দিনবদলের হাতছানি-330621 | প্রিয় দেশ | কালের কণ্ঠ | kalerkantho

kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২৯ সেপ্টেম্বর ২০১৬। ১৪ আশ্বিন ১৪২৩ । ২৬ জিলহজ ১৪৩৭


দিনবদলের হাতছানি

লিমন বাসার, বাংলাবান্ধা থেকে ফিরে   

১ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



দিনবদলের হাতছানি

বাংলাবান্ধার জিরো পয়েন্ট। এ পথেই চলাচল করবে চার দেশের বিভিন্ন যানবাহন। ছবি : কালের কণ্ঠ

বাংলাদেশ থেকে যারা ভারত বেড়াতে যায়, তাদের মধ্যে বেশির ভাগের পছন্দ উঁচু শহর দার্জিলিং। পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের এই শহরে প্রবেশের একমাত্র পথ শিলিগুড়ি। এর আগে যশোরের বেনাপোল সীমান্ত দিয়ে ৭৫০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে শিলিগুড়ি যেতে হতো। লালমনিরহাটের বুড়িমারী সীমান্ত চালু হওয়ার পর ৮৩ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হচ্ছে।

এখন পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া উপজেলার বাংলাবান্ধা সীমান্ত দিয়ে মাত্র ৭৮ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে যাওয়া যাবে। এই পথ কমে যাওয়ার হিসাবটাকে টাকায় রূপান্তর করলে যে অঙ্ক দাঁড়ায়, তা-ই আশা জাগাচ্ছে পঞ্চগড়বাসীর মনে। এ ছাড়া বাংলাদেশ, ভুটান, নেপাল ও ভারতের (বিবিএনআই) পরিকল্পিত শিল্পাঞ্চলের সদর দপ্তরও হবে এই জেলায়। এর ফলে পিছিয়ে পড়া জনপদ পঞ্চগড়ের অভাবী মানুষ উন্নয়নের স্বপ্ন দেখছে।

দেশের সর্ব উত্তরের এই জনপদের মানুষের মূল পেশা ছিল শ্রম বিক্রি করা। কিন্তু এখন পরিস্থিতি ভিন্ন। বাংলাবান্ধা শূন্যরেখার আশপাশের মানুষ এখন অভাবকে না বলছে। তেঁতুলিয়া বাজার এলাকার দিনমজুর আবদুল হামিদ বলেন, ‘হামাএলা খুব উন্নতি হোবো। হামাক আর পাথর উঠাবা লাগিবা নাহায়।’

আমদানি-রপ্তানিকারক অ্যাসোসিয়েশনের জেলা সভাপতি মেহেদি হাসান বাবলা বলেন, ‘বাংলাবান্ধায় অভিবাসন (ইমিগ্রেশন) চালু হওয়ায় এর লাভ পাবে সমগ্র দেশের মানুষ। কারণ, এর ফলে দার্জিলিং, নেপাল, ভুটান ও চীন সীমান্তের দূরত্ব কমে যাবে। বাংলাবান্ধা থেকে দার্জিলিং ৮৬ কিলোমিটার, নেপাল সীমান্ত ৫৪ কিলোমিটার, ভুটান ১৩০ কিলোমিটার ও চীন মাত্র ২০০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত।’

পঞ্চগড় চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি আশরাফুল আলম পাটোয়ারী বলেন, ‘বিবিএনআইর মধ্যে একটি যৌথ চুক্তি হয়েছে। ইতিমধ্যে বাংলাদেশের ৩২ সদস্যের একটি দল ওপার ঘুরে এসেছে। প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ড. মসিউর রহমানকে নিয়ে ব্যবসায়ীদের সংগঠন এফবিসিসিআই শিলিগুড়ি যাবে। সেসব দেশের প্রতিনিধিরাও থাকবেন। কিভাবে এই এলাকাকে আরো শিল্পবান্ধব করা যায় এ নিয়ে আলোচনা হবে। পঞ্চগড়, শিলিগুড়ি, বিরাটনগর ও ফুটসিলিং এই এলাকাকে নিয়ে বিবিএনআই শিল্পাঞ্চল ঘোষণা করবে। এই শিল্পাঞ্চলের সদর দপ্তর হবে পঞ্চগড়।’

