kalerkantho


বান্দরবান

২৫০০ ফুট পাহাড় চূড়ায় সড়ক

মনু ইসলাম, বান্দরবান   

২৪ এপ্রিল, ২০১৫ ০০:০০



২৫০০ ফুট পাহাড় চূড়ায় সড়ক

২৫০০ ফুট উচ্চতায় বাংলাদেশের সবচেয়ে উঁচু সড়কপথ। বান্দরবানের থানচি থেকে আলীকদম হয়ে এই পথ চলে গেছে কক্সবাজারে। ছবি : কালের কণ্ঠ

সমুদ্র সমতল থেকে আড়াই হাজার ফুট উঁচুতে নির্মাণ করা হয়েছে বাংলাদেশের সবচেয়ে উঁচু সড়কপথ। যা দক্ষিণ এশিয়ার দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সড়কপথ। বান্দরবানের থানচি থেকে আলীকদম হয়ে এ পথ চলে গেছে আরেক পর্যটন নগরী কক্সবাজারে।

মে মাসের কোনো এক সময় দেশের সবচেয়ে উঁচু এ সড়কপথের উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী। পরে সব ধরনের গাড়ি চলাচলের জন্য তা খুলে দেওয়া হবে। এরপর পাহাড় আর বন-বনানী ছুঁয়ে ছুঁয়ে প্রকৃতির সৌন্দর্য অবগাহন করে গাড়ি ছুটিয়ে ঘুরে বেড়ানোর এ সুযোগ দেশের পর্যটন শিল্পকে করে তুলবে আরো সম্ভাবনাময়।

টানা এক যুগের চেষ্টায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন ব্যাটালিয়ন ৩৩ কিলোমিটার দীর্ঘ এ সড়কের নির্মাণকাজ সম্পন্ন করে। প্রধানমন্ত্রীর উদ্বোধনকে সামনে রেখে সড়ক যোগাযোগ ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের গত বুধবার এ সড়ক পরিদর্শন করেছেন। গাড়িতে চড়ে ডিম পাহাড় পর্যন্ত ঘুরে এসে সাংবাদিকদের কাছে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে ওবায়দুল কাদের বলেন, 'এর মধ্য দিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে আরেক অমিত সম্ভাবনার দুয়ার খুলে যাবে। একসময় বলা হতো, ডিম পাহাড়ের পরাজয় নেই। আমাদের সেনা জওয়ানরা সেই অসম্ভবকে আজ বাস্তবে পরিণত করলেন।' থানচি-আলীকদম সড়ক নির্মাণ প্রকল্পের প্রকল্প কর্মকর্তা (পিডি) লে. কর্নেল মনোয়ারুল ইসলাম জানান, ওই প্রকল্প বাস্তবায়নে ১২০ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। ৩০ জুন প্রকল্প শেষ হওয়ার কথা থাকলেও নির্ধারিত সময়ের দুই মাস আগেই তা সম্পন্ন হয়েছে। তিনি জানান, কক্সবাজারের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের সড়কটি দুই পর্বে সম্পন্ন করার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রথম পর্বে থানচি থেকে আলীকদম অংশের কাজ এরই মধ্যে শেষ হয়েছে। দ্বিতীয় অংশ ছাড়াই আলীকদম থেকে চকরিয়া সংযোগ সড়ক ব্যবহার করে কক্সবাজার যাওয়া যাচ্ছে। তবে আলীকদম থেকে বাইশারি-চাকঢালা-ঘুমধুম-উখিয়া অংশের কাজ শেষ হলে পথের দূরত্ব অনেক কমে যাবে।

