kalerkantho


পৃথুলা এলেন কান্না থামল না মায়ের

পার্থ সারথি দাস   

২০ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



পৃথুলা এলেন কান্না থামল না মায়ের

কো-পাইলট পৃথুলার মায়ের আহাজারি

ঢাকার আর্মি স্টেডিয়ামে লাশ হস্তান্তরের সময় পৃথুলা নামটি উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে মা রাফেজা খাতুন ‘মা’ ও ‘মা’ বলে বিলাপ করতে থাকেন। একমাত্র সন্তান ছিলেন পৃথুলা। সেই পৃথুলার নিথর দেহ ফিরেছে কাঠমাণ্ডু থেকে। মেয়ের সঙ্গে শেষ কথা হয়েছিল দুর্ঘটনার দিন। পৃথুলা কাঠমাণ্ডু যাওয়ার আগে মাকে ঢাকার শাহজালাল বিমানবন্দর থেকে ফোন করেন। সেদিন সকালেই ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম ফ্লাইট নিয়ে যান। সঙ্গে সঙ্গে ফিরে এসে আবারও চট্টগ্রাম যেতে হয় ফ্লাইট নিয়ে। তারপর একই কম্পানির উড়োজাহাজ উড়িয়ে দুপুরে কাঠমাণ্ডুর উদ্দেশে যাত্রা করেন পৃথুলা।

মেয়েকে ছাড়া তো মায়ের দিন যায় না, রাত যায় না। সেই মেয়ে সেই যে কাঠমাণ্ডু গেলেন আর ফিরছেন না।

স্বজনরা জানায়, মেয়ের জন্য না খেয়ে, না ঘুমিয়ে এই কদিন রাফেজা খাতুন অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। গতকাল মেয়ের লাশের জন্য অপেক্ষা করছিলেন নীরব কান্নায় চোখ ভাসিয়ে। নাম ঘোষণা হতেই আবেগ আর নিয়ন্ত্রণ করতে পারেননি। বিলাপ করে ওঠেন রাফেজা। পাশে বসে ছিলেন পৃথুলার বন্ধু সামিয়াও। চোখের জল তাঁরও নামছিল গাল বেয়ে। পৃথুলার নানু, ছোট খালা অন্য আরো অনেকের চোখ ছিল ছলছল।

বিকেল পৌনে ৩টায় আর্মি স্টেডিয়ামে যান পৃথুলার মা রাফেজা খাতুন, বাবা আনিসুর রশীদ, খালা, খালাতো বোনসহ আটজন। চোখ মুছছিলেন পৃথুলার বাবা আনিসুর রশীদ। পৃথুলার বয়স কতই বা ছিল। সবেমাত্র ২৬। স্বপ্ন ছিল আকাশে উড়োজাহাজ চালানোর। পরিবারের অনেকের মত না থাকলেও স্বপ্ন হাতের মুঠোয় এনেছিলেন কঠিন মনোবলে। এই বিমানেই গত ১২ মার্চ কাঠমাণ্ডুতে কো-পাইলট পৃথুলা রশীদ বরণ করেছেন মৃত্যুকে।

স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, রাফেজা খাতুন তাদের বলেছেন, স্বপ্নে মেয়ে মায়ের কাছে আসে! বাসার মাছ আর খরগোশের সঙ্গে পৃথুলার ভারি চঞ্চল সময় কাটত। একবার রাস্তায় একটি কুকুরের শ্বাসকষ্ট বুঝতে পেরে পৃথুলা ইনহেলার নিয়ে দৌড়ে গিয়েছিলেন। একদিন একটি চড়ুই ডানা ভেঙে তাঁদের বাসায় আশ্রয় নিয়েছিল। ওই পাখির সেবাযত্নে পৃথুলা মেতে ওঠেন। তার পরও সে পাখিটির প্রাণ উড়ে গেলে পৃথুলা ভীষণ মর্মাহত হন। মানুষ মারা গেলে অনুভূতি কেমন হয় জানতে বড় আগ্রহ ছিল পৃথুলার। সে জন্য একবার বড় বিপদে পড়তে হয়েছিল জানিয়ে স্বজনরা বলে, সেবার বাবা তাঁকে বিপদ থেকে উদ্ধার করেন। সেই পৃথুলা নিজেই মরে গেলেন।

