kalerkantho


মুঠোফোনে চলবে হুইলচেয়ার

আহমেদ উল হক রানা, পাবনা   

১ জুলাই, ২০১৫ ০০:০০



মুঠোফোনে চলবে হুইলচেয়ার

তরুণ দেবনাথের উদ্ভাবিত অ্যানড্রয়েড কন্ট্রোলড স্মার্ট হুইলচেয়ার। ছবি : কালের কণ্ঠ

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশে শারীরিক প্রতিবন্ধীর সংখ্যা প্রায় পাঁচ লাখ। এরা চলাফেরা করে আরো পাঁচ লাখ মানুষের সহযোগিতায়।

এই ১০ লাখ লোকের সমস্যা সমাধানে এগিয়ে এসেছেন পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (পাবিপ্রবি) এক শিক্ষার্থী।

তাঁর উদ্ভাবিত স্মার্ট হুইলচেয়ার ব্যবহার করে অন্যের সহযোগিতা ছাড়াই প্রতিবন্ধীরা চলাচল করতে পারবে। অ্যানড্রয়েড মোবাইল ফোন নিয়ন্ত্রিত এই হুইলচেয়ারের নাম 'অ্যানড্রয়েড কন্ট্রোলড স্মার্ট হুইলচেয়ার ফর ডিজঅ্যাবলস'।

পাবিপ্রবির তথ্য ও যোগাযোগ প্রকৌশল বিভাগের শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী তরুণ দেবনাথ সম্প্রতি উদ্ভাবন করেছেন এই হুইলচেয়ার। প্রথমে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইটি মেলায় দারুণভাবে প্রশংসিত হয় এটি। গত ১১ জুন ঢাকার খামারবাড়িতে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক প্রকৌশল উদ্ভাবন সম্মেলনে 'রোবটস গট ফ্রিডম' শাখায় এ উদ্ভাবন জিতে নিয়েছে শীর্ষ স্থান। আন্তর্জাতিক এই সম্মেলনে মোট ৫০টি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিযোগীদের মধ্যে প্রথম স্থান অধিকার করেছেন তরুণ দেবনাথ।

স্মার্ট হুইলচেয়ার প্রজেক্টের সুপারভাইজার পাবিপ্রবির তথ্য ও যোগাযোগ প্রকৌশল বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আবুল ফজল মোহম্মদ জয়নুল আবেদীন কালের কণ্ঠকে বলেন, 'পাঁচ লাখ প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য আরো পাঁচ লাখ মানুষ কোনো কাজ করতে পারে না। এই উদ্ভাবন তাদের অন্য কাজে নিয়োজিত করার সুযোগ তৈরি করবে।

পাশাপাশি প্রতিবন্ধীদেরও চলাচলের জন্য অন্যের ওপরে নির্ভরশীলতা কমে আসবে। '

ওই বিভাগের চেয়ারম্যান মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, 'প্রতিবন্ধী মানুষদের কল্যাণের জন্য উন্নত দেশগুলোতে কয়েক ধরনের স্মার্ট হুইলচেয়ার পাওয়া যায়। কিন্তু বাংলাদেশি টাকায় তার দাম পড়ে তিন থেকে পাঁচ লাখ টাকার মতো। এর বিপরীতে তরুণের উদ্ভাবিত এই হুইলচেয়ার মাত্র ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকায় বাজারজাতকরণ করা সম্ভব। এর ফলে আর্থিকভাবে অসচ্ছল প্রতিবন্ধীরাও এই চেয়ার ব্যবহার করতে পারবে। '

গতকাল মঙ্গলবার সকালে পাবিপ্রবি ক্যাম্পাসে তরুণ জানান, ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলায় হালকা লেদ ওয়ার্কশপের ব্যবসায়ী তপন দেবনাথের ছেলে তিনি। সেখানেই বেড়ে ওঠা। পক্ষাঘাতগ্রস্ত ও প্রতিবন্ধীদের অসহায়ত্ব তাঁকে ব্যথিত করত শৈশব থেকে। এ কারণে এদের জন্য কিছু করার ইচ্ছা তাঁর ছোটবেলা থেকেই।

তরুণ বলছিলেন, 'মাত্র ছয় মাস আগে নিজের অ্যানড্রয়েড মোবাইল ফোনে গেম খেলছিলাম। হঠাৎ মাথায় এলো, কী করে এই ফোনকে আরো কল্যাণমুখী কাজে ব্যবহার করা যায়? এই চিন্তা থেকেই কাজে লেগে গেলাম। কিছুদিনের মধ্যে প্রাথমিকভাবে একটি স্মার্ট হুইলচেয়ারের মডেল তৈরি করি। গত ফেব্রুয়ারিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইটি ফেয়ারে চেয়ারের একটি ডেমো মডেল জমা দেই। এটা প্রথম স্থান অধিকার করে। এরপর আরো বেশি আত্মপ্রত্যয়ী হয়ে উঠি। শেষে সফলতা আসে চলতি বছরের মে মাসের শেষ নাগাদ। '

এরপর তিনি পূর্ণাঙ্গ অ্যানড্রয়েড কন্ট্রোলড স্মার্ট হুইলচেয়ার তৈরি করেন। মাত্র ২৪ ভোল্টের দুটি মোটর আর ৪৮ ভোল্টের ব্যাটারির সাহায্যে চলে এই হুইলচেয়ার। তরুণ বলেন, 'স্মার্ট এই হুইলচেয়ারে স্বয়ংক্রিয় অ্যালার্ম সিস্টেম সংযুক্ত করা হয়েছে। এর ফলে চেয়ারে অবস্থান করা ব্যক্তি শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়লে বা তার হৃৎস্পন্দন অস্বাভাবিক হয়ে পড়লে সঙ্গে সঙ্গে চেয়ারের অ্যালার্ম বেজে উঠবে, যা সতর্ক করে দেবে পাশের মানুষদের। '

তিনি জানান, অন্যের সাহায্য ছাড়া যেকোনো ব্র্যান্ডের একটি অ্যানড্রয়েড মোবাইল ফোন দিয়ে প্রতিবন্ধীরা এই হুইলচেয়ার স্বচ্ছন্দে ব্যবহার করতে পারবে। চেয়ারটি বাণিজ্যিকভাবে এখনো তৈরি করেননি তিনি। প্রাথমিকভাবে এটার খরচ পড়েছে সব মিলিয়ে ৭০ হাজার টাকা। বাণিজ্যিকভাবে তৈরি হলে খরচ আরো কমবে। তখন ২০ হাজার টাকার মধ্যেই এই স্মার্ট হুইলচেয়ার পাওয়া যাবে।

এই উদ্ভাবন সম্পর্কে পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. আল নকীব চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, 'এই বিশ্ববিদ্যালয়ের বয়স মাত্র আট বছর। এরই মধ্যে এখানকার একজন শিক্ষার্থী উদ্ভাবনের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনাম বৃদ্ধি করেছে। ' তিনি আরো বলেন, 'বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে সব সময়ে গবেষণা, প্রকাশনা বা যেকোনো ধরনের সৃষ্টিশীল কাজকে উৎসাহিত করা হয়। প্রযুক্তিকে ইতিবাচকভাবে নিজের, দেশের ও মানবকল্যাণের জন্য ব্যবহার করা যায়; তরুণ তা আবারও প্রমাণ করেছে। তার উদ্ভাবিত স্মার্ট হুইলচেয়ার দেশের হাজার হাজার প্রতিবন্ধীর চলাচলের সুবিধার পাশাপাশি তাদের মুখে হাসি ফোটাবে বলে আমি বিশ্বাস করি। '


মন্তব্য