সড়কমন্ত্রীর সঙ্গী হয়ে এ প্রতিবেদকসহ আরো কয়েকজন স্থানীয় সাংবাদিক থানচির জিরো পয়েন্ট থেকে ২২ কিলোমিটার পয়েন্টের ডিম পাহাড় ঘুরে দেখেছেন। থানচির সাংবাদিক অনুপম মারমা জানান, আড়াই হাজার ফুট উঁচু এ পাহাড় চূড়ার আকৃতি দেখতে ডিমের মতো হওয়ায় স্থানীয়রা একে ডিম পাহাড় নামেই চেনে। ডিম পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে চারপাশে সবুজ আর নীলের মাতামাতি দেখে চোখ জুড়িয়ে গেল। সাপের মতো আঁকাবাঁকা সড়কের নিচের দিকে ছোট ছোট পাহাড়ি গ্রামকে দক্ষ শিল্পীর আঁকা ছবির মতোই মনে হলো। আলীকদমের সাংবাদিক মোমতাজ উদ্দিন আহমদ বলেন, 'ডিম পাহাড়ের ওপর দিয়ে বাইক চালাতে পারব- এমনটি কোনো দিন ভাবিনি।'

আনুষ্ঠানিক ব্রিফিংকালে সড়কমন্ত্রী বলেন, 'প্রধানমন্ত্রী দেশের সব প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে কানেকটিভিটির আওতায় নিয়ে আসতে চান। আমরা তাঁর স্বপ্ন বাস্তবায়ন করে চলেছি।'

স্থল যোগাযোগ না থাকায় বান্দরবান সদর থেকে নদীপথে থানচি যেতে দুই দিন লাগত। এখন পৌনে দুই ঘণ্টায় থানচি, আর পাহাড়ি পথ ধরে আলীকদম যেতে লাগছে মাত্র আড়াই ঘণ্টা। রেমাক্রি জলপ্রপাত, তিন্দুর পাথুরে নদীপথ, নাফা খুম, শংখ নদীর উৎসমুখ আন্ধার মানিক, গহিন রিজার্ভ ফরেস্ট, আদিবাসী জীবনের বর্ণিল সৌরভ পর্যটকদের টেনে নিয়ে আসত প্রান্তিক জনপদ থানচিতে। এর সঙ্গে আড়াই হাজার ফুট উচ্চতার থানচি-আলীকদম সড়ক যোগ করল নতুন মাত্রা। বান্দরবানের থানচি-আলীকদমের কাছাকাছি মিয়ানমারের চিন প্রদেশের রাজধানী শহর হাখা। এর উচ্চতা প্রায় ছয় হাজার ফুট। সেখানে যেতে হলে বিমানের পাশাপাশি একটিমাত্র সড়কপথ রয়েছে। এ পথকে এখন পর্যন্ত দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে উঁচু রাস্তা বিবেচনা করা হয়। উচ্চতায় অর্ধেক হলেও থানচি-আলীকদম সড়কটি দখল করে নিয়েছে দক্ষিণ এশিয়ার দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সড়কের মর্যাদা। বান্দরবানের আদিবাসী গবেষক মং ক্য শোয়ে নু কয়েক বছর আগে ঘুরে এসেছেন হাখা শহর। তিনি জানান, পাহাড়ের ঢালুতে ইংরেজি 'ইউ' অক্ষরের আদলে গড়ে ওঠা হাখা শহর চিন রাজ্যের রাজধানী হলেও প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যের কারণে রাজধানীর গুরুত্ব ছাপিয়ে এটি হয়ে উঠেছে মিয়ানমারের অন্যতম প্রধান পর্যটন কেন্দ্র। মং ক্য শোয়ে নু জানান, মিয়ানমারের দক্ষিণ-পূর্ব অংশে হাখার অবস্থান। যা বাংলাদেশের থানচি-আলীকদমের কাছাকাছি। তাই বাংলাদেশ-মিয়ানমার সমঝোতার ভিত্তিতে থানচি-আলীকদম সড়কের সঙ্গে হাখা সড়ককে সংযুক্ত করা গেলে তা হয়ে উঠবে ইতিহাসের আরেক অধ্যায়।

 



মন্তব্য