পঞ্চগড়ের ভোজনপুর বাজারের পাথর ব্যবসায়ী আমিন, ফকরুল ও মনিরুল বলেন, ‘ইমিগ্রেশন না থাকার কারণে পিছিয়ে ছিল সব কিছু। এখন আমরা ভালো কিছু আশা করছি। এলাকার জায়গাজমির দামও হঠাৎ বেড়েছে।’

পঞ্চগড়ের কাজি টি এস্টেট কর্মকর্তা মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘আবহাওয়াজনিত কারণে এখানে চা ব্যবসা লাভজনক। হাজার হাজার হেক্টর জমিতে চা গাছ দেখা যায়। এখন এই ব্যবসা শিল্পে রূপান্তর হবে।’

সরেজমিনে বাংলাবান্ধা শূন্যরেখা ঘুরে দেখা গেছে, অভিবাসন চালুর জন্য বাংলাবান্ধা ও এর বিপরীতে ভারতীয় সীমান্তের ফুলবাড়ীতে আধুনিক ভবন ও অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণ শুরু হয়েছে। ইতিমধ্যে প্রতিটি ভবনের নির্মাণকাজ শেষের দিকে। ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে যতগুলো স্থলবন্দর চালু রয়েছে তার মধ্যে বাংলাবান্ধা বন্যামুক্ত।

পঞ্চগড়ের বাসিন্দা ও কালের কণ্ঠ’র জেলা প্রতিনিধি সাইফুল ইসলাম বাবু বলেন, ‘বাংলাবান্ধা বন্দরের বিপরীতে ফুলবাড়ী থেকে মাত্র সাড়ে তিন কিলোমিটার দূরে নিউ জলপাইগুড়ি (এনজিপি) রেলস্টেশন। এই স্টেশন থেকে ভারতের যেকোনো স্থানে যাতায়াতের সুবিধা রয়েছে। বাংলাবান্ধা থেকে মাত্র আট কিলোমিটার দূরে শিলিগুড়ি শহর। এখান থেকে রেল, আকাশ ও সড়কপথে ভারতের যেকোনো প্রান্তে অনায়াসে যাতায়াত সম্ভব।’

বাংলাবান্ধা বন্দরের শুল্ক বিভাগের রাজস্ব কর্মকর্তা আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘ইতিমধ্যে উভয় দেশের সীমান্ত এলাকায় অবকাঠামোগত সুবিধা তৈরি করা হয়েছে। শিগগির এর সুফল পাওয়া যাবে।’

তেঁতুলিয়া বাজার সমিতির নেতা আবদুল মান্নান বলেন, ‘বাংলাবান্ধা ব্যবহার করে ভারত বা বিদেশের পর্যটকরা সহজে কক্সবাজার, কুয়াকাটা, সুন্দরবন ভ্রমণ করতে পারবে। এতে দেশের পর্যটনশিল্পে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে।’

উল্লেখ্য, ২০১১ সালের ২২ জানুয়ারি ভারতের সঙ্গে পণ্য আমদানি-রপ্তানি করার জন্য বাংলাবান্ধা ও ফুলবাড়ী দিয়ে পণ্যবোঝাই ট্রাক চলাচল চালু হয়।

পঞ্চগড় জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সালাহ উদ্দিন বলেন, ‘পঞ্চগড়সহ অন্য জেলার মানুষ ভারতে যাওয়ার জন্য বুড়িমারী স্থলবন্দর ব্যবহার করে। যোগাযোগব্যবস্থা ভালো হওয়ায় এখন সবাই বাংলাবান্ধা ব্যবহার করবে। স্বাভাবিক কারণে এখন এই এলাকায় ব্যবসায়িক প্রসার ঘটবে।’

মন্তব্য