kalerkantho

৩০০ বছর পর নামকরণ

মাহবুব হাসান মেহেদী, কালিয়াকৈর (গাজীপুর)    

২৩ মে, ২০১৫ ০০:০০



৩০০ বছর পর নামকরণ

সাদা পাকুড় : গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার বাঁশতলী গ্রামের তিন শ বছর বয়সী এই বৃক্ষটির নাম জানত না এলাকার মানুষ। গবেষকরা জানিয়েছেন এর নাম সাদা পাকুড়। ছবি : কালের কণ্ঠ

গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার বাঁশতলী গ্রামের বিরল প্রজাতির অচিন বৃক্ষটি অবশেষে নাম পেল। বিপন্ন উদ্ভিদ ও প্রাণী সংরক্ষণ ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ (ইপ্যাক ফাউন্ডেশন) ৩০০ বছর বয়সী বৃক্ষটির বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য দীর্ঘদিন পর্যালোচনার পর ‘সাদা পাকুড়’ নাম দিয়েছে।
বাংলাদেশ নদী বাঁচাও আন্দোলনের আমন্ত্রণে ইপ্যাক ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে গতকাল শুক্রবার সকালে বাঁশতলী এলাকায় অচিন গাছটির নিচে নামকরণ নিয়ে এক সভার আয়োজন করা হয়। এতে গাছটির ‘সাদা পাকুড়’ নাম ঘোষণা করেন ইপ্যাক ফাউন্ডেশনের মহাসচিব ড. আখতারুজ্জামান চৌধুরী। বৃক্ষটির বৈজ্ঞানিক নাম ficus virens var sublanceolata. ইংরেজি নাম white fig.
পাতা ঝরা বৃক্ষটি প্রায় ৮০ শতক জমিজুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে। এর উচ্চতা প্রায় ১০০ ফুট। চৈত্র-বৈশাখ মাসে পাতা ঝরে গিয়ে নতুন পাতা গজায়। পাতা মসৃণ ও ডিম্বাকৃতি ফলার মতো। এর ছোট ছোট গোলাকার ফল পাখির প্রিয় খাবার। সাধারণত এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর মাসে গাছটিতে ফল ধরে। এ বৃক্ষ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও অস্ট্রেলিয়ায় দেখা যায়। বাংলাদেশে এটি বিরল। গাছটি কালিয়াকৈরের বাঁশতলী গ্রাম ছাড়া দেশের অন্য কোথাও আছে কি না, এখনো এমন কোনো তথ্য পায়নি বলে জানায় ইপ্যাক ফাউন্ডেশন।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, কালিয়াকৈর উপজেলা সদর থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার উত্তরে মৌচাক ইউনিয়নের বাঁশতলী গ্রাম। গ্রামের আবু তাহের ও তালেব মিয়ার জমির ওপর বিল ঘেঁষে প্রায় ৩০০ বছর আগে একটি বিরল প্রজাতির বৃক্ষের চারা জন্ম নেয়। জমির মালিক ও এলাকাবাসী এর যতœ নিতে থাকে। সেটি আজ বিশাল বৃক্ষ। কিন্তু এলাকাবাসী জানে না এর নাম। ফলে ওই গ্রামসহ আশপাশের গ্রামের লোকজনের কাছে এটি ‘অচিন বৃক্ষ’ হিসেবেই পরিচিত হয়ে ওঠে। বিভিন্ন এলাকার মানুষ প্রায় প্রতিদিনই বৃক্ষটি একনজর দেখতে বাঁশতলী গ্রামে যায়। তাদের অনেকেই নানা সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে বৃক্ষের নিচে এসে মানত করে।
স্থানীয় বাসিন্দা ৭০ বছর বয়সী আব্দুর রহমান বলেন, ‘আমার জন্মের পর হতেই গাছটি এ রকমই দেখে আসছি। আমার বাপ-দাদারাও বলেছে, তারাও নাকি গাছটি এ রকমই দেখেছে। কিন্তু তারা গাছের নাম বলতে পারেনি। শুধু বলেছে এটি অচিন বৃক্ষ। এটি কোথা থেকে এসেছে বা কে লাগিয়েছে তাও তারা বলতে পারেনি।’
আব্দুর রহমান বলেন, “আমার মা বাছিরন আমাদের বলতেন, গাছটিতে একটি মানুষ দেখা যেত। সে বলত, ‘তোরা আমার ক্ষতি করিস না, আমি তোদের কারো ক্ষতি করব না।’ মায়ের কথা শুনার পর তাদের নিয়ম-কানুন মেনে চলতেছি। কিন্তু এত দিন গাছটির নাম জানতাম না। আজকে জানতে পারলাম অচিন বৃক্ষটির নাম সাদা পাকুড়।”
আরেক বাসিন্দা ফুলচান মিয়া বলেন, তাঁদের পূর্বপুরুষরা গাছটিকে অচিন গাছই বলত। ওই গাছের ডালপালা কেউ কাটলে তার বিভিন্ন অসুখ হতো বলেও তিনি জানান।
এদিকে বাঁশতলীর অচিন বৃক্ষের খবর পান বিপন্ন উদ্ভিদ ও প্রাণী সংরক্ষণ ফাউন্ডেশনের কর্মকর্তারা। পরে তাঁরা বাংলাদেশ নদী বাঁচাও আন্দোলন কালিয়াকৈর শাখার আমন্ত্রণে বৃক্ষটি বেশ কয়েক মাস আগে দেখতে আসেন। এটি শনাক্তকরণ ও এর নামকরণের উদ্যোগ নেন। বৃক্ষটির বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য পর্যালোচনার পর অবশেষে এর নাম খুঁজে পান তাঁরা। গতকাল থেকে ‘সাদা পাকুড়’ নামে পথচলা শুরু হলো বৃক্ষটির।
অচিন বৃক্ষের নামকরণ সভায় সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ নদী বাঁচাও আন্দোলন গাজীপুর জেলার সভাপতি এ কে এম সিরাজুল ইসলাম। বক্তব্য দেন বাংলাদেশ নদী বাঁচাও আন্দোলনের কেন্দ্রীয় সভাপতি অধ্যাপক মো. আনোয়ার সাদত, অচিন বৃক্ষের নামকরণের গবেষক ড. আখতারুজ্জামান চৌধুরী, মৌচাক স্কাউট উচ্চ বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক মো. আব্দুল খালেক, মৌচাক ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. লোকমান হোসেন, জীববৈচিত্র্য বিষয়ক সম্পাদক খন্দকার হাসিবুর রহমান, ডা. মো. বোরহান উদ্দিন অরণ্য, সামছুল হক, আশরাফুল আলম, শাজাহান মাস্টার, নুরুল ইসলাম, সরকার আব্দুল আলীম, মোয়াজ্জেম হোসেন, আব্দুল করিম পাখি প্রমুখ।
বক্তারা বলেন, বৃক্ষটি ঘিরে ওই এলাকায় পর্যটনশিল্প গড়ে উঠতে পারে। গাছটির পাশে যে রাস্তা রয়েছে তা আগের আমলের হাঁটা পথ। সরু রাস্তাটি প্রশস্ত, পাকা করে ও বৃক্ষস্থলের আশপাশে মাটি ভরাট করে পর্যটনশিল্প গড়ে তোলা যায় এখানে। এ দাবি জানিয়েছে এলাকাবাসীও।


মন্তব্য