kalerkantho


জেলের চোখ কাঁকড়ায়

এমরান হাসান সোহেল, পটুয়াখালী   

২৭ অক্টোবর, ২০১৪ ০০:০০



জেলের চোখ কাঁকড়ায়

নদীতে কমে গেছে মাছ, তাই জেলেরা ব্যস্ত হয়ে পড়েছে কাঁকড়া শিকারে। ওই কাকড়া বিক্রি করে সংসার চলে পটুয়াখালীর জেলেদের। ছবি : কালের কণ্ঠ

'গাঙ্গে মাছ পাওন যায় না। হারাদিন জাল বাইয়া কোনো সোময় খালি আতে, আবার একটা দুইডাও ইলিশ পাওন যায়।

হ্যাতে পোষায় না, প্যাডে ভাত পড়ে না। পাঁচ-ছয় ঘণ্টা ক্যারহা ধরলে পাঁচ শো, ছয় শো টাহা কামাই করণ যায়। এ্যাহন ক্যারহা ধইরগা সংসার চালাই। চাহিদা আছে দামও আছে ভালো। ' কথাগুলো বলছিলেন, পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালীর চরমোন্তাজ এলাকার জেলে মো. মনসুর নাইয়া।

নদী কিংবা সাগরে মাছ নেই। তাই কাঁকড়া ধরার বিকল্প পেশায় বেঁচে থাকার উপায় হিসেবে কাঁকড়া শিকার করেন মনসুর। শুধু মনসুরই নয়, তাঁর মতো অনেক জেলেই এখন কাঁকড়া শিকার করছে। মনসুর আরো জানান, প্রায় ২৫ বছর ধরে মাছ শিকার করে সংসারের ব্যয় মিটিয়ে আসছেন এই জেলে।

কিন্তু ইলিশসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ নদীতে কমে যাওয়ার কারণে কাঁকড়া শিকার করছেন। স্থানীয় রাঙ্গাবালী এলাকার কাঁকড়া শিকারিরা জানান, স্থানীয় বাজারে নদী থেকে শিকার করা বড় সাইজের একটি কাঁকড়া বিক্রি হয় ১০ থেকে ১২ টাকায়। কিন্তু ওই উপজেলার সীমানা পেরিয়ে গলাচিপা, পটুয়াখালী সদর, বাউফল ও দশমিনা এলাকায় সরবরাহ দিতে পারলে দামও ভালো পাওয়া যায়। এসব বাজারে বড় সাইজের (২০০ থেকে ২৫০ গ্রাম) কাঁকড়া বিক্রি হয় ৩৫ থেকে ৪০ টাকায়। আবার ৫০ গ্রাম ওজনের কাঁকড়া ২০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়।

জেলেদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নদী বেষ্টিত পটুয়াখালী সদর, বাউফল, দশমিনা, গলাচিপা, রাঙ্গাবালী, কলাপাড়া, দুমকি ও মির্জাগঞ্জের নদী পারের অধিকাংশ পরিবার তেঁতুলিয়া, লোহালিয়া, পায়রা, আন্দারমানিক, আগুনমুখা, দাড়ছিড়া, মেঘনার মোহনা ও বুড়াগৌরাঙ্গ নদীর আশপাশের খাল এবং সাগরে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করে। মাছের সংখ্যা কমে যাওয়ায় ওই সব জেলে পরিবারের দিন কাটছে অভাব কিংবা টানাটানির মধ্য দিয়ে। ফলে কাঁকড়ার বিচরণস্থলের অনেক জেলে কাঁকড়া শিকার করে সংসার চালাচ্ছে। তাই গলাচিপা, কলাপাড়া ও রাঙ্গাবালী এলাকার মাছ শিকারিরা মাছের পরিবর্তে এখন কাঁকড়া ধরতে ব্যস্ত। রাঙ্গাবালী এলাকার মাছ ব্যবসায়ী রত্তন বেপারী বলেন, 'নদীতে মাছ নাই। মাছের আকাল চলছে। এ কারণে দাদনের টাকা পরিশোধ করতে অনেক আড়তদারই জেলেদের চাপ দিচ্ছে। জেলেরা দেনা পরিশোধের জন্য ধরছে কাঁকড়া। মহাজনরা স্থানীয় বাজারের চেয়ে লঞ্চযোগে ঢাকার বিভিন্ন বাজারে কাঁকড়ার চালান পাঠাচ্ছে। '

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ইলিশের প্রজনন মৌসুমকে বাধাগ্রস্ত করে নির্বিচারে মা ইলিশ শিকার, নদীগুলোতে বাঁধাজাল দিয়ে মাছের রেণু ধরা, নিষিদ্ধ জালের ব্যাপক ব্যবহার (কারেন্ট জাল, ব্যারজাল, বেন্দিজাল, টোংজাল, সাবার জালসহ বিভিন্ন অবৈধ জাল), নদীতে চর জেগে ওঠা, নানা ধরনের বর্জ্য ফেলে মাছের পরিবেশ বিনষ্ট করায় মাছ এখন অনেকটাই দুষ্প্রাপ্য। তা ছাড়া অরক্ষিত নদী ও সাগরের কারণে দেখা মিলছে না সুস্বাদু রিটা, কাওন, বড় পাঙ্গাশ, আইড়, ফা, কোরাল, পাবদা, গাগড়া, বাঘা আইড়, সরপুঁটি, কাজলি ও শীলল মাছের। জেলেদের লাভজনক এসব মাছ দুষ্প্রাপ্যতার তালিকায় চলে যাওয়ার কারণে পেশার সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের কয়েক বছর ধরে মাছ শিকার ও বিক্রি করে জীবিকা চালানো তাঁদের জন্য দায় হয়ে পড়েছে।

ভারপ্রাপ্ত জেলা মৎস্য কর্মকর্তা আজহারুল ইসলাম বলেন, 'বৃহৎ জলসীমায় আমাদের জনবল এবং জলজানের অভাব রয়েছে। এ জন্য পরিকল্পনানুযায়ী অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হলে বেশিমাত্রায় মাছের উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব। তবে সীমাবদ্ধতার মধ্যেও মৎস্য সম্পদ রক্ষায় আমরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। পর্যায়ক্রমে এ তৎপরতা আরো জোরালো হবে। '

 

 


মন্তব্য