোগ দিতে সড়ক কাটতে দেখা গেছে। স্থানীয় প্রভাবশালীরা সড়ক কেটে পাইপলাইন বসাচ্ছে। তিতাসের কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী ওইসব অবৈধ সংযোগ কারবারে জড়িত বলে জানা গেছে।

বেলতলী গ্রামের মুদি দোকানদার রুবেল মিয়া বলেন, ‘আমার বাড়িতে সংযোগ নেওয়ার জন্য আনসার নামে একজনকে ৪০ হাজার টাকা দিয়েছি। দু-এক দিনের মধ্যেই সংযোগ দেওয়া হবে। ’ অবৈধ গ্যাস সংযোগ কারবারে জড়িত কয়েকজন অভিযোগ করেন, গ্যাসের অবৈধ সংযোগের সঙ্গে থানা পুলিশ জড়িত। পুলিশকে টাকা না দিয়ে কোনো এলাকায় একটি সংযোগও দেওয়া হয় না। তবে পুলিশ জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করে শ্রীপুর মডেল থানার দ্বিতীয় শীর্ষ কর্মকর্তা উপপরিদর্শক (এসআই) হেলাল উদ্দিন বলেন, ‘পুলিশের কোনো কর্মকর্তা গ্যাসের অবৈধ সংযোগ কারবারে জড়িত নন। ’ অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন না করার কারণ জানতে চাইলে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন ও ডিস্ট্রিবিউশন কম্পানির গাজীপুর আঞ্চলিক কার্যালয়ের ব্যবস্থাপক এ এম সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘প্রয়োজনীয় লোকবলের অভাবে আমরা সব সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে পারিনি। তবে বিচ্ছিন্নকরণ নিয়মিত চালানো হবে। ’

গাজীপুরের ডিসি এস এম আলম বলেন, ‘লোকবলের কোনো সমস্যা নেই। গ্যাসের অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার নির্দেশ দিয়েছি। সব অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হবে। ’


মন্তব্য