kalerkantho


রাগে হেমন্ত বন্দনা

দিলীপ কুমার মণ্ডল, নারায়ণগঞ্জ   

১৬ নভেম্বর, ২০১৪ ০০:০০



রাগে হেমন্ত বন্দনা

নারায়ণগঞ্জের লক্ষ্যাপারের শাস্ত্রীয় সংগীত সম্মেলনে গাইছেন শিল্পীরা। ছবি : কালের কণ্ঠ

ঘড়ির কাঁটায় তখন রাত পৌনে ১০টা। বিশিষ্ট যন্ত্রী দীপন সরকার বিশেষভাবে নির্মিত চতুরঙ্গের ২৪টি তারের ঝংকারে একে একে পুরিয়া কল্যাণ, ভৈরবী ধুম রাগ পরিবেশন করছেন।

হলভর্তি দর্শক পিনপতন নীরবতায় মন্ত্রমুগ্ধের মতো তা শ্রবণ করছে। তবলা, সেতার ও চতুরঙ্গের অপূর্ব সুর-মূর্ছনায় অনেক সমঝদার দর্শক তখন মাথা দুলিয়ে কিংবা চক্ষু মুদে সে সুরের মাহাত্ম্য অনুধাবন করার চেষ্টা করছেন। হলজুড়ে মাঝেমধ্যেই সমন্বিত করতালি তবলা ও চতুরঙ্গ বাদনে ওস্তাদের নানা মুন্সিয়ানা পরিলক্ষিত হচ্ছিল। পরিবেশনের বিভিন্ন পর্যায়ে বিভিন্ন রাগের মাহাত্ম্যও বুঝিয়ে দিচ্ছিলেন শিল্পী।

দীপন সরকার বলেন, 'হেমন্ত ঋতুকে নিয়ে পুরিয়া কল্যাণ রাগ সৃষ্টি করেছিলেন ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ। মাটি-জল-আলো-হাওয়ায় গড়ে উঠেছে প্রকৃতি-মানব সম্পর্কের বুনন। এর তন্তুগুলোকে চিনতে গিয়ে মানুষ পেয়েছে সুর-লয়-ছন্দ। ছয় ঋতুর পরিক্রমায় হেমন্ত এক বিশেষ বৈশিষ্ট্য নিয়ে আসে এই ভারতীয় উপমহাদেশে। বিশেষ করে এই বাংলায় হেমন্তে ধান কাটা ও নবান্ন উৎসব পোক্ত করেছে আমাদের ঐতিহ্যের ভিত্তি। '

চতুরঙ্গ সম্পর্কে বলতে গিয়ে দীপন সরকার বলেন, 'সরোদ, বীণা, সেতার ও গিটার এই চার যন্ত্রের সমন্বয়ে বিশেষভাবে তৈরি হয়েছে চতুরঙ্গ। এর ২৪টি তারে আঙ্গুলের পরশে বেজে ওঠে নানা ঝংকার। ১৯৫০ সালে পণ্ডিত ভৃজভূষণ এর সূচনা করেন। কেউ কেউ এটাকে স্লাইড গিটার আবার কেউবা মোহনবীণা বলে থাকে। '

শুক্রবার রাতে নারায়ণগঞ্জ শহরের ঐতিহ্যবাহী সুধীজন পাঠাগারে লক্ষ্যাপার আয়োজিত অনুষ্ঠানে শুরুতেই তবলা লহড়ি বাজিয়ে দর্শকদের তাক লাগিয়ে দেন মীর নাকিবুল ইসলাম। এরপর মঞ্চে আসেন ওস্তাদ রেজোয়ান আলী। তিনি সাতিওয়াল দক্ষিণ কিরবাণি, জিলা কাফি ইত্যাদি রাগে উচ্চাঙ্গসংগীত পরিবেশন করে দর্শকদের মোহাবিষ্ট করে রাখেন।

শিল্পীদের কথন ও বাদনে দর্শকরাও তন্ময় হয়ে শুনছিল শাস্ত্রীয় সংগীতের বিভিন্ন রাগের সুর-মূর্ছনা। কিন্তু ততক্ষণে সন্ধ্যা পেরিয়ে গভীর রাত। বাড়ি ফেরার তাড়াও যেন নেই দর্শকদের। তবে ঘোষকের কণ্ঠে যখন আসর সমাপনের ঘোষণা তখনই সম্বিত ফিরে পায় শ্রোতা দর্শকরা। এভাবেই গত শুক্রবার সন্ধ্যা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত শাস্ত্রীয় সংগীত পরিবেশন করে নারায়ণগঞ্জের সমঝদার দর্শকদের মোহময়ে আবিষ্ট করে রাখেন ওস্তাদ রেজোয়ান আলী, দীপন সরকার, সবুজ আহমেদ ও মীর নাকিবুল ইসলামেরা। মাঝে মাঝে সুকণ্ঠ উপস্থাপনায় অনুষ্ঠানকে প্রাণবন্ত করে তোলেন অসিত কুমার সাহা।

নারায়ণগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী সুধীজন পাঠাগারে শুক্রবার সন্ধ্যায় হেমন্ত অধিবেশন শিরোনামে শাস্ত্রীয় সংগীতের এই অধিবেশনের আয়োজন করেছিল সাংস্কৃতিক সংগঠন লক্ষ্যাপার।

লক্ষ্যাপারের অন্যতম কর্মকর্তা শ্বাশতী পাল বলেন, 'সংগীতের শিকড় শাস্ত্রীয় সংগীত। এই সংগীতকে সবার কাছে জনপ্রিয় করে তোলার লক্ষ্য নিয়ে ২০০৯ সালে আমরা সমমনা কয়েকজন মিলে গড়ে তুলি সংগঠনটি। সংগঠনটি যেহেতু শীতলক্ষ্যা বিধৌত নারায়ণগঞ্জভিত্তিক তাই এর নাম দেওয়া হয়েছে লক্ষ্যাপার। ' তিনি জানান, এ সংগঠনের মাধ্যমে প্রতিবছর শাস্ত্রীয় তথা উচ্চাঙ্গসংগীত-বিষয়ক ওয়ার্কশপ ও সেমিনারের আয়োজনও করা হয়।

সংগঠনের সমন্বয়ক অধ্যাপক অসিত কুমার বলেন, 'গানের বিজ্ঞান হচ্ছে শাস্ত্রীয় সংগীত। এখনো সারা পৃথিবীতেই এর কদর আছে। যদিও দিন দিন সেটা কমে আসছে। '

 

 


মন্তব্য