পৃথুলার পরিবারের ঘনিষ্ঠজনরা জানান, শান্তশিষ্ট ছিলেন পৃথুলা। গভীর টান ছিল পোষা প্রাণীদের প্রতি। পৃথুলা ব্যাডমিন্টন খেলতে ভালোবাসতেন, বিড়ালকে আদর করতেন। সাহিত্য ভালো বুঝতেন। কোমল মন ছিল। কাউকে কষ্ট দিতেন না। কেউ মন খারাপ নিয়ে কাছে গেলে পৃথুলা এমন সব গল্প বলতেন, মন ভালো হয়ে যেত। সেই পৃথুলার জন্য এখন কাঁদছে সবাই। ঘরে পৃথুলার মেয়েবেলার বউ সাজার ছবি, নানা বয়সী ছবির অ্যালবাম এখন মাকে বড় কষ্ট দেয়। তাই ওগুলো দূরে সরিয়ে রাখা হয়েছে।

পৃথুলা মা-বাবার একমাত্র সন্তান। জন্ম ১৯৯২ সালের ১৮ জুলাই। নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষ করে বৈমানিক হওয়ার প্রশিক্ষণ নেন। আরিরাং ফ্লাইং স্কুলের তৃতীয় ব্যাচের ছাত্রী ছিলেন ২০১২ সালে। কমার্শিয়াল পাইলট লাইসেন্স পাওয়ার পর ইউএস বাংলা এয়ারলাইনসে যোগ দেন ২০১৬ সালের জুলাইয়ে।

পৃথুলাদের বাসা মিরপুর ডিওএইচএসে। মা রাফেজা খাতুন লড়াকু মেয়েকে নিয়ে গর্বিত। তিনি স্যালুট দেন মেয়ের কফিন সামনে রেখে। সঙ্গে সঙ্গেই কান্নায় ভেঙে পড়ে বলেন, কাকে নিয়ে থাকব আমি? পৃথুলার বাবা আনিসুর রশীদকেও অপ্রকৃতিস্থ দেখাচ্ছিল।

রাফেজা খাতুন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমার একমাত্র মেয়ে ছিল পৃথুলা। সে চলে গেল। আমি এখন কাকে নিয়ে থাকব?  আমাকে ছাড়া থাকত না ও। পৃথুলাসহ যাঁরা বিমান দুর্ঘটনায় মারা গেছেন তাঁদের সবার জন্য দোয়া চাই।’ তিনি কান্নার কারণে কথা বলতে পারছিলেন না। কথা বলার সময় তাঁকে কোরআনের আয়াত পড়তে শোনা যায়। পৃথুলার মামা বিমানের ইঞ্জিনিয়ার মো. সাইফুর রহমান কালের কণ্ঠকে জানান, সেদিন ইউএস বাংলা ফ্লাইট নিয়ে পৃথুলা প্রথম গিয়েছিলেন চট্টগ্রাম।

পৃথুলা রশীদের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে ঢুকতে গিয়ে গতকাল দেখা গেছে সেখানেও শোকের কালো ছায়া। ফেসবুক কর্তৃপক্ষ বলেছে, যাঁরা পৃথুলাকে ভালোবাসেন, তাঁরা তাঁর জীবন স্মরণ এবং উদ্‌যাপন করার জন্য তাঁর প্রোফাইলে যেতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করবেন।

জানা গেছে, গতকাল রাতে পৃথুলার লাশ মিরপুর বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে।

 

 


মন্তব্য